Home জাতীয় দেশে সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য জাতীয় সরকার গঠন করতে হবে

দেশে সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য জাতীয় সরকার গঠন করতে হবে

দেশে সুষ্ঠু নির্বাচনের ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনতে এখনই জাতীয় সরকার গঠনের আহ্বান জানিয়েছেন গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ডা: জাফরুল্লাহ চৌধুরী। তিনি বলেন, দেশে গণতন্ত্র ও সুশাসন ফিরিয়ে আনতে হলে আগে দুই বছর মেয়াদি একটি জাতীয় সরকার গঠন করতে হবে। আগামী জাতীয় নির্বাচন সুষ্ঠু হলে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলেও মনে করেন এ দেশবরেণ্য ব্যক্তিত্ব।

ধানমন্ডির গণস্বাস্থ্য নগর হাসপাতালে তার নিজ চেম্বারে  দেয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি এসব কথা বলেন। দীর্ঘ আলাপচারিতায় দেশের রাজনীতি-অর্থনীতিসহ বর্তমান সামগ্রিক অবস্থা, আগামী নির্বাচন ও সাম্প্রতিক লন্ডন সফর নিয়ে কথা বলেন ডা: জাফরুল্লাহ চৌধুরী। গত ২৫ মার্চ থেকে ১৫ এপ্রিল পর্যন্ত লন্ডন সফর করেন তিনি। এ সময় ‘ভয়েজ ফর গ্লোবাল বাংলাদেশিজ’ এর উদ্যোগে তাকেসহ প্রবাসী মুক্তিযোদ্ধাদের সংবর্ধনা দেয়া হয়। এ ছাড়া গত ৩১ মার্চ লন্ডনে পৃথক এক নাগরিক সংবর্ধনায় তাকে মুক্তিযুদ্ধ, দেশগঠন ও জাতির বিবেক হিসেবে সর্বস্তরের জনগণের কাছে মান্যবর ব্যক্তিত্বের স্বীকৃতি হিসেবে ‘দেশমান্য’ খেতাবে ভূষিত করা হয়। সাক্ষাৎকারের মূল অংশটুকু এখানে তুলে ধরা হলো-

সম্প্রতি লন্ডনে একটি সম্মাননা গ্রহণ করতে গিয়েছিলেন। এ নিয়ে কিছু লোক বিতর্ক করছে; এ বিষয়ে যদি কিছু বলেন?

ডা: জাফরুল্লাহ চৌধুরী : এ নিয়ে বিতর্ক করার কিছুই নেই। যারা সম্মাননা দিয়েছে তারা খুবই সুপরিচিত একটি সংগঠন। শুধু ব্রিটেন নয় বহির্বিশ্বের আরো অনেকগুলো বড় দেশে থাকা প্রতিথযশা প্রবাসী বাংলাদেশীরা এ সংগঠনটি গড়ে তুলেছেন। যে ভেনুতে (হাউজ অব কমনস) অনুষ্ঠানটি হয়েছে সেখানে কোনো অনুষ্ঠান করতে হলে ব্রিটেনের রাণীর অনুমতি নিতে হয়। তা ছাড়া তারা মুক্তিযুদ্ধের সময় প্রবাসে থেকে যারা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে ভূমিকা রেখেছে তাদের অবদানের স্বীকৃতি দিয়েছে। এখানে কোনো আওয়ামী লীগ-বিএনপি দেখা হয়নি। ফলে যারা বিতর্ক করছে তারা ঠিক করছে না।

দেশের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে কিছু বলুন।

ডা: জাফরুল্লাহ চৌধুরী : বর্তমানে দেশে সুষ্ঠু গণতন্ত্র নেই। প্রতিনিয়ত মানুষ খুন হচ্ছে। আমেরিকার নিষেধাজ্ঞার কারণে গুম-বিচারবহির্ভূত হত্যা কিছুটা কমলেও সাম্প্রতিককালে একটি ক্রসফায়ারের ঘটনা ঘটেছে। ফলে এটা চিরতরে বন্ধ হয়ে গেছে বলা যাবে না। নিষেধাজ্ঞা কেটে গেলে বরং এটি আরো বেশি মাত্রায় বাড়তে পারে।

এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণের উপায় কী?

ডা: জাফরুল্লাহ চৌধুরী : পরিত্রাণের একটিই উপায়; তাহলো- সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন হওয়া। আর এ জন্য এখনই জাতীয় সরকার গঠন করতে হবে। সে সরকারে ২০-২৫ জন বিশিষ্ট ব্যক্তিদের নিয়ে হবে। তাতে আওয়ামী লীগ-বিএনপিসহ নিবন্ধিত-অনিবন্ধিত সব বড় দলের প্রতিনিধি থাকবে। তা ছাড়া ৫-৭ সদস্যের একটি উপদেষ্টা পরিষদও থাকবে। সেখানেও রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি থাকবে। এ সরকার থাকতে হবে দুই বছর। এ সরকার আগে দেশের শাসন ও নির্বাচনব্যবস্থা ঠিক করবে। এ জন্য কিছু আইনের পরিবর্তন দরকার হবে। দেশ থেকে দুর্নীতির সামগ্রিক পরিস্থিতি পরিবর্তন করবে। নির্বাচন কমিশনকে শক্তিশালী করবে। নির্বাচন যাতে আগের রাতে না হয় তা বন্ধ করবে। নির্বাচনে প্রশাসনের হস্তক্ষেপ বন্ধ করবে। নির্বাচনের পরপর সারা দেশে যে সহিংস ঘটনা ঘটে তা বন্ধ করবে। এরপর তারা সব দলকে নিয়ে একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের আয়োজন করবে। জাতীয় সরকারের জন্য বর্তমান সংসদে ম্যান্ডেট দরকার বলেও তিনি মনে করেন।

বর্তমান সরকারের অধীনে কি সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়?

ডা: জাফরুল্লাহ চৌধুরী : এ সরকারের অধীনে কোনোভাবেই সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়- এটা প্রমাণিত। ২০১৪ সালে সুষ্ঠু নির্বাচন হয়নি। ২০১৮ সালে আগের রাতে ভোট হয়েছে- এটা সবাই জানে। পুলিশ দিয়ে প্রার্থী-ভোটারদের ভয় দেখানো হয়েছে। এ জন্যই আমি জাতীয় সরকারের কথা বলছি, যারা দেশে একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশ তৈরি করবে। দেশে দলীয় সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচনের কোনো সম্ভাবনা নেই।

বর্তমান সরকারের সময়ে তো দেশে অনেক উন্নয়ন হচ্ছে। তাহলে সরকার কেন পরিবর্তন করতে হবে?

ডা: জাফরুল্লাহ চৌধুরী : সরকার কিছু ক্ষেত্রে উন্নয়ন করছে এটা অবশ্যই বলতে হবে। সারা দেশে ঘরে ঘরে এখন বিদ্যুৎ পৌঁছে দিয়েছে সরকার। পদ্মা সেতু করেছে। কিন্তু বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে গিয়ে কুইক রেন্টালের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকার দুর্নীতি হয়েছে। পদ্মা সেতু ১০ হাজার কোটি টাকা থেকে শুরু করে এখন ৫০ হাজার কোটি টাকায় গিয়ে ঠেকেছে। করোনা পরিস্থিতি ভালোভাবে মোকাবেলা করেছে। কিন্তু সাত ডলারের টিকা দ্বিগুণ দামে কেনা হয়েছে। এসব দুর্নীতির কথাও বলতে হবে। মূলত কথা হচ্ছে- দেশে কিছু উন্নয়ন হলেও তার সুফল সবাই পায়নি। ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য আরো বেড়েছে। টিসিবির গাড়ির পেছনে মানুষের লাইন, আর মারামারি দেখলেই এটা বোঝা যায়। প্রতিনিয়ত খুন হচ্ছে। ঘুষ-দুর্নীতি হচ্ছে। শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বাড়ছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অন্যায় করেও পার পেয়ে যাচ্ছে। এসব বন্ধে একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের বিকল্প নেই। সে নির্বাচনে জনগণ ভোট দিলে আওয়ামী লীগও ক্ষমতায় আসতে পারে। আবার বিরোধী দলও আসতে পারে। কারা ক্ষমতায় আসবে তার থেকে বড় কথা হলো- দেশে নির্বাচনের সুষ্ঠু ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনা প্রয়োজন। গণতন্ত্র ও সুশাসন দরকার। প্রধানমন্ত্রীর একচ্ছত্র ক্ষমতা কমাতে হবে। জবাবদিহিমূলক সরকার থাকতে হবে।

যদি জাতীয় সরকার গঠন না হয়, বর্তমান সরকারের অধীনেই নির্বাচন হয়, তাহলে কী হবে?

ডা: জাফরুল্লাহ চৌধুরী : তাহলে দেশের পরিস্থিতি ভয়াবহ হবে। দেশ একটি মাফিয়া স্টেটে পরিণত হবে। গুম-খুন দ্বিগুণ বেড়ে যাবে। কেউ শান্তিতে থাকতে পারবে না।

আমেরিকার নিষেধাজ্ঞা আগামী নির্বাচনে কোনো প্রভাব ফেলবে কি না?

ডা: জাফরুল্লাহ চৌধুরী : বিরোধী দলের উচিত হবে না নিষেধাজ্ঞার দিকে তাকিয়ে থাকা। আন্দোলন ছাড়া কোনো পরিবর্তন হয় না, হবেও না। জনগণকেই মাঠে নামতে হবে।

কিন্তু বিএনপি সেই অর্থে আন্দোলন গড়ে তুলতে পারছে না কেন?

ডা: জাফরুল্লাহ চৌধুরী : তাদের নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া জামিনে মুক্তি পাননি। সরকারের বিশেষ বিবেচনায় তিনি জেলের বাইরে রয়েছেন। তা ছয় মাস ছয় মাস করে বাড়ানো হচ্ছে। অথচ বিএনপি কোনো আন্দোলন করতে পারে না। এটা তাদের ব্যর্থতা। একইভাবে এটা বিচার বিভাগেরও ব্যর্থতা। এত বড় একটা অন্যায় হচ্ছে কিন্তু বিএনপি ঠিকমতো প্রতিবাদ করে না। তাদের উচিত সুপ্রিম কোর্ট এক সপ্তাহ ঘেরাও করে দাবি আদায় করে নিয়ে আসা। তা ছাড়া তাদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান বিদেশে থাকেন। তার পক্ষে দেশের সব অবস্থা বোঝাও সম্ভব না। এ জন্য তার উচিত দেশে যারা আছে বিশেষ করে স্থায়ী কমিটির ওপর সব দায়িত্ব দেয়া। তাদের প্রথম কাজ হবে বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তির জন্য আন্দোলন করা।

তারেক রহমান যদি এখন দেশে আসেন তাহলে আন্দোলনের গতি বাড়বে কি না?

ডা: জাফরুল্লাহ চৌধুরী : তারেক রহমানের এখন দেশে আসা ঠিক হবে না। তারেক রহমান এখন দেশে আসলে গুম-খুনের শিকার হতে পারেন। এর থেকে ভালো হবে তার মেয়ে জাইমা রহমানকে দেশে পাঠানো। সে একজন উচ্চশিক্ষিত এবং একটি গণতান্ত্রিক দেশে বড় হয়েছে। তার থেকে জাতি ভালো কিছু আশা করতে পারে।

বিরোধী দলের মধ্যে অনৈক্য রয়েছে বলে শোনা যায়, তাহলে আন্দোলন কিভাবে হবে?

ডা: জাফরুল্লাহ চৌধুরী : সরকার পরিবর্তন করতে হলে আন্দোলনের বিকল্প নেই। এ জন্য সম্মিলিত বিরোধী দল গড়ে তুলতে হবে। বিএনপি-জামায়াতকে তাদের সম্পর্ক নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। জামায়াতের রাজনীতি করার অধিকার আছে। তাদের নেতা অধ্যাপক গোলাম আজম ’৭১ সালের ভুলের জন্য একবার ক্ষমা চেয়েছিলেন। তাদের আবারো ক্ষমা চাওয়া উচিত। আমি মনে করি গোলাম আজম বেঁচে থাকলে আমার কথা রাখতেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Check Also

সুইডেন-ফিনল্যান্ডের ন্যাটোর সদস্য হতে আবেদন

যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট ন্যাটোর সদস্যপদের জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে আবেদন করেছে রা…