Home কবিতা ও গল্প (গল্প) আইসক্রিম -কিশোর কারুণিক

(গল্প) আইসক্রিম -কিশোর কারুণিক

ভোর হতেই ঘুম ভেঙে গেল। মনের ভেতর কেমন এক প্রকার আনন্দ দোল দিয়ে যাচ্ছে। রাতে কত কিছু ভাবতে ভাবতে কখন যে ঘুম এসে গেছে টের পাইনি। আজ রথের মেলা বাবা বলেছে রথের মেলা দেখতে নিয়ে যাবে। আহা! কত যে মজা হবে। কত কিছু খাবো। দোলনায় চড়বে। বাড়ির সকলে যাবে। ওরা বলেছে ওকেউ মেলাতে নিয়ে যাবে। না আমি ওদের সাথে যাব না। বাবার সাথে যাব। বাবা আমাকে কত আদর করে; ওরা ভাল না, ওরা একটুও ভালবাসে না আমাকে। মাথার চুলগুলো বেশ বড় হয়েছে। চুল ছাটানো দরকার। চুল ছাটাতে দশ টাকা। বাড়িতে যে কাইছি আছে, হ্যাঁ কাইছি দিয়ে চুল ছাটা শুরু করে দিই। ভাবা মতো ঘর থেকে কাউছি খুঁজে চিরনি দিয়ে মাথা আচঁড়িয়ে চুল ছাটা চেষ্টা করলো। আচমকা হাতের ঠেলাতে ছোট আয়নাটা পড়ে ভেঙে গেল। মা দৌঁড়ে এসেই রুটিবেলা বেলুন দিয়ে পিঠের উপর আচ্ছা মতো বাড়ি দিলো। ওমা ব’লে কেঁদে উঠে কাঁদতে কাঁদতে ঘরের বাইরে গিয়ে হাউমাউ করে কাঁদতে লাগলো।
অভাবের সংসার কোন কিছুই সহজে কেনা হয়ে উঠে না, তার পর আয়নাটা ভাঙাতে মায়ের মেজাজটা তেলে বেগুনে হয়ে উঠলো। বাবা শুয়ে আছে, বাবা মা’র কথার উপর কোন কথা বলে না। মা বাবাকে শাসালো “খবরদার ওকে যদি মেলাতে নিয়ে গিয়েছ তো ! বাবার কোন প্রতি উত্তর নেই। তাপস বুঝতে পারলো বাবা আর রথের মেলাতে নিয়ে যাবে না। তাপস চোখ মুছে কাকার ঘরে ঢুকলো। কাকার ছেলে ও মেয়ে মেলাতে কী কী কিনবে তা বলা বলি করছে। তাপস বললো আমিও তোমাদের সাথে মেলা দেখতে যাব। কাকা জামা কাপড় লন্ড্রি করে ঘরে ঢুকলো। লন্ড্রি করা দেখে তাপসের মনে হলো ওর জামাটা লন্ড্রি করা দরকার।
নিজেদের ঘরে এসে বাবার জামার পকেট হাতড়িয়ে এক টাকাও পেল না। কী আর করা! হঠাৎ মনে হলো এক সিনেমায় দেখেছে জামাপ্যান্ট থালা গরম করে লন্ড্রি করতে। তাড়াতাড়ি আলনা থেকে জামা নিয়ে বিছানায় রেখে, একটি থালা গরম করতে গরম চুলার কাছে গিয়ে থালা গরম করে যেমনি জামার উপর দিয়েছে তেমনি সঙ্গে সঙ্গে গোল মতো হয়ে জামা পেছন দিক পুড়ে গেল। হায় কপাল এ কী হলো, মা দেখলে তো মেরেই ফেলবে। তাপস তাড়া তাড়ি জামাটা লুকানোর জন্য ব্যস্ত হয়ে উঠলো। আর কোন জামা নেই যে তা পরে মেলা দেখতে যাবে। তাপসের খুব কান্না এলো হাউমাউ করে কেঁদে ফেলল, মা ঘরে ঢুকে দেখে তাপস কাঁদছে। মা’র মনে ছেলের প্রতি মায়া হলো, তাপসকে শান্তনা দিয়ে জামাটা সেলায় করে দিলো। কিন্তু এমন ভাবে পুড়ে গেছে তা সেলায় করেও পরার মতো হলো না। তাপস ঐ জামাই কোন ভাবে গায়ে পরার চেষ্টা করলো।
ঐদিকে কাকার ছেলে মেয়ে লন্ড্রি করা জামা পরে রথের মেলাতে যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি প্রায় শেষ। এখন বাড়ি থেকে রওনা হবার সময় যতক্ষণ। তাপসকে ডাকলো, তাপস জামাটা গায়ে দিয়ে ওদের সামনে যেতেই ওরা হেসে গড়াগড়ি দেবার অবস্থা। তাপস খুব লজ্জা পেল। এমন লজ্জা ও কোন দিন পায়নি। ও বুঝতে পারলো ওরা অনেক গরিব। ভাল কিছু ওদের জন্য না। সৃষ্টিকর্তা সবাইকে সমান ক্ষমতা দেয়নি দেয় না। ওরা রথের মেলাতে চলে গেল। তাপসের আর ইচ্ছা হচ্ছে না মেলাতে যাবার। ওর কেন জানি মনে হলো, রথের মেলা ওদের মতো মানুষের জন্যে না। তাপস ঘরে ঢুকলো। বিছানার উপর শুয়ে পড়লো। ছোট বোন বায়না ধরলো,
“ দাদা চলো না মেলাতে যাই। দাদা চলো না।”
তাপস ওর বোনকে নিয়ে রথের মেলাতে ঢুকলো। কত রকমের খাদ সামগ্রী। নাগরদোলা, পাপড়ভাজা, বিচিত্র কত প্রকারের মিষ্টি, মুড়িভাজা ইত্যাদি। কী করবে পকেটে তো টাকা পয়সা নেই। বোন পাপড়ভাজা খেতে চায়লো।
তাপস বললো, “পাপড়ভাজা খেতে হয় না, এই সব খেলে পেটে অসুখ হবে!”
বোন আবার বায়না ধরে, “তাহলে মিষ্টি খাব।”
তাপস বলে, “হায়রে কপাল ঐ মিষ্টি খেলে তো পেটে ক্রিমি হবে!”
বোন বলে, “কত মানুষ খাচ্ছে!”
“ওরা জানে না তো !” বোন বলে, “হ্যাঁ, তুমিই সব জান!” ব’লে বোন মুখ ভাড় করে নীচু করলো।
“শোন ঐ সব খাবার গুলো আমাদের জন্যে না, যাদের টাকা আছে তাদের জন্যে !”
“আমার কাছে এক টাকা আছে!”
“কই দেখি!”
বোন হাতের মুঠ খুলে, “এই দেখো।” বলে বোন হেসে ফেললো। তাপসও হাসলো। ওরা প্রতিটি দোকানে গিয়ে এক টাকার জিনিস চাইলো। কিন্তু এক টাকার কোন জিনিসই হলো না। মন ভাড় করে ভাইবোন হাত ধরাধরি করে মেলা থেকে বাড়ির পানে রওনা দিলো। কিছুক্ষণ যেতেই দেখে আইসক্রিম বিক্রি হচ্ছে, বিক্রেতা উচ্চস্বরে বলছে, “এক টাকায় একপিচ।” কথাটা শোনা মাত্র ভাইবোনের চোখে মুখে আনন্দ বয়ে গেল। খুশিতে এক টাকার কয়েন দিয়ে আইসক্রিম কিনলো।
তাপস বললো, “বোন তুই খা।”
বোন বললো, “তুমিও নাও।”
তাপস লক্ষ করলো আইসক্রিমের জল পড়ে যাচ্ছে।
তাপস বলে, “এক কাজ করি তুই আইসক্রিমের উপর থেকে খাঁ, আর আমি আইস ক্রিমের ঝড়ে পড়া জলটুকু খাই।’’

বোন আইসক্রিমর উপরের অংশ থেকে চুষতে লাগলো আর তাপস খেয়াল করলো আইসক্রিমের এক ফোটা জলও যেন মাটিতে না পড়ে। আশ পাশে কিছু মানুষ বেশ অবাক হলো, আইসক্রিম বিক্রেতার চোখে জল এলো এবং একটি আইসক্রিম বিনা টাকায় দিতে গেল কিন্তু ওরা না বোধক মাথা ঝাকাল।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Check Also

প্রাইভেটকারে গার্ডার শাস্তিমূলক ব্যবস্থায় কোনো আপত্তি থাকবে না: চীনের রাষ্ট্রদূত

নিজস্ব প্রতিবেদক: রাজধানীর উত্তরায় নির্মাণাধীন বাস র‍্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) প্রকল্পের ক্…