Home জাতীয় জাতীয় পার্টি আওয়ামী লীগের সঙ্গেই আছে

জাতীয় পার্টি আওয়ামী লীগের সঙ্গেই আছে

সরকারের সমালোচনায় ‘গরম’ বক্তৃতা করলেও ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সঙ্গেই আছে বিরোধী দল জাতীয় পার্টি (জাপা)। ‘সরকারবিরোধী’ বক্তব্যের কারণ দেখিয়ে জি এম কাদেরের সঙ্গে রওশন এরশাদ দ্বন্দ্বে জড়ালেও আওয়ামী লীগ এতে হস্তক্ষেপ করেনি। এ দ্বন্দ্বে সরকারের ভূমিকা না থাকায় জাপার আওয়ামী লীগপন্থিরা রওশন এরশাদকে সমর্থন না করে জি এম কাদেরের পাশে রয়েছেন।

জাপা চেয়ারম্যান জি এম কাদের এবং বিরোধীদলীয় নেতা রওশন এরশাদের ঘনিষ্ঠ নেতাদের সূত্রে এসব তথ্য ও রাজনৈতিক সমীকরণের তথ্য পাওয়া গেছে। তাঁরা জানিয়েছেন, রওশন এরশাদকে বিরোধীদলীয় নেতার পদ থেকে সরানোর পক্ষে নয় সরকারি দল। কিন্তু তাঁকে জি এম কাদেরের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সমর্থনও দিচ্ছে না আওয়ামী লীগ। সরকারের মদদ নেই- তা বুঝতে পেরে সুর নরম হয়েছে রওশনের পক্ষ নিয়ে দলীয় পদ হারানো মসিউর রহমান রাঙ্গার। তাই ফিরতে চান জি এম কাদেরের সঙ্গে।

জাপা চেয়ারম্যানের বিশ্বস্ত হিসেবে পরিচিত একজন প্রেসিডিয়াম সদস্য  জানিয়েছেন, রওশন এরশাদ ও জি এম কাদেরের দ্বন্দ্ব দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল মাত্র। এতে সরকার জড়ায়নি। সরকার রওশন এরশাদের পক্ষ নিলে নিশ্চিতভাবেই জাপার অধিকাংশ এমপি জি এম কাদেরের বিরুদ্ধে চলে যেতেন।

রওশন এরশাদ ও জি এম কাদেরের কয়েকটি দ্বন্দ্বে ভূমিকা রাখা এই নেতা জাপার সংকটের ব্যাখ্যায় বলেছেন, ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচন হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ বর্জন করলেও ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ ও জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলুর মতো দুই জ্যেষ্ঠ নেতা রওশন এরশাদকে সামনে রেখে দলের একাংশকে ভোটে নিয়ে যান। নির্বাচনের মাস দুয়েক আগেও কাজী জাফর আহমদের পক্ষে ছিলেন রওশন এরশাদ। প্রয়াত কাজী জাফর ছিলেন জাপার বিএনপিপন্থি নেতাদের মূল ব্যক্তি। জিয়াউদ্দিন বাবলুর মৃত্যুর পর দলের সিনিয়র কো-চেয়ারম্যান আনিসুল ইসলাম মাহমুদ ও মহাসচিব মুজিবুল হক চুন্নুই আওয়ামী লীগের পরীক্ষিত বন্ধু। সরকারের সবুজ সংকেত নিয়েই জাপার মহাসচিব হয়েছেন মুজিবুল হক চুন্নু। রওশন এরশাদের সঙ্গে এবারের লড়াইয়ে তাঁরা জি এম কাদেরকে সর্বাত্মক সমর্থন করছেন। মুজিবুল হক চুন্নু প্রকাশ্যেই রওশনপন্থিদের তুলাধুনা করে বক্তৃতা করেছেন। আনিসুল ইসলাম মাহমুদ প্রকাশ্যে মুখ না খুললেও গত বৃহস্পতিবার জার্মান রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে বৈঠকে অংশ নিতে জি এম কাদেরের বাসায় যান।

ওই নেতা বলেছেন, আনিসুল ইসলাম মাহমুদ ও মুজিবুল হক চুন্নু পরিস্থিতি বোঝার ‘ব্যারোমিটার’। তাঁরা জি এম কাদেরের পাশে থাকার অর্থ, আওয়ামী লীগের সঙ্গে সমস্যা নেই। জাপা আওয়ামী লীগের সঙ্গেই রয়েছে। সরকারের সমর্থন ছিল বলেই ২০১৯ সালে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের মৃত্যুর পর সংখ্যাগরিষ্ঠ এমপির সমর্থন না পেয়েও জি এম কাদেরের দাবি নাকচ করে বিরোধীদলীয় নেতা হতে পেরেছিলেন রওশন এরশাদ। জি এম কাদেরের সর্বাত্মক বিরোধিতার পরও এরশাদের মৃত্যুতে শূন্য রংপুর-৩ আসনে রওশনপুত্র রাহগীর আল মাহি সাদ জাপার মনোনয়ন পেয়েছিলেন। সরকার পক্ষে ছিল বলে সেবার রওশন এরশাদের সমর্থনে ছিলেন আনিসুল ইসলাম মাহমুদ ও জিয়াউদ্দিন বাবলুরা।

তবে এসব বিষয়ে গত চার দিনে বারবার চেষ্টা করে আনিসুল ইসলাম মাহমুদের বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি। জি এম কাদের বলেছেন, সরকারের সঙ্গে জাপার শত্রুতা বা বন্ধুত্ব নেই।

চুন্নু অবশ্য বলেছেন, ‘আওয়ামী লীগের সঙ্গেও আঁতাত নেই।’ সরকার রওশন এরশাদের পক্ষে থাকলে কি জাপার প্রায় সব এমপি ও প্রেসিডিয়াম সদস্যের সমর্থন জি এম কাদের পেতেন- প্রশ্নে হেসে তিনি বলেন, ‘জটিল প্রশ্ন।’

জাপার আরেক প্রেসিডিয়াম সদস্য জানিয়েছেন, জি এম কাদের জামানায় যাঁরা দলের পদপদবি হারিয়েছেন, তাঁরা রওশন এরশাদকে সামনে রেখে চাপ সৃষ্টির চেষ্টা করছেন। এর অংশ হিসেবেই আট মাস থাইল্যান্ডে চিকিৎসাধীন রওশন এরশাদ গত জুনে দেশে ফেরার পর মতবিনিময় সভা করা হয়। তিনি আবার থাইল্যান্ড ফিরে গেলে সেখান থেকে তাঁকে দিয়ে জাপার সভা আহ্বান করিয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছে। জি এম কাদেরের সরকারবিরোধী বক্তব্যকে কারণ হিসেবে দেখানো হয়েছে। ওই নেতাদের ধারণা ছিল, জাপার শীর্ষ নেতৃত্ব সাম্প্রতিক সময়ে যেভাবে সরকারের কড়া সমালোচনা করছেন, তাতে জি এম কাদেরের বিরুদ্ধে বিদ্রোহে আওয়ামী লীগের সমর্থন মিলবে।

প্রায় সব ইস্যুতে সরকারের সুরে কথা বলে গৃহপালিত বিরোধী দলের তকমা পেলেও হঠাৎ আওয়ামী লীগের সমালোচনায় মুখর জাপা। এ বিষয়ে ওই প্রেসিডিয়াম সদস্য বলেন, এগুলো সমঝোতারই অংশ। সরকার যেসব দলের প্রতি নমনীয় সেগুলোকে নিয়ে জোট করবে জাপা। বিএনপিও রাজনীতিতে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে। এমন সময়ে সরকার জি এম কাদেরের প্রতি কঠোর হয়ে তাঁকে বিএনপির দিকে ঠেলে দেওয়ার কথা নয়। বিএনপি নির্বাচনে না এলে জাপার জোটই শূন্যতা পূরণ করবে। শারীরিক অসুস্থতার কারণে রওশন এরশাদের পক্ষে আগামী নির্বাচনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করা কঠিন। তাই জাপার নেতা জি এম কাদেরই।

যে চিঠিতে রওশন এরশাদ কাউন্সিল ডাকেন তাতে বলা হয়, সরকারের বিরোধিতা করতে গিয়ে পদ্মা সেতুর মতো বিশাল অর্জনের অংশীদার হতে পারেনি জি এম কাদেরের নেতৃত্বাধীন জাপা। আগামী নির্বাচনে বিএনপি-জামায়াতের বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বী হতে জাপাকে শক্তি অর্জন করতে হবে। গত ২৩ আগস্ট স্বাক্ষরিত চিঠিটি ৩১ আগস্ট প্রকাশ করেন বিরোধীদলীয় নেতার সদস্য সচিব গোলাম মসিহ। রওশন ঘোষিত সম্মেলন প্রস্তুতি কমিটির এই সদস্য সচিব বলেন, ‘জাপার নেতারা রওশন এরশাদের কারণেই এমপি হতে পেরেছেন। এমপি হতে হলে রওশন এরশাদকেই লাগবে।’ কতজন এমপি রওশন এরশাদকে সমর্থন করেছেন- প্রশ্নে তিনি বলেছেন, ‘যাঁরা মনে করছেন জি এম কাদের এমপি বানাবেন, তাঁরা ভুল করছেন।’

এ চিঠি প্রত্যাহারে রাজি না হওয়ায় পরের দিন জি এম কাদের জাপার সংসদীয় দলের বৈঠক ডাকেন। তাতে দলের ২৬ এমপির ২৩ জন অংশ নেন। তাঁরা রওশন এরশাদকে সরিয়ে জি এম কাদেরকে বিরোধীদলীয় নেতা নির্বাচিত করেন। নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের এমপি সেলিম ওসমান বিদেশ থেকে টেলিফোনে সম্মতি দেন। জি এম কাদেরকে বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবে স্বীকৃতি দিতে ১ সেপ্টেম্বর স্পিকারকে চিঠি দেন মসিউর রহমান রাঙ্গা ও জাপার মহাসচিব মুজিবুল হক চুন্নু।

কিন্তু স্পিকার এখনও বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবে জি এম কাদেরকে স্বীকৃতি দেননি। এর তেমন সম্ভাবনাও দেখা যাচ্ছে না। জাপা কো-চেয়ারম্যান কাজী ফিরোজ রশিদ এমপি বলেন, ‘বিষয়টি জটিল। সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকলেই হয় না।’

দশম সংসদে জাপার ৪০ এমপির ৩৪ জনের সমর্থন পেয়েছিলেন কাজী ফিরোজ। পরে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের স্বাক্ষরিত সমর্থনপত্রও পেয়েছিলেন। কিন্তু স্পিকারের স্বীকৃতি পাননি। রওশন এরশাদের বিরোধিতায় বিরোধীদলীয় উপনেতা হতে পারেননি কাজী ফিরোজ।

জাপা নেতারা জানান, মসিউর রহমান রাঙ্গা ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের পর রওশন এরশাদের কারণেই প্রতিমন্ত্রী হয়েছিলেন। সরকারের সঙ্গেও সখ্য রয়েছে। রওশন এরশাদের টেলিফোন পেয়ে পক্ষ বদল করেছিলেন। এক নেতা বলেছেন, ‘রাঙ্গা না বুঝেই লাফ দিয়েছিলেন। কিন্তু লাফিয়ে পড়ে দেখেন পাশে কেউ নেই। তিনিও এখন বুঝতে পারছেন, সরকার রওশন এরশাদকে বিরোধীদলীয় নেতা রাখার পক্ষপাতী হলেও জি এম কাদেরকে দূরে ঠেলে দিতে চায় না।’

এ বিষয়ে মসিউর রহমান রাঙ্গা বলেন, ‘রওশন এরশাদের কারণেই জাপা সংসদে ভালো অবস্থানে রয়েছে। কিন্তু সরকারবিরোধী বক্তব্যের কারণে আওয়ামী লীগের সঙ্গে নিশ্চিতভাবেই জি এম কাদের ও জাপার সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হয়েছে।’ তবে তিনি এও বলেছেন, জি এম কাদেরকে দলের চেয়ারম্যান হিসেবে মানেন ও সম্মান করেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Check Also

অব্যাহত অস্থিরতা চালের বাজারে

দীর্ঘদিন ধরে সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে থাকায় চালের বাজারের অস্থিরতা কমছে না। গত এক বছরেরও বেশ…