Home অপরাধ কৃষ্ণবর্ণের কোনো বিজ্ঞানী কখনো বিজ্ঞানে নোবেল জিতেনি

কৃষ্ণবর্ণের কোনো বিজ্ঞানী কখনো বিজ্ঞানে নোবেল জিতেনি

তাজিম মাহমুদ প্রিন্স : ২০১৮ সালে পদার্থবিজ্ঞান ও রসায়নে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন দুইজন নারী বিজ্ঞানী। ডোনা স্ট্রিকল্যান্ড এবং ফ্রান্সেস এইচ আরনল্ড নোবেল পুরস্কার বিজয়ী ২০তম এবং ২১তম নারী বিজ্ঞানী।

কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলেও সত্যি যে বিগত ১০০ বছরের মধ্যে কোনো কৃ্ষ্ণাঙ্গ বিজ্ঞানীকে বিজ্ঞানের কোনো শাখায় নোবেল বিজয়ী হিসেবে দেখা যায়নি।

প্রতি বছর অক্টোবর মাসে যে নোবেল পুরস্কার ঘোষণা করা হয় আদতে তা কৃষ্ণবর্ণের মানুষদের জন্য মোটেও সুখকর নয়! এমনকি ৯০০ জন নোবেল বিজয়ীদের জন্যও যন্ত্রণাদায়ক কারণ মাত্র ১৪ জন কৃ্ষ্ণাঙ্গ (মোট বিজয়ীর ১.৫%) এখন পর্যন্ত নোবেল পুরস্কার জিতেছেন যার মধ্যে বিজ্ঞানে এখন পর্যন্ত কেউ নেই।

এ পর্যন্ত যে কয়জন কৃষ্ণাঙ্গ নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন তাঁরা কেবল শান্তিতে (দশ) এবং সাহিত্যে (তিন) পুরস্কার পেয়েছেন। এর বাইরে একমাত্র সমাজবিজ্ঞানী আর্থার লুইস ১৯৭৩ সালে তার কাজের জন্য অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার পান।

এর বিপরীতে ৭০ জনেরও বেশি এশিয়ান ব্যক্তি নোবেল বিজয়ী হয়েছেন, যার মধ্যে বিজ্ঞানেই সবচাইতে বেশি। ২০০০ সাল থেকে এই সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধিই পেয়ে চলেছে।

এশিয়ান ব্যক্তিদের নোবেল জয়ের এই সাফল্য মূলত জাপানি, চীনা ও কোরিয়ান বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রভাব বিস্তারের ক্ষমতা এবং সারা বিশ্বে ‘এশিয়ান আমেরিকান একাডেমির’ যে সাফল্য রয়েছে তারই ফলাফলমাত্র।

যদি কোনো বিজ্ঞানী একটি মর্যাদাপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের হয়ে ব্যয়বহুল বৈজ্ঞানিক গবেষণা পরিচালনা করতে সমর্থ হন, তখন তার জন্যে বিজ্ঞান বিভাগে নোবেল পুরস্কার জেতা অনেকাংশেই সহজ হয়ে যায়।

অপরদিকে, অর্থনৈতিক ও অবস্থানের কারণে বেশিরভাগ কৃ্ষ্ণাঙ্গ তরুণই গবেষণার ক্ষেত্র হিসেবে বিজ্ঞানকে বেছে নেয় না।

কৃ্ষ্ণাঙ্গ আফ্রিকানদের জন্য সীমিত সুযোগের পাশাপাশি, পশ্চিমা দেশে কালো বর্ণের মানুষদের জন্য বিজ্ঞান পড়ার কিংবা উচ্চতর ডিগ্রি অর্জনের সম্ভাবনা কম। পাশাপাশি বৈজ্ঞানিক ক্যারিয়ারেও অগ্রগতির সম্ভাবনা কম এমন ধারণা বিদ্যমান রয়েছে। এমনকি সম্ভাব্য নোবেল বিজয়ী হিসেবে বিবেচিত হতে হলে তাকে অবশ্যই যেকোনো বিখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হতে হয়।

এতকিছুর পরও যদি কেউ একাডেমিক সিঁড়ির ধাপ পার করে ফেলেন, পরবর্তীতে তাকে ফান্ড সংগ্রহ এবং প্রমোশনের জন্য হতে হয় চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। উদাহরণস্বরূপ, জানা যায় যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে কৃ্ষ্ণাঙ্গ বিজ্ঞানীদের জন্য স্বাস্থ্যখাতে গবেষণার জন্য অর্থ পাওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম।

মূলত একজন অধ্যাপক হওয়ার জন্য একজন ব্যাক্তিকে স্ব-প্রতিষ্ঠান থেকে প্রথমত সমর্থন পেতে হয়। এছাড়াও কমপক্ষে চারজন প্রফেসরকে তাঁর আবেদনকে সমর্থন এবং প্রত্যয়নপত্র প্রদান করতে হয় যে তিনি নিজ গবেষণার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক খ্যাতি অর্জনকারী ব্যক্তি।

এই ধরনের কাজের জন্য অভ্যন্তরীণ এবং বাহ্যিক নেটওয়ার্ক থাকা খুবই দরকারি।

নানা কারণে, কৃ্ষ্ণাঙ্গশিক্ষার্থীরা এমন প্রতিষ্ঠানগুলোতে কাজ করার সুযোগ পায়না যেখানে এই ধরনের সম্মাননা এবং নেটওয়ার্কগুলো তৈরি হয়। এর ফলে কৃ্ষ্ণাঙ্গদের অধ্যাপক পদে উন্নীত হওয়ার সম্ভাবনাও কমে যায়।

কৃ্ষ্ণাঙ্গ বিজ্ঞানীরা ‘বিজ্ঞানের গবেষণায় সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছাতে পারে না’ এমন ধারণাটি খুব সম্ভবত কৃ্ষ্ণাঙ্গ বিজ্ঞানীদের সাফল্যকে বিভিন্ন উপায়ে প্রভাবিত করে। এই পরিস্থিতিতে কৃ্ষ্ণাঙ্গ বিজ্ঞানীদের বিজ্ঞানে গবেষণায় উৎসাহিত করার কোনো বিকল্প নেই। একজন কৃ্ষ্ণাঙ্গ নোবেল বিজয়ীই অন্য কৃ্ষ্ণাঙ্গ ছাত্রদেরকে আরো বেশি অনুপ্রাণিত করতে পারে; ফলশ্রুতিতে বিজ্ঞান এর শাখায় কৃ্ষ্ণাঙ্গ মানুষের পদচারণা আরো বাড়বে বৈ কি কমবে না।

দ্য কনভারসেশনে প্রকাশিত এ লেখার লেখক ইস্ট লন্ডন ইউনিভার্সিটির টক্সিকোলজি অ্যান্ড ক্লিনিক্যাল বায়োক্যামিস্ট্রির শিক্ষার্থী উইনস্টল মারগানের মতে, ‘আমার নিজের স্নাতকোত্তর গবেষণার সময়, অনেক কোর্স প্রফেসরকে নোবেল বিজয়ীর অনুপ্রেরণামূলক কাজের বর্ণনা দিতে শুনেছি, যারা সবাই মূলত শ্বেতাঙ্গই ছিলেন। এই কথাগুলোই আমাকে আরো উচ্চাকাঙ্ক্ষী হওয়ার তাগিদ দিয়েছিল আর ধাপে ধাপে বিজ্ঞানী হয়ে উঠার ইচ্ছাকে আরো শক্তিশালী করে।’

‘কিন্তু একই সময়ে, কৃ্ষ্ণাঙ্গ শিক্ষার্থী হিসেবে, সেই স্তরের সাফল্যের অর্জন করা অনেক কঠিন হয়ে যায়, একমাত্র কারণ বিজয়ীর তালিকায় কোনো কৃ্ষ্ণাঙ্গ নোবেল বিজয়ী বিজ্ঞানীর অনুপস্থিতি!’

‘এই অবস্থা থেকে বের হয়ে আসার একমাত্র উপায় হল কৃ্ষ্ণাঙ্গদের বিজ্ঞানের গবেষণায় মনোনিবেশ করা এবং নোবেল পুরস্কার জিতে অন্যদের ধারণাকেই পাল্টে দেয়া।’

এই পরিবর্তন কেন জরুরি?
বিজ্ঞানে গবেষণার ক্ষেত্রে কৃ্ষ্ণাঙ্গ বিজ্ঞানীদের এগিয়ে আসতে হবে শুধুমাত্র সমতা রক্ষার জন্য নয়, বৃহত্তর সমাজের উপকারের জন্যই এই অংশগ্রহণ জরুরি। উদাহরণস্বরূপ, ডায়াবেটিস, হৃদরোগ, ক্যানসার এবং অন্যান্য অনেক জটিল রোগই কৃ্ষ্ণাঙ্গ বা আফ্রিকান মানুষের মধ্যে বেশি হয়ে থাকে। তবুও গবেষণায় প্রায়ই সাদা বর্ণের মানুষের ওপর অধ্যয়ন করে ফলাফল নির্ধারণ করা হয়। যদি আরো বেশি কৃ্ষ্ণাঙ্গ বিজ্ঞানী, বিশেষ করে নেতৃস্থানীয় অবস্থানে থেকে গবেষণা করতে পারেন তাহলে সেটা আরো বেশি প্রায়োগিক ও ফলপ্রসূ হবে বলেই ধারণা করা যায়।

এই সকল বিজ্ঞানীরাই এক ভবিষ্যৎ সুন্দর পৃথিবীর জন্য বিজ্ঞানের সাদা কালো বিভেদ দূরীকরণের দূত হতে পারেন।

সুতরাং, কিভাবে আমরা একজন কৃ্ষ্ণাঙ্গ বিজ্ঞানীর নোবেল বিজয়ী হয়ে উঠার সম্ভাবনা বৃদ্ধি করতে পারি?

এক্ষেত্রে আফ্রিকাকে এশিয়ার মতো রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক শক্তি অর্জনের জন্য অপেক্ষা করতে হবেনা। এক্ষেত্রে নারী বিজ্ঞানীদেরও আরো সুযোগ দিয়ে সামনে নিয়ে আসতে হবে। যে ৫১ জন নারী নোবেল পুরস্কার বিজয়ীকে আমরা চিনি, তার মধ্যে মাত্র ২১ জন বিজ্ঞানী এবং পদার্থবিজ্ঞানের মাত্র ৩ জন আছেন। ফলে নারীদের ক্ষেত্রেও একইরকম চ্যালেঞ্জ বিদ্যমান।

কিন্তু নেতৃস্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে এবং নেতৃস্থানীয় অবস্থানে নারীর সংখ্যা বৃদ্ধির লক্ষ্যে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সমর্থন নিয়ে সফল প্রচারাভিযান করা সম্ভব হলে নারী নোবেল বিজয়ীদের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেতে পারে।

ভবিষ্যতে আমরা যদি সত্যিই সংখ্যায় আরো বেশি কৃ্ষ্ণাঙ্গ বিজ্ঞানী এবং সেই সঙ্গে একজনও কৃ্ষ্ণাঙ্গ নোবেল বিজয়ী চাই, তাহলে এই রকম সরাসরি কৌশলগত পদক্ষেপ জরুরিভিত্তিতে নেয়ার কোনো বিকল্প নেই।

তথ্যসূত্র : সায়েন্স অ্যালার্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Check Also

ইরানে রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী পরমাণু চুক্তি নিয়ে আলোচনা করতে

পরমাণু ইস্যুতে পশ্চিমাদের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে সম্পর্কের টানাপোড়েন চলছে ইরানের। অন্যদিকে ইউক…