Home জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পদক্ষেপ নিতে হবে বয়োবৃদ্ধদের

নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পদক্ষেপ নিতে হবে বয়োবৃদ্ধদের

বর্তমান সমাজ এমনিতেই বুড়োদের নিয়ে শ্রান্ত, ক্লান্ত ও বিভ্রান্ত। তার মধ্যে ক্রমশ তাদের সংখ্যা বাড়ছে। এটা সমাজ স্তরে নিয়ে আনছে বিশেষ পরিবর্তন। এক সমীক্ষা সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশে গড় আয়ু ৭২ থেকে বেড়ে ৭৫ হয়েছে। কমেছে শিশুদের মৃত্যুর হারও। একদিকে এটা ভালো কথা, উন্নতির কথা। স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা ক্ষেত্রে উন্নতির অবদান হিসাবে এটাকে দেখা হচ্ছে। বর্তমানে শুধুমাত্র উন্নত মানের ওষুধই নয়, শরীরের যন্ত্রপাতি প্রতিস্থাপন করাও সম্ভব হচ্ছে। কসমেটিক সার্জারিরও ছড়াছড়ি। নানা অপারেশন করে শরীরের জটিল ক্ষত সারিয়ে ফেলা হচ্ছে। দু’একটি অসুখ ছাড়া প্রায় সবই আরোগ্যযোগ্য।

যাদের টাকাপয়সা আছে ও উন্নত সুযোগ-সুবিধা আছে, তাদের আয়ুও বেড়ে যাচ্ছে। আমাদের মতো গরিব দেশে গড় আয়ু যখন ৭৫, তখন ধনী বা উন্নত দেশে তা তো অচিরেই ৮০ ছাড়াবে। গরিব দেশে জনসাধারণ যেখানে ব্যক্তিগত খরচে চিকিৎসা করতে পারে না, সেখানে ভালো সরকারি ব্যবস্থায় চিকিৎসা হলে সমাজে কিছুটা সমতা আসে। যাক, ধরে নেওয়া গেল, সুযোগ যত বিস্তারিত হচ্ছে বা হবে গড় আয়ু ততই বাড়বে। ফলে প্রবীণদের সংখ্যা বেশি কিন্তু কোনো কোনো উন্নত দেশে যুবক/প্রবীণ প্রায় সমান। কোথাও প্রবীণ বেশি হবে, কারণ সেসব দেশে নবজাতকের সংখ্যা প্রায় শূন্যে ঠেকে যাচ্ছে বা যাবে। আমেরিকাতে এখন যারা প্রৌঢ়, তারা চিন্তা করছেন ভবিষ্যৎ প্রজন্ম তাদের বহন করার উপযোগী টাকার অঙ্ক সামাজিক সুরক্ষা ফান্ডে দিতে পারবে কি না। কারণ, সেখানে শিশু জন্মহার কমে যাচ্ছে। কোনো কোনো পরিবারে সন্তানও থাকছে না। মা-বাবা অর্থ উপার্জনে মশগুল, সন্তান ধারণ বা পোষণ করার সময় কোথায়? আবার অতিরিক্ত প্রোটিন গ্রহণ করায় সন্তান হচ্ছে না। তাই অনেকেই এখন দত্তক নিচ্ছেন। আমাদের দেশেও মধ্যবিত্ত সমাজে সন্তান কম। বড় জোর দুই। এক সন্তানও বেছে নিচ্ছেন কেউ কেউ। কারণ এদের ভালো করে মানুষ করতে হবে। ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, প্রফেসর, অফিসার  হচ্ছে সত্যি কিন্তু কতখানি মানুষ হচ্ছে কে জানে। যখন দেখা যায়, এরাই বৃদ্ধ পিতামাতার যথাযথ যত্ন নিচ্ছে না, তখন কষ্ট হয়। পত্র-পত্রিকায় তো মাঝে মাঝেই বৃদ্ধ পিতামাতার দুরবস্থার কথা উঠে আসে। বাড়ি নিজের নামে লিখিয়ে নিয়ে বাড়ি থেকে রাস্তায় বের করে দেয় নিজের মা-বাবাকে, এমন ঘটনাও ঘটছে। আবার খুব গরিব ঘরে বা অশিক্ষিতরা মা-বাবাকে যতটুকু পারে মর্যাদা দেয়। হয়তো ধর্মভীতি এখানে কাজ করে। তবে আস্তে আস্তে এই মানবধর্মটুকু বিদায় নিচ্ছে। যাই হোক, পারিবারিক ক্ষেত্রেই যেখানে সন্তান মা-বাবাকে বহন করতে চাইছে না বা পারছে না সেখানে সমাজ বা রাষ্ট্র কী করছে ভাববার বিষয়। কিছু কিছু সমাজসেবী সংস্থা বৃদ্ধনিবাস  চালু করেছে। বিনা খরচে বা কিছু টাকা নিয়ে বৃদ্ধদের সেবা প্রদান করছে। কোনো কোনো সংস্থা আবার বাড়ি গিয়ে সামান্য চাঁদার বিনিময়ে বৃদ্ধদের বিভিন্ন কাজ করে দেয়। কিন্তু খুব ভালোভাবে সব প্রতিষ্ঠান চলছে না।

সরকারও ছেলে-মেয়েরা যাতে মা-বাবাকে দেখে তার জন্য কিছু আইন চালুও করেছে। প্রচলন হয়েছে বৃদ্ধ ভাতার। সরকারচালিত ভালো বৃদ্ধাশ্রম চালু হলে ভালো হয়। যারা কোনো কাজ করতেন তাঁদের জন্য পেনশন স্কিম চালু আছে। তা ছাড়া, ইনস্যুরেন্স কোম্পানি, ব্যাংক ও পোস্ট অফিসে নানা মাসিক আয় প্রকল্প চালু আছে। এ প্রসঙ্গে বিভিন্ন দেশে পেনশন প্রকল্প নিয়ে একটি লেখার উপর সংক্ষেপে সামান্য আলোকপাত করা যাক। দি টেলিগ্রাফ পত্রিকায় কয়েক বছর আগে ‘টহধভভড়ৎফধনষব ষড়হমবারঃু’ শীর্ষক প্রবন্ধে লেখক খুব সুন্দরভাবে আলোচনা করেছেন। তিনি ‘ঞযব ঙৎমধহরুধঃরড়হ ভড়ৎ ঊপড়সড়সরপ ঈড়-ড়ঢ়বৎধঃরড়হ ধহফ ফবাবষড়ঢ়সবহঃ’ -এর রিপোর্টকে ভিত্তি করে বিশ্লেষণ করেছেন। কয়েকটি ধনী দেশ এই সংস্থা গড়েছে। এই সংস্থা সমীক্ষা করে দেখেছে যে, বিভিন্ন দেশ তিন ভাগে সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করছে। প্রথমত, কোনো কোনো দেশ অবসরের বয়স বাড়িয়ে দিয়েছে। সাধারণত জাতীয় গড় আয়ুর সাথে অবসরের বয়স এক করে দেওয়া হয়েছে। দ্বিতীয়ত, কেউ কেউ কন্ট্রিবিউটরি পেনশন স্কিমকে গুরুত্ব দিচ্ছে। ইক্যুইটি বা ন্যায়ের ভিত্তিতে কোথাও পেনশনের আয় বণ্টন করা হচ্ছে। তৃতীয়ত, কোনো কোনো দেশ তাদের নাগরিকদের বৃদ্ধ বয়সের জন্য বেশি সঞ্চয় করতে বাধ্য করছে।

এদিকে, ইউরোপীয়ান দেশগুলো যে পেনশন দেয় তা পেনশন প্রাপকের জমার পাঁচ ভাগের তিন ভাগ হয় মাত্র। তাই তাঁদের বাধ্য হয়ে পেনশনের পরও কাজ করতে হয়। ওইসব দেশে পেনশনের বয়স হল ছেলেদের বেলায় ৬২ বছর ও মেয়েদের ৬০ বছর। আবার কখনও চাকরির সর্বনিম্ন বয়স ৩৫ বা ৪০ বছর ধরে পেনশন দেয়। কোনো সরকার ওই সর্বনিম্ন বয়স থেকে বেশি কাজ করলে প্রতি বছর অতিরিক্ত বোনাস দেয়। তবে তাকে ট্যাক্স দিতে হয়। জাপানে এই ট্যাক্স কম তাই সে দেশে ৭৫ শতাংশ বৃদ্ধ কাজ করেন। বেলজিয়ামে এই ট্যাক্স বেশি তাই মাত্র ২০ শতাংশ বৃদ্ধ পেনশনের বেশি বয়স পর্যন্ত কাজ করেন। গ্রিসে আবার অবসরের পর কাজ করলে সারা জীবনের আয় ৮৫ শতাংশ কমে যাবে। তাই সেখানে অবসরের পর কেউ কাজ করেন না। আবার লু´েমবার্গের কর্মীরা সেখানে ক্ষতির ভয়ে ফ্রান্স বা বেলজিয়ামে গিয়ে কাজ করেন আর নিজেদের লুক্সেমবার্গের বাড়ি কোম্পানিকে ভাড়া দিয়ে আয় করেন। আরেকটি কথা হলো, সরকারের ইচ্ছা বৃদ্ধরা বেশিদিন কাজ করুন, তবে পেনশন ভার কমবে। কিন্তু বৃদ্ধরা বেশিদিন ধরে কাজ করলে তাঁদের বেতন বাড়বে ফলে শিল্প প্রতিষ্ঠানের খরচ বাড়বে। তাই নিয়োগকারীরা বৃদ্ধদের ছাঁটাই করে যুবকদের চাকুরি দেন। তা ছাড়া বৃদ্ধদের দক্ষতা কমে যায় বা পুরনো হয়ে যায়। তাঁরা নতুন করে সবসময় সব কিছু নিতেও পারেন না। তাই বিভিন্ন আইন করেও শিল্প প্রতিষ্ঠানে বৃদ্ধদের বেশিদিন কাজে রাখা সম্ভব হচ্ছে না। আমাদের দেশে যুবকদের মধ্যে বেকার সমস্যা এত বেশি যে, তারা বৃদ্ধদের বেশিদিন চাকরি করা পছন্দ করে না বা করবে না। আবার বৃদ্ধরা যে বসে বসে পেনশন পান এটাও ঠিক সহ্য করতে পারে না।

যাক দেখা যাচ্ছে, বিদেশে আইন করেও বৃদ্ধদের কাজের পরিধি বাড়ানো যাচ্ছে না। নিয়োগকারীরা যুবকদেরই পছন্দ করছেন। তবে দেশের নিয়োগ ক্ষমতা ভালো থাকলে যুবা-বৃদ্ধ সবাই কাজ পান। তবে সব দেশেই পেনশন ফান্ড বিভিন্ন জায়গায় খাটানো হয়। দুটি জিনিস মাথায় রাখা হয়। ১) কিছু টাকা অবশ্যই স্থির রাখতে হবে জীবন চলার জন্য। ২) টাকা খাটিয়ে ঝুঁকি নিয়ে লাভের চেষ্টা করা। তবে সরকার টাকা খাটানোর বিভিন্ন নিয়ম করে দেয়।

এদিকে দেখা গেছে, বিভিন্নভাবে টাকা খাটালেও লাভ খুব একটা হয় না। ২০১২ ও তার আগের পাঁচ বছরের হিসাবে ডেনিশ পেনশন ফান্ড ৬.১ শতাংশ বার্ষিক রিটার্ন পেয়েছে। এস্টনিয়াতে ৫.২ শতাংশ মূল্য হ্রাস হয়েছে। ওইসিডি যে ৩১টি দেশে সমীক্ষা করেছে তার মধ্যে ১৮টি দেশের পেনশন ফান্ড খাটিয়ে ক্ষতিই হয়েছে। কারণ, ঝধভবঃু বজায় রাখতে তারা সরকারি বন্ড

যাই হোক, সবদিক বিবেচনায় দেখা যাচ্ছে, ধনী দেশগুলো বর্তমানে পেনশনের সুবিধা কমাবার চেষ্টা করছে। কারণ, পেনশন ফান্ডে কুলাচ্ছে না। ওইসিডি বলছে, যেহেতু মানুষ দীর্ঘজীবী, তাই অবসরের বয়সের সীমা বাড়িয়ে দিতে হবে। যখন মানুষ আর কাজ করতে পারবেন না তখন তাদের শিশুদের মতো যত্ন করতে হবে। প্রফেসর দেশাইয়ের মতে, সেসব দেশে শারীরিক কষ্টে করণীয় কোনো কাজ নেই, তাই বৃদ্ধরা কাজ অনায়াসেই করতে পারবেন। সুতরাং অবসরের দরকার নেই। অনেকগুলো দেশের পেনশনের অবস্থা পর্যালোচনা করে বোঝা যাচ্ছে যে, আগে বৃদ্ধের সংখ্যা কম ছিল আর মৃত্যুও তাড়াতাড়ি ঘটত তাই নির্দিষ্ট পেনশন চালিয়ে যাওয়া সম্ভব ছিল। বর্তমানে বৃদ্ধদের জীবনরেখা অনেক বেড়ে গেছে, সংখ্যাও বেড়েছে, অর্থনৈতিক পরিস্থিতিও মাঝে মাঝে টালমাটাল হয়ে পড়ছে। তাই ভবিষ্যতে বৃদ্ধরা কতটা নিশ্চিন্ত হয়ে থাকতে পারবেন, তা সময়ই বলবে।

তাই বৃদ্ধদের যথাসম্ভব সুস্থ থেকে সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নতির দায়িত্বভার থেকে একেবারে দূরে সরে দাঁড়ালে চলবে না। যতদিন সম্ভব কারোর উপর নির্ভরশীল হওয়া উচিত নয়। কিন্তু মুশকিল হলো, বৃদ্ধরা কোনো অর্থকরী কাজের জন্য যদি যুবকদের সাথে প্রতিযোগিতা করেন তাহলে যুবকরা মেনে নেবে না। কারণ, চাহিদার তুলনায় তারা কাজ করতে পারবে বেশি। আরেকটা কথা, যুবকরা বৃদ্ধদের খবরদারি পছন্দ করে না। তাই স্বস্তিতে থাকতে হলে খবরদারিও কিছুটা কমাতে হবে। অর্থকরী কাজ ছাড়াও অন্যান্য সমাজসেবামূলক কাজ, সাহিত্য ও সংস্কৃতিমূলক কাজ বৃদ্ধরা অবশ্য করতে পারেন। তবে প্রশ্ন হলো, যারা অতিবৃদ্ধ, অশক্ত তাদের প্রতিপালন করা পারিবারিক ক্ষেত্রে একান্ত সম্ভব না-হলে সমাজ ও সরকারকে তাদের ভার অবশ্যই নিতে হবে। সরকারি সুন্দর, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন, স্বাস্থ্যসম্মত, সুচিকিৎসক ও ভালো নার্সের ব্যবস্থাসহ সরকারি বৃদ্ধালয় অবশ্যই থাকা দরকার। এ বিষয় নিয়ে আমাদের সরকারকে গভীরভাবে চিন্তা করে ব্যবস্থা নিতে হবে। বিলম্ব করা উচিত হবে না।

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Check Also

অব্যাহত অস্থিরতা চালের বাজারে

দীর্ঘদিন ধরে সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে থাকায় চালের বাজারের অস্থিরতা কমছে না। গত এক বছরেরও বেশ…