Home অর্থ ও বাণিজ্য এই মুহূর্তে জরুরি তিনটি পদক্ষেপ

এই মুহূর্তে জরুরি তিনটি পদক্ষেপ

সাক্ষাৎকারে ড. আব্দুর রাজ্জাক

অর্থনীতিবিদ ড. আব্দুর রাজ্জাক পিআরআইর গবেষণা পরিচালক এবং র‌্যাপিডের চেয়ারম্যান। তিনি যুক্তরাজ্যের কমনওয়েলথ সচিবালয়ের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিভাগের প্রাক্তন প্রধান। এর আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি বিভাগে শিক্ষকতা করেছেন। বর্তমানে বাংলাদেশের অর্থনীতির চ্যালেঞ্জ ও আসন্ন বাজেট নিয়ে কথা বলেছেন সমকালের সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন জাকির হোসেন

অর্থনীতিবিদ ড. আব্দুর রাজ্জাক মনে করেন, বাংলাদেশের অর্থনীতিতে এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় সমস্যা মূল্যস্ফীতি এবং টাকার বিপরীতে ডলারের দর বেড়ে যাওয়ার চাপ।

এ অবস্থায় আসছে আগামী অর্থবছরের জাতীয় বাজেট। সামষ্টিক অর্থনীতিতে এ চাপ কমিয়ে আনতে সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংককে তিনটি পদক্ষেপ নিতে হবে। প্রথমত- অল্প অল্প করে টাকার অবমূল্যায়ন করতে হবে। দ্বিতীয়ত- আমদানি নিয়ন্ত্রণের কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। তৃতীয়ত- বাজেট বাস্তবায়নে খুব কম সুদের বৈদেশিক ঋণ নিতে হবে এবং অনুদান বাড়ানোর চেষ্টা করতে হবে। তিনটি পদক্ষেপ একসঙ্গে নিতে পারলে বর্তমানের সংকট অনেকটা সামাল দেওয়া যাবে।

প্রশ্নের জবাবে ড. আব্দুর রাজ্জাক বলেন, দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা ভালো ছিল। এখন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। এর জন্য বৈশ্বিক পরিস্থিতি মূলত দায়ী। বিশ্ব পরিস্থিতির ওপর বাংলাদেশের হাত নেই। তবে অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনায় কিছু পরিবর্তন এনে সংকট যতদূর সম্ভব সামাল দেওয়া যেতে পারে।

তিনি বর্তমান পরিস্থিতির প্রেক্ষাপট বর্ণনায় বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে কভিডের কারণে প্রণোদনা প্যাকেজ দেওয়ার ফলে ধারণা ছিল যে, মূল্যস্ম্ফীতি বাড়বে এবং তা বড়জোর ৫ শতাংশ পর্যন্ত যাবে। কিন্তু রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং অন্যান্য কিছু কারণে এসব দেশে মূল্যস্ম্ফীতি এর চেয়ে অনেক বেড়েছে। যুক্তরাজ্যে এখন মূল্যস্ম্ফীতি প্রায় ৯ শতাংশ। যুক্তরাষ্ট্রে আরও বেশি। এ অবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভ সুদের হার বাড়িয়েছে। ফলে ডলারের চাহিদা অনেক বেড়ে গেছে। অনেকে এখন ডলারে বিনিয়োগে আগ্রহী হয়ে উঠছেন। বৈশ্বিক এ পরিস্থিতি অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশের বিনিময় হারকেও চাপে ফেলেছে।

বাংলাদেশের বিনিময় হারের পরিস্থিতি ব্যাখ্যায় ড. রাজ্জাক বলেন, এখানে আগে থেকেই টাকা অতিমূল্যায়িত ছিল। কৃত্রিমভাবে টাকার দর ধরে রাখা হয়েছে। এখন আর ধরে রাখা যাচ্ছে না। ফলে সংকটটা হঠাৎ তীব্র হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক একটা দর বলছে, কিন্তু ব্যাংকগুলো তার চেয়ে অনেক বেশি দরে গ্রাহক পর্যায়ে ডলার কেনাবেচা করতে বাধ্য হচ্ছে। ফলে বিনিময় হারে একটা বড় অবমূল্যায়ন হয়ে গেছে। খোলাবাজারে ব্যাংকের চেয়ে ডলারের দর আরও বেশি। এর একটা কারণ হলো, করোনার সময়ে মানুষ বিদেশে বেড়াতে এবং চিকিৎসার জন্য খুব একটা যায়নি। এখন যাচ্ছে বলে ডলারের বাড়তি চাহিদা তৈরি হয়েছে। এখানে একটা পর্যবেক্ষণের বিষয় আছে। সংকটের সময়ে স্থানীয় মুদ্রার বড় মাপের অবমূল্যায়ন হলে খোলাবাজারে আরও দর বাড়বে বলে প্রত্যাশা তৈরি হয়। এ ধরনের পরিস্থিতি এক ধরনের ফাঁদ তৈরি করে। সাধারণ মানুষ ডলার কিনে মজুত রাখে।

এ পরিস্থিতিতে করণীয় কী জানতে চাইলে তিনি বলেন, টাকাকে অল্প অল্প করে অবমূল্যায়ন করা যেতে পারে। এতে করে রপ্তানি ও রেমিট্যান্স বাড়বে। তবে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ থেকে বাজারে ডলার বিক্রি অব্যাহত রাখলে তা রিজার্ভ দ্রুত কমিয়ে দিতে পারে। এর সঙ্গে আমদানি নিয়ন্ত্রণ করতে হবে কঠোরভাবে। এই মুহূর্তে আমদানি না করলে দেশ সংকটে পড়বে না, এমন পণ্য আমদানিতে নিয়ন্ত্রণ আনতে হবে। এ ছাড়া মূল্যস্ম্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনতে গেলে সুদের হার বাড়ানো যেতে পারে। সুদের হারের ওপর যে সীমা রয়েছে, তা তুলে দেওয়া যেতে পারে। মনে রাখতে হবে, পু?ঁজি হলো দুষ্প্রাপ্য সম্পদ। বাজার বাস্তবতার তুলনায় সস্তায় ঋণ পেলে অনেকে যথাযথ কাজে ব্যবহার করে না, যা মূল্যস্ম্ফীতি বাড়তে সহায়তা করে।

তিনি মনে করেন, বাংলাদেশকে এখন সহজ শর্তের কম সুদের বৈদেশিক ঋণের দিকে আরও ঝুঁকতে হবে। বৈদেশিক অনুদান নেওয়ার সুযোগ থাকলে কাজে লাগাতে হবে। তার মতে, বাংলাদেশের জিডিপির তুলনায় বৈদেশিক ঋণ তুলনামূলকভাবে কম। যদিও গত দুই বছরে একটু বেড়েছে। ঋণ পরিশোধের চাপও তুলনামূলক কম। আগামীতে যাতে পরিশাধের চাপ না বাড়ে সেজন্য কম সুদের ঋণের দিকে মনোযোগ বাড়াতে হবে।

খাদ্যবান্ধব কর্মসূচিতে বাড়তি খরচ জাদুর মতো কাজ করবে : ড. রাজ্জাক মনে করেন, ১০ টাকায় গরিব মানুষকে চাল দেওয়ার জন্য সরকারের যে কর্মসূচি রয়েছে, সেখানে আগামী বাজেটে অতিরিক্ত ৬ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দিলে পরিস্থিতি মোকাবিলায় জাদুর মতো কাজ করবে। তিনি বলেন, বৈশ্বিকভাবে মূল্যস্ম্ফীতির চাপ রয়েছে। এ কারণে আন্তর্জাতিকভাবে ঐকমত্য রয়েছে যে, উন্নয়নশীল দেশে এ বছর ভর্তুকি বাড়াতে হবে। বাংলাদেশে নিম্ন আয়ের মানুষের এ চাপ থেকে রক্ষা করতে সরকারকে কিছু জায়গায় হস্তক্ষেপ করতে হবে। কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তায় ভর্তুকি দিতেই হবে। সরকারের খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি নিয়ে তিনি একটি বিশেষ সুপারিশ করেন। তিনি বলেন, বর্তমানে ৬০ লাখের মতো পরিবারকে সরকার ১০ টাকা দরে এক মাসে ৩০ কেজি করে চাল দেয়। বছরের ৫ মাস এ কর্মসূচি চলে। এখানে সরকারের খরচ হয় ৩ হাজার কোটি টাকা। আগামী অর্থবছরে বাড়তি ৬ হাজার কোটি টাকা দিলে ১ কোটি ৮০ লাখ পরিবার এ সহায়তা পাবে। এ ধরনের সিদ্ধান্ত নিলে তা জাদুর মতো কাজ করবে। সরকারের ব্যয় হবে মোট বাজেটের মাত্র শূন্য দশমিক ৮ শতাংশের মতো। এটুকু বাড়তি খরচ বড় অঙ্কের মানুষকে স্বস্তি দেবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Check Also

মসজিদে মানতে হবে ৯ নির্দেশনা

দেশজুড়ে বৈশ্বিক মহামারিকরোনা ভাইরাসের সংক্রমণ বৃদ্ধি পাওয়ায় মাস্ক পরা বাধ্যতামূলক করাসহ ছয়…