Home জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ও ২০ দলে দূরত্ব বাড়ছে
জাতীয় - বিশেষ দিবস - জানুয়ারি ১৯, ২০১৯

ঐক্যফ্রন্ট ও ২০ দলে দূরত্ব বাড়ছে

একদিকে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট, অন্যদিকে ২০ দলীয় ঐক্যজোট। দুই জোটের নেতৃত্বেই রয়েছে মূলত বাংলাদেশ জাতীয়তবাদী দল (বিএনপি)। অথচ শুরু থেকেই দুই মেরুতে অবস্থান করছে এ দুই জোট- যাদের সম্পর্কের সেতুবন্ধ কেবল বিএনপি। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর থেকে নানা কর্মসূচি নির্ধারণে কোন জোট কোন বিষয়কে প্রাধান্য দিচ্ছে, তা নিয়ে দুই জোটের আলাদা মেরুকরণ আরও সুস্পষ্ট হয়ে উঠছে। তবে বিএনপি মনে করছে, তারা দুই জোটের মধ্যে সেতুবন্ধ রচনা করেছে। সামনের দিনগুলোতেও দুই জোটকে সঙ্গে নিয়ে রাজনীতির মাঠে সক্রিয় থাকতে চাইছে তারা।

এদিকে, ২০ দলীয় জোটের শরিক সংগঠনগুলো মনে করছে, বিএনপি এককভাবে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টকে নিয়ে কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। তাই ওই কর্মসূচি শুধু ঐক্যফ্রন্টের। সর্বশেষ জামায়াতে ইসলামী ইস্যুতে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষ নেতা ও গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেনের বক্তব্যের সম্পূর্ণ বিপরীত অবস্থান নিয়েছে জোটের শরিক দলগুলো। তাদের মতে, এ বক্তব্য ‘জোট ভাঙার ষড়যন্ত্র’। বিএনপির অনেক সিনিয়র নেতাই পুরনো জোটের এসব শরিকদের সঙ্গে একমত পোষণ করছেন। তারা নির্বাচনে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে ঐক্যফ্রন্টকে বেশি গুরুত্ব দেওয়ার সমালোচনা শুরু করেছেন। বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমেদ বীরবিক্রম এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে নির্বাচনে যাওয়া বিএনপির বড় ভুল ছিল। জনগণের সঙ্গে যার সম্পর্ক নেই, যারা ভোটের রাজনীতি কখনও করেননি, তাদের দ্বারস্থ হওয়া বিএনপির মতো বড় দলের জন্য সঠিক ছিল না। এ প্রসঙ্গে হাফিজ উদ্দিন আরও বলেন, তাদের দলের অনেক যোগ্য নেতা আছেন। তাদের নিয়েই এগোনো যেত।

তবে এ বিষয়ে বিতর্ক তৈরি না করার আহ্বান জানিয়ে গত বুধবার জাতীয় প্রেস ক্লাবের এক অনুষ্ঠানে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, যারা যাই বলুক না কেন, ঐক্যের কোনো বিকল্প নেই। অবশ্যই ঐতিহাসিকভাবে জোটের প্রয়োজন ছিল এবং প্রয়োজন আছে। ২০ দলীয় জোট যখন গঠন হয়, তখন একই কথা ছিল, জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট যখন গঠন হয়, তখন এই একই প্রশ্ন এসেছে। দুই জোটের মধ্যে যে সেতুবন্ধ তৈরি হয়েছে- তা বিএনপি তৈরি করেছে।

সূত্রমতে, ২০ দলীয় জোটের শরিক দলগুলো ঐক্যফ্রন্টকে শুরু থেকে বেশি প্রাধান্য দেওয়ায় বিএনপিকে দোষারোপ করে আসছে। নির্বাচনের আগে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সংলাপ, নির্বাচনে যাওয়ার ঘোষণা ও প্রচারকাজের সময় সারাদেশ সফরের মতো কর্মসূচিতে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের একক আধিপত্যের বিরুদ্ধে তখন ২০ দলীয় জোটের বেশ কয়েকটি শরিক সরব হয়ে ওঠে। তারা মনে করেন, নির্বাচনী প্রচারে পুরনো জোটকে কম গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। জোটের বৈঠকে তারা তাই বিএনপিকে একতরফা সিদ্ধান্ত না নিয়ে সমন্বিত সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। জাতীয় নির্বাচনের পরও নির্বাচন কমিশনে স্মারকলিপি প্রদানে এবং পুনর্নির্বাচনের দাবিতে কর্মসূচি ঘোষণায় জোটের শরিকদের সম্পৃক্ত না করায় আবারও এই মনস্তাত্ত্বিক দূরত্ব তীব্র হয়ে উঠেছে। পাশাপাশি বিএনপি নেতাকর্মীদের ভেতরও কোন জোটকে প্রাধান্য দেওয়া হবে, তা নিয়ে আলোচনা ও সমালোচনা চলছে।

অবশ্য ২০ দলীয় জোটের সমন্বয়ক ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান জানান, দুই জোটের মধ্যে কোনো দূরত্ব নেই। বড় রাজনৈতিক দল ও জোটের মধ্যে নানা মতামত থাকাই স্বাভাবিক। তবে দেশ ও গণতন্ত্রের স্বার্থে তারা যুগপৎ আন্দোলন করছেন এবং তা অব্যাহত রাখবেন।

নির্বাচনকে কেন্দ্র করে গত বছরের অক্টোবরে ড. কামাল হোসেনকে সামনে রেখে বিএনপি, গণফোরাম, জেএসডি ও নাগরিক ঐক্য মিলে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠন করে। পরে এ জোটে যোগ দেয় কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ। এ জোট গঠনের শুরু থেকেই ২০ দলীয় জোটের কয়েকটি প্রধান দল এর সমালোচনা করে আসছে। বিশেষ করে নতুন জোটের চাওয়া-পাওয়াকে কেন্দ্র করে তারা বিভিন্ন সময়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছে। পরে জামায়াত ইস্যুতে ঐক্যফ্রন্টের বক্তব্যের সমালোচনাও করেন জোটের নেতারা।

এ সময় জোটের শরিক এলডিপি সভাপতি কর্নেল (অব.) অলি আহমদ এক অনুষ্ঠানে বলেছিলেন, বিএনপিকে নিজের শক্তির ওপর আস্থা রাখতে হবে। অপর এক অনুষ্ঠানে বলেছিলেন, আসন ভাগাভাগির নামে বানরের পিঠা ভাগ হবে না। বিএনপির কাঁধে সওয়ার হয়ে নয়, নিজ যোগ্যতার ভিত্তিতে মনোনয়ন চাই। তিনি জনগণের সমর্থন ও দলের নেতাকর্মীদের ওপর নির্ভরতা বাড়ানোর জন্যও পরামর্শ দিয়েছিলেন বিএনপিকে।

জোটের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে বিএনপির নীতিনির্ধারকদের বৈঠকেও কর্নেল অলি আহমদের মতো অনেকে এসব বিষয়ে সরব ছিলেন। তারা অভিযোগ করে বলেছেন, বিএনপি ২০ দলকে পাশ কাটিয়ে ঐক্যফ্রন্টকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। তবে বিএনপি সবসময় তাদের আশ্বস্ত করেছে, জোটের মর্যাদাকে তারা সমুন্নত রাখবে।

জোটের নেতারা জানান, বিগত দিনগুলোতে নির্বাচনে যাওয়ার সিদ্ধান্ত থেকে শুরু করে নির্বাচনী প্রচারকাজ ও সমাবেশের মতো সিদ্ধান্তগুলোও ঐক্যফ্রন্টের পক্ষ থেকে নেওয়া হয়েছে। এসব সিদ্ধান্ত নামকাওয়াস্তে জোটের বৈঠকে উপস্থাপন করা হতো। অনেকটা বাধ্য হয়েই জোটের শরিকরা তাদের সিদ্ধান্তে ঐকমত্য প্রকাশ করত। এমনকি ঐক্যফ্রন্টের সঙ্গে সম্পর্ক বাড়াতে বিএনপিকে একক ক্ষমতাও দেওয়া হয় তখন।

নির্বাচনের আগে ঐক্যফ্রন্ট ও জোটের দূরত্ব কমিয়ে আনতে বেশ কয়েকটি কর্মসূচিতে জামায়াতে ইসলামীকে বাদ দিয়ে অন্যান্য দলের শীর্ষ নেতারা অংশ নেন। তবে আসন বণ্টন ও প্রার্থী নির্ধারণের ক্ষেত্রে প্রথমে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট এবং পরে জোটকে প্রাধান্য দেয় বিএনপি। অবশ্য পরে আসন ভাগাভাগি নিয়ে দুই জোটের মধ্যে প্রতিযোগিতা আরম্ভ হয় বলে জানান কয়েকজন নেতা।

তারা আরও জানান, নির্বাচনের পরও বিএনপি ঐক্যফ্রন্টের সঙ্গে যতবার বৈঠক করেছে, সিদ্ধান্ত নিয়েছে কিংবা কর্মসূচি ঘোষণা করেছে, ততবার জোটের সঙ্গে কথাও বলা হয়নি। তাদের মতামতও নেওয়া হয়নি। এমনকি এলডিপি সভাপতি কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বীরবিক্রম, কল্যাণ পার্টির চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম বীরপ্রতীক, বিজেপি চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার আন্দালিভ রহমান পার্থ ও অন্যান্য শীর্ষ নেতার সঙ্গে শলা-পরামর্শ করার প্রয়োজনও মনে করেনি বিএনপির হাইকমান্ড। এসব বিষয়কে ভালোভাবে দেখছেন না শরিক দলের নেতাকর্মীরা।

এলডিপির একজন সিনিয়র নেতার দাবি, একাদশ জাতীয় নির্বাচনের পরে কর্নেল অলি আহমদের মতো একজন বর্ষীয়ান নেতার সঙ্গে বিএনপির বর্তমান নেতৃত্ব আলোচনা করলে ভালো হতো। কর্মসূচি নির্ধারণে তার মতামত নিলে এবং তার মতো একজন প্রবীণ রাজনীতিবিদ ও মুক্তিযোদ্ধাকে সক্রিয় করতে পারলে শুধু জোটের নয়, বিএনপির জন্যও ভালো হতো। কারণ হিসেবে তিনি বলেন, বিএনপির প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে অলি আহমদ এই দলের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। তাই তিনিই দলটির সবচেয়ে কাছের বন্ধু হতে পারতেন।

জোটের শরিক দল জাতীয় গণতান্ত্রিক দলের (জাগপা) একজন নেতার মতে, শরিকদের অবমূল্যায়ন করা হচ্ছে। চলতি জাতীয় নির্বাচনে তাদের কোনো আসন দেওয়া হয়নি। বিষয়টি খুবই আপত্তিকর হলেও জোটের নেত্রী হিসেবে খালেদা জিয়াকে মানেন তারা। তিনি কারাগারে থাকায় জোটের ঐক্যকেই বড় করে দেখছেন তারা।

দলের নেতা ও জোটের শরিকদের এমন মনোভাবের পর বিএনপির নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটির সর্বশেষ বৈঠকে ২০ দলীয় জোটকে আরও সক্রিয় করে তোলার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বৈঠকে কারাবন্দি দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সঙ্গে মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের মতবিনিময়ের প্রসঙ্গ উত্থাপন করা হয়। এ প্রসঙ্গে বিএনপি মহাসচিব জানান, যে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রেই ২০ দলীয় জোট ও ঐক্যফ্রন্টের সঙ্গে আলোচনা করে নিতে বলেছেন বিএনপি চেয়ারপারসন। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক মিত্র ২০ দলীয় জোটের ঐক্য আরও অটুট করার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Check Also

সুইডেন-ফিনল্যান্ডের ন্যাটোর সদস্য হতে আবেদন

যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট ন্যাটোর সদস্যপদের জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে আবেদন করেছে রা…