Home জাতীয় ডাকসু নির্বাচনেও ভোটাররা প্রতারিত হবেন: মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম
জাতীয় - সর্বশেষ সংবাদ - ফেব্রুয়ারি ২৬, ২০১৯

ডাকসু নির্বাচনেও ভোটাররা প্রতারিত হবেন: মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম

মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম।

দীর্ঘ আড়াই যুগেরও বেশি সময় বন্ধ ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচন। বহু প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে সব দলের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ডাকসু নির্বাচন। ১১ মার্চ অনুষ্ঠেয় এ নির্বাচন ঘিরে ক্যাম্পাসে ক্রিয়াশীল সব ছাত্র সংগঠনের মধ্যে আগ্রহ ও তুমুল উদ্দীপনা বিরাজ করছে। আশাজাগানিয়া এ নির্বাচন ঘিরে রয়েছে শঙ্কাও। ইতিমধ্যে প্যানেল ঘোষণা করেছে সব ছাত্র সংগঠন। সব মিলিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী, ছাত্র সংগঠন, ডাকসুর সাবেক নেতাসহ দেশবাসীর আলোচনার অন্যতম বিষয় হয়ে উঠেছে- ডাকসু নির্বাচন।

 

দীর্ঘ ২৮ বছর পর অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া ডাকসু নির্বাচন নিয়ে যুগান্তরের সঙ্গে একান্ত আলাপচারিতায় জীবন ডায়েরি থেকে ইতিহাসের অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছেন বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সভাপতি ও স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) প্রথম সহসভাপতি (ভিপি) মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন যুগান্তরের রিপোর্টার রীনা আকতার তুলি।

: দীর্ঘ ২৮ বছর পর হতে যাচ্ছে ডাকসু নির্বাচন। এ নির্বাচন নিয়ে আপনি কতটা আশাবাদী?

মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম: ২৮ বছর পর ডাকসু নির্বাচন হতে যাচ্ছে। প্রথম কথা হলো- এখনকার বাস্তবতায় বাংলাদেশে যা ঘোষণা দেয়া হয় তা সুষ্ঠুভাবে হবে এ রকম কোনো নিশ্চয়তা দেয়া যায় না। সুতরাং ১১ তারিখে যে নির্বাচনটি হওয়ার ঘোষণা দেয়া হয়েছে, তা শেষ পর্যন্ত হয় কিনা তা নিয়ে শঙ্কা থেকে যায়। শঙ্কা থাকাটাই এখন রেওয়াজ হয়ে গেছে।

নির্বাচন নিরপেক্ষ, গ্রহণযোগ্য ও সুষ্ঠু হওয়া কথা যদি বলি, তা হলে বলতে হয়- গত বছরের ৩০ ডিসেম্বর দেশে একটি জাতীয় নির্বাচন হয়েছে। সেটি মোটেও সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য হয়নি। ওই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে একটি ভুয়া সংসদ গঠন করা হয়েছে। এটি ছিল শাসকশ্রেণির একটি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা। এই ভুয়া নির্বাচন বন্ধে সাধারণ মানুষের ইচ্ছা থাকলেও তারা তা প্রতিরোধ করতে পারেনি। এ জন্য ডাকসু নির্বাচনেও সাধারণ শিক্ষার্থীরা তাদের ভোটাধিকার স্বাধীনভাবে প্রয়োগ করতে পারবে বলে আমার মনে হয় না। ভোটাররা এ নির্বাচনেও প্রতারিত হবে।

 

নির্বাচন সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য করতে ছাত্ররা কী ধরনের ভূমিকা রাখতে পারে বলে আপনি মনে করেন?

মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম: ভোট অধিকার খর্ব করা আমাদের দেশে একটি সংস্কৃতিতে পরিণত করা একটি ব্যবস্থায় রূপ নিয়েছে। সেই দেয়াল ভাঙার দায়িত্ব ইতিহাসের অন্য সময়ের মতে সব ছাত্রের ওপরে নির্ভর করছে। যেহেতু ছাত্রসমাজের অধিকার রক্ষার অগ্রণী প্রতিষ্ঠান হচ্ছে ডাকসু। তাই এ নির্বাচনে সব অগণতান্ত্রিক, স্বৈরতান্ত্রিক ও ভোট কারচুপি ভাঙার ছাত্রদের দায়িত্ব। এ জন্য ছাত্ররা দাবি করেছে- হলগুলোতে ভোট না নিয়ে একাডেমিক ভবনগুলোতে ভোট নেয়া হোক। যাতে করে সব ছাত্র সংগঠনের প্রার্থীদের নির্বাচনী বার্তা ক্যাম্পিংয়ের মাধ্যমে পৌঁছে দেয়া যেতে পারে। তবে এটি করতে দেয়া হচ্ছে না। এটি জুয়েলারি কী ম্যাজিক দেখাবে তারাই জানে। তাই ডাকসু নির্বাচন হবে আরও একটি প্রহসন। যেটি জাতীয় পর্যায়েও করা হয়েছিল।

সব ছাত্র সংগঠনের অংশগ্রহণে ডাকসু নির্বাচন হচ্ছে। তবু শঙ্কা কেন?

মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম: ২৮ বছর ডাকসু নির্বাচন হয়নি। এটিকে আমি বড় রকমের অপরাধ মনে করি। এ অপরাধ ছাত্রসমাজের বিরুদ্ধে। এই অপরাধ শিক্ষার বিরুদ্ধে। প্রায় ৪০ হাজারের মতো সাধারণ ছাত্র রয়েছে, যারা ভোট দিতে পারবে, তারা যদি এগিয়ে আসে, যদি সততা ও সক্রিয়ভাবে ঐক্যবদ্ধভাবে নির্বাচনে অংশ নেয়, তবেই ভোট সুষ্ঠু হওয়া সম্ভব। এ ছাড়া সমাজতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক দলও এ ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারে।

নির্বাচিত ডাকসু শিক্ষার্থীদের অধিকার রক্ষায় কি ভূমিকা রাখতে পারে?

মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম: শিক্ষা কেবলমাত্র বই মুখস্ত করা বা লেকচার শুনে বা কতগুলো তথ্য মুখস্ত বা কথা আতস্ত করা নয়। শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে- একজন দেশপ্রেমিক, মুক্তচিন্তার অধিকারী মানুষ গড়ে তোলা। তার জন্য ক্লাস, পরীক্ষা লাইব্রেরি- এগুলো যেমন প্রয়োজন তেমনি শিক্ষার বাইরে তার সমাজ, দেশপ্রেম ও উদার জিজ্ঞাসার জন্য ছাত্র সংসদ অপরিহার্য।

২৮ বছর ধরে নির্বাচন হচ্ছে না। এতে শিক্ষার্থীরা কতটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে আপনি মনে করেন?

মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম: দীর্ঘদিন ডাকসু নির্বাচন বন্ধ ছিল। আমি মনে করি এটি হচ্ছে ছাত্রদের মৌলিক গণতান্ত্রিক অধিকারকে খর্ব করা। শিক্ষা থেকে শুরু করে তাদের সুখ-দুঃখ ইত্যাদি ব্যক্ত করার সুযোগ ছিল না এই ভোট না হওয়ার কারণে। ডাকসু নির্বাচন না হওয়ায় ছাত্রদের ক্ষতি হয়েছে। কারণ তাদের শূন্যস্থান দখল করে রেখেছে পেশিশক্তি ও তথাকথিত ক্যাডার বাহিনীকে দিয়ে দুর্গ গড়ে তোলা হয়েছে। ফলে একটি অপরাধের জগত ও অপরাধের পরিচালিত এবং নিয়ন্ত্রিত প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে উঠেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

২৮ বছর পর নির্বাচন দেয়াটাকেই কি আপনি যথেষ্ট মনে করছেন?

মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম: ২৮ বছর পর নির্বাচন দেয়াটাই আমি যথেষ্ট মনে করি না। আমি মনে করি বছর বছর নির্বাচন দেয়া হোক। বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক ক্যালেন্ডারে যেমন দিন-তারিখ নির্ধারিত থাকে, তেমনি নির্বাচনের দিন-তারিখও নির্ধারিত থাকা উচিত। পরীক্ষা বা নির্বাচন সঠিক সময়ে না হলে কর্তৃপক্ষকে জবাবদিহি করা উচিত বলে আমি মনে করি। ছাত্র সংসদ শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নয়, দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে থাকা উচিত। এতে গণতান্ত্রিক ধারা বজায় থাকবে।

স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) আপনি প্রথম সহসভাপতি ছিলেন। ওই সময়ে আপনার সুখকর কোনো স্মৃতির কথা জানতে চাই।

মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম: সুখকর স্মৃতি অনেক আছে, তবে দুটি কথা বলতে চাই- প্রথমত ছাত্রদের সিটের খুবই সমস্যা ছিল ওই সময়ে। আমরা ভিসি স্যারকে বলে টাকা বরাদ্দ নিয়েছিলাম এবং ডাকসুর নেতৃত্বে ছাত্রদের নিয়ে স্বেচ্ছাশ্রমে এফ রহমান হলের টিনশেডঘর নতুন করে নির্মাণ করা হয়েছিল।

দ্বিতীয়ত আমাদের সময়ে ডাকসুর অনবদ্য অবদান ছিল অপরাজেয় বাংলা নির্মাণ। নানা ঘাতপ্রতিঘাত পেরিয়ে দীর্ঘ সাত বছরে এটি নির্মাণ করা হয়েছিল, যা এখনও সারা দেশের ছাত্রসমাজের দ্রোহ-সংগ্রামের প্রতীক হয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে।

১৯৭৩ সালের ১ জানুয়ারি পুলিশ ছাত্রদের ওপরে গুলি চালানোর ঘটনাটি আসলে কী ছিল? মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম: ১৯৭৩ সালের ১ জানুয়ারি ডাকসু ও ছাত্র ইউনিয়নের কলাভবনের বটতলা থেকে ভিয়েতনামের মুক্তি সংগ্রামের প্রতি সংহতি জানানোর জন্য রাজপথে একটি মিছিল বের করা হয়। মিছিলটি প্রেসক্লাবের সামনে এলে পুলিশ ছাত্রদের ওপর গুলিবর্ষণ করে।শত শত রাউন্ড গুলিতে সেদিন নিহত হয়েছিল ছাত্রনেতা মতিউল ইসলাম ও মির্জা কাদের। আহত হয়েছিলেন অনেকেই। ওই সময়ে আওয়ামী সরকারের দ্বারা সংগঠিত এই হত্যাকাণ্ডের তীব্র প্রতিবাদ জানানো হয়েছিল। ২ জানুয়ারি দেশব্যাপী হরতাল পালন ও সরকারপ্রধান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে আজীবন ডাকসুর সদস্যপদ প্রত্যাহারের দাবি জানানো হয়েছিল এবং তার ছবি নামিয়ে ফেলা হয়েছিল ছাত্র সংসদ থেকে।

এবারের ডাকসু নির্বাচনে কেমন নেতৃত্ব আশা করেন? মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম: প্রগতিশীল ছাত্রসমাজ যদি নির্বাচনে জয়ী হয়, তবে ছাত্রদের জন্য মঙ্গলজনক। শুধু ভোটের সময় ছবি প্রচার করলে হবে না। যারা যৌন নির্যাতন, ধর্ষণের বিরুদ্ধে, কোটা আন্দোলনসহ বিভিন্ন আন্দোলনে সংগ্রাম করেছে, তাদের মাধ্যমে নতুন নেতৃত্ব এলে সাধারণ ছাত্ররা উপকৃত হবে। পাশাপাশি ডাকসু তার পুরনো ঐতিহ্য ফিরে পাবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Check Also

‘প্রস্তুতি বহু আগে থেকে ছিল’

নির্বাচন কমিশন (ইসি) গঠনে আইন পাসের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, সরকার অনেক দিন …