Home সাক্ষাৎকার দূরত্ব কমিয়ে আনতে পারে জাতীয় সংলাপ

দূরত্ব কমিয়ে আনতে পারে জাতীয় সংলাপ

আনিসুল হক। বাংলাদেশে পরপর দু’বার আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী প্রথম ব্যক্তি। ২০১০ সালে তিনি সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী হন। বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলা ও জেলহত্যা মামলার প্রধান প্রসিকিউটর। পিলখানা হত্যা মামলাসহ আলোচিত অসংখ্য ফৌজদারি মামলার প্রধান আইনজীবী। ২০১৪ সালের নির্বাচনে তিনি ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৪ আসনে সাংসদ নির্বাচিত হন। সুষ্ঠু নির্বাচন ও নির্বাচনী ব্যবস্থা নিয়ে তিনি কথা বলেছেন সমকালের সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সিনিয়র রিপোর্টার আবু সালেহ রনি

এবারই প্রথম আইনের মাধ্যমে নির্বাচন কমিশন (ইসি) গঠিত হলো। নতুন ইসি সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন কী?
আনিসুল হক নতুন কমিশন গঠনে সম্পূর্ণভাবে আইন অনুসরণ করা হয়েছে। সার্চ কমিটি এই কমিশন গঠনের জন্য অংশীজনের সাক্ষাৎকার নিয়েছে, তাদের মতামত নিয়েছে। এরপর কমিটি আইনের আওতায় প্রথমবারের মতো গণশুনানি করে যে ১০ জনের নাম রাষ্ট্রপতির কাছে পাঠিয়েছে, সেখান থেকে পাঁচজনকে নিয়ে নতুন কমিশন গঠন হয়েছে। সেই বিবেচনায় মহামান্য রাষ্ট্রপতি ১০ জনের মধ্য থেকে যাদের নিয়ে নতুন ইসি গঠন করেছেন, তা অত্যন্ত সুচিন্তিত। আমি বিশ্বাস করি- এই ইসি একটি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন বাংলাদেশকে দিতে সমর্থ।

বেসরকারি সংস্থা সুজনসহ কয়েকটি সংগঠন সার্চ কমিটির সুপারিশপ্রাপ্ত অপর পাঁচজনের নাম প্রকাশের দাবি জানিয়েছে।
এ বিষয়ে আপনার অবস্থান কী?

আনিসুল হক :আইনে তাদের নাম প্রকাশের ক্ষেত্রে কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। তবে সবকিছুই কিন্তু আমাদের সমাজ ব্যবস্থার সঙ্গে সংগতি রেখে করা উচিত। আমি মনে করি, আমাদের সমাজ বাস্তবতায় অপর পাঁচজনের নাম প্রকাশ করা উচিত হবে না। কারণ, তখন বংশপরম্পরায় ওই পাঁচজনের বিষয়ে বলা হবে, নাম প্রস্তাব করা হলেও তারা নিয়োগ পাননি। এটি তাদের জন্য বিব্রতকর। তাই নাম প্রকাশ না করাটাই সুচিন্তিত হয়েছে বলে মনে করি।

ইসি গঠনের জন্য সার্চ কমিটি রাষ্ট্রপতির কাছে যে নামগুলো দিয়েছে, তা কোন রাজনৈতিক দল বা কোন ব্যক্তির ছিল, তা প্রকাশেরও দাবি উঠেছে। এ বিষয়ে আপনার অবস্থান কী?

আনিসুল হক :ইসি গঠনের জন্য আইন করার সময় সুজনসহ অনেকেই কিছু পরামর্শ দিয়েছিলেন। তার অনেকগুলো বা কিছু আমরা নতুন আইন করার সময় গ্রহণ করেছি। আগেও বলেছি, আমাদের সংস্কৃতিতে যেটা প্রযোজ্য, আমাদের সেটাই গ্রহণ করতে হবে। এই আইন করার সময়ও তা-ই করা হয়েছে। আমেরিকায় সিনেটে বিচারকদের শুনানি হয়। কিন্তু আমাদের দেশের বাস্তবতায় সেটি করলে কিন্তু ঠিক হবে না। আইনটি সঠিকভাবেই করা হয়েছে। আরেকটা কথা বলা প্রয়োজন, এই যে সুজন বা আরও যারা আছেন, তাদের আসল উদ্দেশ্য কিন্তু পরিস্কার। তাদের বক্তব্য হচ্ছে, এই কমিশন বা এই সরকারের অধীনে তারা নির্বাচন করবেন না। এ জন্য তারা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কথা বলছেন। সেখানে আমার বক্তব্য হচ্ছে, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রথা উচ্চ আদালতের রায়ে অবৈধ ঘোষণা করা হয়েছে। রায়ের পর্যবেক্ষণে আরও বলা হয়েছিল, পরবর্তী দুটি সংসদ নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে হতে পারে, যদি সংসদ রাজি হয়। কিন্তু সংসদ তাতে রাজি হয়নি। তাই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের যে দাবি তারা করছেন, সেটা বেআইনি।

সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজনের দায়িত্ব কমিশনের, এই দায়িত্ব পালনে ইসির সম্ভাব্য চ্যালেঞ্জ কী হতে পারে?

আনিসুল হক :তাদের প্রথম চ্যালেঞ্জ, কিছু রাজনৈতিক দল তাদের ওপর আস্থার একটা সমস্যা তৈরি করবে। আমার বিশ্বাস, তারা এই চ্যালেঞ্জ সফলভাবেই মোকাবিলা করতে পারবেন। কারণ, তারা যোগ্য ব্যক্তি। জাতীয় নির্বাচনের আগে যদি দু-একটি নির্বাচন, অর্থাৎ উপনির্বাচন হয় অথবা জেলা পরিষদ বা ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন হয় এবং এগুলো যদি তারা সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে পারেন, তাহলে তাদের ওপর জনগণের আস্থা আরও সুদৃঢ় হবে। আর যাদের আস্থা নেই, তাদের ইসি দেখাতে সক্ষম হবে, তারা সুষ্ঠু নির্বাচন করতে পারে। তারা আস্থা রাখবেন কিনা, সেটা তার পরের সিদ্ধান্ত।

নির্বাচনে ইভিএমের ব্যবহার নিয়ে বিএনপিসহ কয়েকটি রাজনৈতিক দলের আপত্তি রয়েছে। প্রধান নির্বাচন কমিশনারও বলছেন, এটি সম্পর্কে তার তেমন জানাশোনা নেই। এই ইভিএম সুষ্ঠু নির্বাচনে কীভাবে ভূমিকা রাখতে পারে?

আনিসুল হক :আমার অভিজ্ঞতা থেকে বলি। আমার সংসদীয় আসনে দুটি উপজেলায় নির্বাচন এই ইভিএমের মাধ্যমে করিয়েছি। সেখানে মুক্ত নির্বাচন হয়েছে। জনগণ বলেছে, এই নির্বাচন অত্যন্ত ফেয়ার হয়েছে। ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন কিন্তু স্থানীয় সরকারের নির্বাচন হলেও গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচন। এখানে জনগণের অংশগ্রহণ সবচেয়ে বেশি। সেখানে জনগণ যদি ইভিএম নিয়ে এমন ফিডব্যাক দেয়, তাহলে আমি কিন্তু এ নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারি না। এখানে আরেকটি কথা বলতে চাই। প্রধান নির্বাচন কমিশনার বলেছেন, ইভিএমের ব্যাপারে তিনি তেমন জানেন না। তিনি জেনে নিক। জানার পরে যদি মনে করেন, এ ব্যাপারে কোনো সংস্কার, প্রশিক্ষণের প্রয়োজন আছে, তাহলে এ ব্যাপারে ইসি সিদ্ধান্ত নিতে পারে।

ইভিএম নিয়ে সন্দেহের কোনো অবকাশ আছে কি?

আনিসুল হক :এটি ব্যবহার করলেই বরং এ নিয়ে সন্দেহ দূর হয়ে যাবে।
নির্বাচন ইস্যুতে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সংলাপের প্রয়োজন আছে কিনা। সে ক্ষেত্রে করণীয় কী হতে পারে?

আনিসুল হক :দেশের স্বার্থে রাজনৈতিক সংলাপ থাকা ভালো। এটি আমরা উৎসাহিত করি। গত নির্বাচনের আগেও কিন্তু প্রধানমন্ত্রী সব দলের সঙ্গে সংলাপ করেছেন, ইসি গঠন করার আগেও কিন্তু রাষ্ট্রপতি সব রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সংলাপ করেছেন। এই সংলাপ কিন্তু আমাদের দেশের বিভাজন আর রাজনৈতিক দূরত্ব কমিয়ে আনার প্রয়াস। আমরা অবশ্যই সংলাপের পক্ষপাতী।

নির্বাচনী ব্যবস্থা সংস্কারের কোনো প্রয়োজন আছে কি? সংলাপের বিষয়টি আইনি বাধ্যবাধকতার মধ্যে আনা যায় কিনা?

আনিসুল হক আমি কখনোই বলব না, সংস্কার করা উচিত নয়। এটি চলমান প্রক্রিয়া। অভিজ্ঞতার সঙ্গে এসব বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হয়। যদি নির্বাচন, নির্বাচনের পন্থা আর প্রক্রিয়াকে আরও উন্নত করার কথা বলেন- তাহলে আমার মনে হয়, নির্বাচন কমিশন এ জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত। তারা যদি তাদের অভিজ্ঞতা থেকে মনে করে সংস্কার প্রয়োজন, তারা সেটি করবে। কিন্তু সংস্কারের প্রয়োজন নেই- এমন কিছু বলা ঠিক নয়।

কয়েকটি রাজনৈতিক দল জাতীয় সরকার গঠনের কথা বলছে- এ বিষয়টি কীভাবে দেখছেন?

আনিসুল হক এসব কথার ভিত্তি নেই। ‘৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পর ব্যক্তিস্বার্থে সামরিক সরকারের প্রথা তৈরি হয়েছিল। সেই প্রথা থেকে আমরা বেরিয়ে এসেছি। গণতন্ত্র এখানে এখন স্থায়িত্ব পেয়েছে। সেই স্থায়িত্বের জন্য সাংবিধানিক প্রক্রিয়াটি চলমান থাকা উচিত। এখানে কোনো নতুন আইডিয়া এনে এই প্রক্রিয়ায় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা উচিত নয়।

যুদ্ধাপরাধী দল জামায়াতের নেতাকর্মীরা স্বতন্ত্র বা বিএনপিসহ কিছু রাজনৈতিক দলের ব্যানারে নির্বাচন করছেন। তাদের বিষয়ে নির্বাচন-সংশ্নিষ্ট আইন সংশোধনের প্রয়োজন দেখছেন কিনা। এ নিয়ে সরকারের ভাবনা কী?

আনিসুল হক ইসি একটি সাংবিধানিক কমিশন। এসব ব্যাপারে আমি সরকারের প্রতিনিধি হিসেবে কোনো কথা বললে ইসি বা তার স্বাধীনতার ব্যাপারে জনমনে প্রশ্ন উঠতে পারে। এই ইসিকে কোনো গাইডলাইন দিতে চাই না। তারা সুষ্ঠু নির্বাচন করার ব্যাপারে যেভাবে প্রয়োজন সিদ্ধান্ত দেবে, তারা স্বাধীন। তারা নিজেরাই সিদ্ধান্ত নেবে।

যুদ্ধাপরাধী দল জামায়াতের রাজনীতি নিষিদ্ধের বিষয়টি তাহলে ঝুলে থাকছে?

আনিসুল হক জামায়াত বিএনপির ছত্রছায়ায় রাজনীতি করছে। আমি বলছি না, দলটির বিচার হবে না। আদালতে বিষয়টি বিচারাধীন। এই বিচারের ব্যাপারে যে প্রতিবন্ধকতা, সেগুলো আমরা দূর করবই। এ নিয়ে আমার কোনো দ্বিমত নেই। কিন্তু দলটির রাজনীতি নিষিদ্ধ হলে তারা যে আবার বিএনপির ছত্রছায়ায় রাজনীতি করবে না, এটি আমি কী করে বলতে পারব! আবার জামায়াতের বিচার হলে কাদের বিচার হবে, সেটাও দেখতে হবে। দলের কার্যক্রম বন্ধ হলেই যে তাদের কার্যক্রম বন্ধ হবে তা কি বলা যাবে? তারা যদি অন্য দল গঠন করে কার্যক্রম পরিচালনা করে? হ্যাঁ, তাদের এসব কার্যক্রমও বন্ধ করা যাবে- যখন জনগণের কাছে তারা যাবে, তখন জনগণ যদি তাদের প্রত্যাখ্যান করে। আমি জনগণের কাছে আহ্বান জানাব, জনগণ যেন তাদের প্রত্যাখ্যান করে।

আগামী নির্বাচনে রাজনৈতিক দলগুলোর ইশতেহারে কোন বিষয়গুলো প্রাধান্য পাবে বলে মনে করছেন?

আনিসুল হক আমাদের একটি ইশতেহার আছে। এই পাঁচ বছরে কী করতে পেরেছি আর কী করতে পারিনি, তার একটা মূল্যায়ন হবে। যা করতে পারিনি, তা বাস্তবায়নের প্রসঙ্গও ইশতেহারে থাকবে। তার সঙ্গে নতুন বাস্তবতার পরিপ্রেক্ষিতে কী কী করতে হবে, সেগুলো যুক্ত হবে। যেমন ধরেন, কভিড পরিস্থিতি, এটি মোকাবিলা করার প্রসঙ্গও অবশ্যই নির্বাচনী ইশতেহারে থাকবে।

উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে বেশ কিছু এলাকায় সহিংসতা হয়েছে, দেড় শতাধিক ব্যক্তি প্রাণ হারিয়েছেন। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এমন সহিংসতা এড়াতে করণীয় কী? সহিংসতার আশঙ্কা করছেন কি?
আনিসুল হক যে গণতান্ত্রিক ধারার প্রাতিষ্ঠানিক রূপ আমরা দিয়ে ফেলেছি, সেই ধারাকে যদি কেউ বেআইনিভাবে নষ্টের চেষ্টা করে তাহলে প্রচলিত আইন দিয়ে, অর্থাৎ আইনের আওতায় তাদের মোকাবিলা করা হবে।

নারীর ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে সংসদের ৫০টি আসন তাদের জন্য সংরক্ষিত রাখা হয়েছে। এরই মধ্যে কয়েক দফা এর মেয়াদও বাড়ানো হয়েছে। এই আসনগুলো উন্মুক্ত করার প্রয়োজনীয়তা দেখছেন কি?
আনিসুল হক এখনও প্রয়োজন নেই। তবে অদূর ভবিষ্যতে হবে কিনা, বলা যাচ্ছে না।

আপনাকে ধন্যবাদ।

আনিসুল হক আপনাকেও ধন্যবাদ।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Check Also

সুইডেন-ফিনল্যান্ডের ন্যাটোর সদস্য হতে আবেদন

যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট ন্যাটোর সদস্যপদের জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে আবেদন করেছে রা…