Home মতামত আনুপাতিক নির্বাচন ব্যবস্থা ভালো হবে

আনুপাতিক নির্বাচন ব্যবস্থা ভালো হবে

সাক্ষাৎকার: ড. শাহ্‌দীন মালিক

ড. শাহ্‌দীন মালিক। সুপ্রিম কোর্টের বিশিষ্ট আইনজীবী এবং সংবিধান ও নির্বাচন কমিশন আইন বিশেষজ্ঞ। ১৯৮০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে প্রভাষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। পরবর্তী সময়ে আইন সহায়তা ও মানবাধিকারবিষয়ক বেসরকারি সংস্থাগুলোতে দীর্ঘদিন কাজ করেছেন। তিনি ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব ল-এর পরিচালক, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ল অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্সের অবৈতনিক পরিচালকসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে যুক্ত ছিলেন। বর্তমানে গণবিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিভাগের খণ্ডকালীন শিক্ষক, মৌলিক অধিকার সুরক্ষা কমিটির আহ্বায়ক এবং সিপিডিসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদে যুক্ত আছেন। সুষ্ঠু নির্বাচন ও নির্বাচনী ব্যবস্থা নিয়ে কথা বলেছেন সমকালের সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আবু সালেহ রনি

এবারই প্রথম আইনের মাধ্যমে নির্বাচন কমিশন (ইসি) গঠিত হলো। নতুন ইসি সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন কী?

শাহ্‌দীন মালিক: এই কমিশন সেই অর্থে এখনও কাজ শুরু করেনি। তবে স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনে ইসি আচরণ বিধিমালা ও অন্যান্য নিয়মকানুন কঠোরভাবে প্রয়োগের চেষ্টা করছে বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। এরই মধ্যে ঝিনাইদহে সরকারদলীয় প্রার্থীর প্রার্থিতা বাতিল করেছে, যা সাহসী পদক্ষেপ। এই ধারা সব দলের, সব প্রার্থীর জন্য বজায় থাকলে এবং প্রার্থীদের হলফনামা যাচাই-বাছাই করে ব্যবস্থা নিলে ইসির প্রতি জনগণের ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে উঠতে পারে। আর প্রথমবারের মতো আইনের আওতায় যে ইসি গঠিত হয়েছে, তাকে খুব বেশি হলে মন্দের ভালো বলা যায়।
ইসির দায়িত্ব পালনে সম্ভাব্য চ্যালেঞ্জ কী হতে পারে?

শাহ্‌দীন মালিক: গত এক দশকে নির্বাচনী ব্যবস্থাটা ভেঙে পড়েছে। সেটা স্থানীয় বা জাতীয় নির্বাচন- যেটিই হোক। তাই মূল চ্যালেঞ্জ হলো, অংশীদারিত্বমূলক নির্বাচন নিশ্চিত করা। এই চ্যালেঞ্জ নিঃসন্দেহে নির্বাচন কমিশনের একার পক্ষে মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। রাজনৈতিক সদিচ্ছা, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সমঝোতা ছাড়া অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন অসম্ভব।

রাজনৈতিক মহলের একাংশের জোরালো অভিমত ও দাবি আছে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা পুনঃস্থাপনের। এটি অসাংবিধানিক বলে সর্বোচ্চ আদালত বাতিল করেছেন। এ বিষয়ে আপনার অবস্থান কী?

শাহ্‌দীন মালিক: সাংবিধানিকভাবে কী সম্ভব আর কী সম্ভব নয়, সেটা মুখ্য নয়। রাজনৈতিক দলগুলো যদি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন না চায়, তাহলে অনেক দলই অনেক আপত্তির কথা বলতে পারবে। আর বৃহৎ রাজনৈতিক দলগুলো বৃহৎ সমঝোতার ভিত্তিতে যদি চায় যে জনগণ ও তারা ভোটের মাধ্যমে সরকার গঠন করবে, তাহলে প্রয়োজন অনুসারে সাংবিধানিক কাঠামো পরিবর্তন করা যাবে। আবার কিছু পরিবর্তন না করেও সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন করা সম্ভব হবে, যদি রাজনৈতিক ঐকমত্য হয়। অর্থাৎ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনঃস্থাপন না করেও রাজনৈতিক ঐকমত্যের ভিত্তিতে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন করা সম্ভব। এ ক্ষেত্রে প্রধান দলগুলোকে ছাড় দিতে হবে।

১৯৯০ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত জাতীয় নির্বাচনগুলোতে কিছু ত্রুটি-বিচ্যুতির অভিযোগ থাকলেও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হয়েছে। ভোট প্রদানেও ভোটারদের উপস্থিতি ছিল লক্ষণীয়। কিন্তু গত দুটি নির্বাচনে এর ব্যত্যয় হয়েছে বলেই বিশ্নেষকদের অভিমত। এ বিষয়ে আপনার মূল্যয়ন কী?

শাহ্‌দীন মালিক: প্রথাগত চিন্তার বাইরে কিছু করা উচিত। যেমন- ১৯৯০ বা ১৯৯৬ সালের নির্বাচনের সময় হয়েছিল। তখন প্রথাগত চিন্তার বাইরে গিয়ে রাজনৈতিক দলগুলো সিদ্ধান্ত (অন্তর্বর্তীকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার) নিয়েছিল। ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর এরশাদ সরকারের পতন হয়েছিল। তখন সিদ্ধান্ত হলো, রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করবেন প্রধান বিচারপতি। এটি এরশাদ পতনের ১০ দিন আগে বললেও কেউ বিশ্বাস করত না। কিন্তু পরিস্থিতির কারণে প্রথার বাইরে গিয়ে এটি হয়েছে। সেখানে রাজনৈতিক দলগুলোই সমাধান বের করেছিল। তাই নির্বাচনী ব্যবস্থায় ভোটারদের ফিরিয়ে আনতে রাজনীতিবিদদের সময় এসেছে নতুন কিছু চিন্তা করার।

নির্বাচনী ব্যবস্থা উন্নয়ন বা সংস্কারে আপনার কোনো প্রস্তাব রয়েছে কিনা।

শাহ্‌দীন মালিক: প্রাপ্ত ভোটের আনুপাতিক হারে সংসদীয় আসন নির্ধারণ করা যায় কিনা, সেটা ভাবতে হবে। বাংলাদেশে আসনভিত্তিক নির্বাচন হয়। যিনি সর্বোচ্চ ভোট পান, তিনিই এমপি হন। সে ক্ষেত্রে যিনি ওই আসনে দ্বিতীয়-তৃতীয় হবেন, তাঁর দলেরও অংশগ্রহণ থাকুক সংসদীয় কাঠামোতে। এতে আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত হবে। প্রতিটি দল যত ভোট পাবে, তার ভিত্তিতে সংসদে প্রতিনিধিত্ব করবে। জনগণ ভোট দেবে নিজস্ব পছন্দের দলীয় প্রতীকে। এখানে যে দল ৫০ ভাগ ভোট পাবে, সেই দল তার তালিকা থেকে সংসদে প্রথমদিকের ১৫০টি আসন পাবে। যে দল ২০ ভাগ ভোট পাবে, সেই দল আনুপাতিক হারে পরের আসন পাবে। এভাবে প্রাপ্ত ভোটের ভিত্তিতে অন্যান্য দলও আসন পাবে।

আপনার প্রস্তাবটি ভিন্নধর্মী। এখানে কিছু প্রশ্ন আসতে পারে, আনুপাতিক হারে নির্বাচিতরা কোন আসনে প্রতিনিধিত্ব করবেন? আর এটি রাজনীতিতে গুণগত পরিবর্তন ঘটাবে কীভাবে?

শাহ্‌দীন মালিক: উদাহরণ হিসেবে লক্ষ্মীপুর-১ আসনের আওতাধীন লক্ষ্মীপুর পৌরসভার মেয়র হচ্ছেন স্থানীয় প্রতিনিধি। অন্যদিকে যিনি এমপি নির্বাচিত হন, তিনি জাতীয় সংসদের সদস্য। তাঁকে কেন্দ্রীয়ভাবে বিবেচনা করতে হবে। তাই আনুপাতিক হারে নির্বাচিতরা কোন আসনে প্রতিনিধিত্ব করবেন, সেটি দলই ঠিক করবে, ভোটের পরে। এ ক্ষেত্রে ভোটের আগেই কাউকে আর কোনো আসনে মনোনয়ন দেওয়া যাবে না। এতে সংসদীয় আসনে দলীয় ভিত্তিতে কেন্দ্রীয়ভাবে ভোট পরিচালিত হবে। প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীরা কেউ জানবে না, কে কোন আসনে প্রতিনিধিত্ব করবেন। ফলে নির্বাচনকেন্দ্রিক সহিংসতা কমবে। প্রার্থীদের অর্থ ও পেশির জোর কমবে। তাঁরা নির্বাচনে অনিয়মের সুযোগ পাবেন না।
প্রাপ্ত ভোটের আনুপাতিক হারে সংসদীয় আসন ব্যবস্থা বিশ্বের কোথাও আছে কিনা? এটি বাস্তবায়নে করণীয় কী?
শাহ্‌দীন মালিক: বহু দেশে আছে। শ্রীলঙ্কায়ও আছে। সেখানে কেন্দ্রীয় সংসদীয় আসন ব্যবস্থা, অর্থাৎ বাংলাদেশে বিদ্যমান ব্যবস্থা এবং আনুপাতিক হারে সংসদীয় আসন ব্যবস্থা দুটোই আছে। বাংলাদেশে এই ব্যবস্থা চালু করতে হলে রাজনৈতিক সমঝোতা প্রয়োজন। যার ভিত্তিতে সংবিধান সংশোধন করে তা অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।

নির্বাচনী ব্যবস্থা সংস্কারের প্রয়োজন রয়েছে কিনা?

শাহ্‌দীন মালিক:সত্যিকার অর্থেই রাষ্ট্রীয় কাঠামোগত সমস্যা অত্যন্ত প্রকট। কারণ, পৃথক্‌করণ বলতে শুধু নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগ পৃথক্‌করণকেই বোঝানো হচ্ছে। কিন্তু পৃথক্‌করণ এটি নয়। রাষ্ট্রের তিনটি বিভাগকেই পৃথক্‌করণ করতে হবে। সংসদকেও নির্বাহী বিভাগ থেকে আলাদা থাকতে হবে। অথচ বিদ্যমান ব্যবস্থায় এমপিরা অনেক নির্বাহী বিভাগের কাজ করেন। এটা তাঁদের মোটেও করার কথা ছিল না। উন্নয়নমূলক কার্যক্রম হবে স্থানীয় সরকারের মাধ্যমে। কিন্তু এমপিরা স্থানীয় সরকার বিভাগে গিয়ে চেয়ারম্যান, কাউন্সিলর, মেয়রদের ওপর ছড়ি ঘোরাচ্ছেন।

ইভিএম ব্যবহার নিয়ে বিএনপিসহ কয়েকটি রাজনৈতিক দলের আপত্তি রয়েছে। প্রধান নির্বাচন কমিশনারও বলছেন, ইভিএম সম্পর্কে তাঁর তেমন জানাশোনা নেই। এই ইভিএম সুষ্ঠু নির্বাচনে কীভাবে ভূমিকা রাখতে পারে?

শাহ্‌দীন মালিক: বিশ্বের হাতেগোনা কয়েকটি দেশে ইভিএমের ব্যবহার আছে। অনেক দেশ এটি চালু করার পর বাদ দিয়েছে। কারণ, এতে সূক্ষ্ণ কারচুপির সুযোগ অনেক বেশি। বাংলাদেশেও ইভিএম ব্যবস্থা চালু করা মানে সূক্ষ্ণ কারচুপির ব্যবস্থা করে রাখা। তাই সামনের নির্বাচনে যদি একটি আসনেও ইভিএমের মাধ্যমে ভোট গ্রহণের ব্যবস্থা রাখা হয়, সেটি হবে অসৎ উদ্দেশ্যে।

নির্বাচনকালীন জাতীয় সরকার গঠনের দাবি বিভিন্ন মহল থেকে করা হচ্ছে। এ ব্যাপারে আপনি কী মনে করেন?

শাহ্‌দীন মালিক: সংবিধান পরিবর্তন না করেও রাজনৈতিক দলগুলো আলাপ-আলোচনার ভিত্তিতে নির্বাচনকালীন সরকার গঠন করতে পারে। তাতেও সব দলের অংশীদারিত্ব থাকতে পারে। তা ছাড়া নির্বাচনের সময় স্বরাষ্ট্র, জনপ্রশাসন, অর্থসহ গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি মন্ত্রণালয়ে যদি নিরপেক্ষ ব্যক্তিদের দায়িত্ব দেওয়া যায়, তাহলে জাতীয় সরকার বলা না হলেও নিরপেক্ষ সরকার তো হতে পারে।

ক্ষমতাসীন দলের অধীনে নির্বাচনে কোনো বাধা আছে কিনা।

শাহ্‌দীন মালিক: গত দুই নির্বাচনে সংসদ বজায় থাকতেই আবার সংসদ নির্বাচন হয়েছে। এটা সংবিধানে আছে। কিন্তু সংবিধানে সংসদ ভেঙে দিয়েও নির্বাচনের কথা বলা আছে। রাষ্ট্রপতিশাসিত সরকার ব্যবস্থায় সংসদ বহাল রেখে নির্বাচন করা যায়। কারণ, তখন ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির কাছে। সেখানে নির্বাচনে প্রভাব বিস্তারের কিছু থাকে না। কিন্তু সংসদীয় ব্যবস্থায় সংসদ রেখে অন্য কোনো দেশে নির্বাচন হয়েছে বলে জানা নেই।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Check Also

মসজিদে মানতে হবে ৯ নির্দেশনা

দেশজুড়ে বৈশ্বিক মহামারিকরোনা ভাইরাসের সংক্রমণ বৃদ্ধি পাওয়ায় মাস্ক পরা বাধ্যতামূলক করাসহ ছয়…