Home অপরাধ পদে পদে অনিয়ম ১৪ কারণে দুর্ঘটনা

পদে পদে অনিয়ম ১৪ কারণে দুর্ঘটনা

‘প্রতিদিন মালিককে দিতে হয় আড়াই হাজার টাকা। বিভিন্ন চাঁদা ও রাস্তা খরচ বাবদ দেড় হাজার টাকা। তেল-গ্যাসের খরচও লাগে প্রতিদিন। ওঠাতে হয় তিনজন স্টাফের খাওয়া খরচ আর হাজিরা। তাই বাসভর্তি যাত্রী তুলতে হয়, দিনে কমপক্ষে তিন ট্রিপ দিতে হয়। তা ছাড়া কোনোভাবেই এত টাকা ওঠানো সম্ভব নয়। তাই বাস জোরে চালাতে হয়। যে আগে যেতে পারবে, সে-ই যাত্রী পাবে। পিছিয়ে থাকলেই যাত্রী হারাতে হবে।’

কথাগুলো বলছিলেন রাজধানীর যাত্রাবাড়ী থেকে টঙ্গী রুটে চলাচল করা তুরাগ পরিবহনের একটি বাসের চালক মো. সোহেল। তিনি জানালেন, এক বছর চালকের সহকারী ও পাঁচ বছর বাসের সুপারভাইজার থাকার পর চালক হয়েছেন। প্রাতিষ্ঠানিক কোনো প্রশিক্ষণ নেই তার। সোহেলের মতোই অন্যান্য চালকেরও যানজটের এই শহরে বাসভর্তি যাত্রী ওঠাতে এবং কমপক্ষে তিন-চারটি ট্রিপ মারতে প্রতিযোগিতায় নামতে হয়। এতে প্রতিনিয়ত বাড়ছে দুর্ঘটনা। এ ছাড়া অন্তত ১৪ কারণে ঘটছে সড়ক দুর্ঘটনা।

এমনই পদে পদে অনিয়ম ঢাকার গণপরিবহনে। বাস কিংবা অটোরিকশা; সব যানেই বিশৃঙ্খলা। পথে নামা থেকে শুরু করে ডাম্পিং পর্যন্ত, প্রতিটি ধাপে হয় অনিয়ম। দুর্ঘটনা ঘটলে আলোচনায় আসে অনিয়ম, ক’দিন পর স্থবির হয়ে যায় সবকিছু। পরিবহনের মূল সমস্যা চাঁদাবাজি বন্ধে দৃশ্যমান উদ্যোগ না থাকলেও প্রায় প্রতিবছর ফিটনেসবিহীন, লক্কড়ঝক্কড় অবৈধ যান চলাচল বন্ধে অভিযান চলে। কিন্তু তা কিছুদিনেই গতি হারায়। অনিয়মের এ চক্রে বছরের পর বছর চলছে রাজধানীর গণপরিবহন।

এর প্রভাব পড়েছে পথে। চাঁদাবাজির খরচ তুলতে যাত্রীদের কাছ থেকে সরকার নির্ধারিত ভাড়ার অতিরিক্ত আদায় করেন মালিকরা। অতিরিক্ত ভাড়া আদায় বন্ধের দায়িত্ব সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ)। গত সপ্তাহে দুদকের গণশুনানিতে বিআরটিএর শীর্ষ কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে যাত্রীরা অভিযোগ করেন, ঢাকার এমন কোনো বাস নেই, যেখানে অতিরিক্ত ভাড়া নেওয়া হয় না। অটোরিকশায় বাড়তি ভাড়া নেওয়ার অভিযোগ এ যানটি চালুর প্রথম দিন থেকেই। যাত্রী কল্যাণ সমিতি নামে একটি বেসরকারি সংগঠনের হিসাবে, ৯৪ ভাগ অটোরিকশা মিটারে চলে না। সমিতির আরেক পরিসংখ্যানে বলা হয়েছে, ঢাকার ৮৭ ভাগ বাস-মিনিবাস অনিয়মে জড়িত। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের তথ্যানুযায়ী, অধিকাংশ বাসের কাঙ্ক্ষিত মান নেই। জোড়াতালি দিয়ে চলে সড়কের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। চালক-শ্রমিকরা যাত্রীবান্ধব নন, সে কথা স্বীকার করেছেন মালিকরাই। মালিক সমিতির হিসাবে, ৯৫ ভাগ চালক মাদকাসক্ত। অনেকের বিরুদ্ধে নারী নির্যাতনের মতো গুরুতর অভিযোগ রয়েছে।

এ অবস্থার দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা অনিয়মকে দায়ী করছেন মালিকরা। মালিক সংগঠন ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির হিসাবে, রাজধানীতে ১৭৪টি রুটে ২৪৬টি কোম্পানির অধীনে প্রায় পৌনে আট হাজার বাস চলে। অধিকাংশ বাস লক্কড়ঝক্কড়, কিন্তু ঢাকার রাস্তায় নতুন একটি বাস নামাতে মালিককে নানা প্রতিবন্ধকতার শিকার হতে হয়। নিয়মানুযায়ী, বাস নামাতে ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনারের নেতৃত্বাধীন আঞ্চলিক পরিবহন কমিটির (আরটিসি) অনুমতির প্রয়োজন হয়। যাত্রী চাহিদা বিবেচনা করে রুট পারমিট দেয় আরটিসি।

কিন্তু আইনের বাইরেও আরও অনেক রকম ‘অনুমতির’ প্রয়োজন হয় বলে জানিয়েছেন মালিকরা। নতুন কেউ পরিবহন ব্যবসায় এলে সমিতির সদস্য হতে বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় করতে হয়। পুরনো যারা আছেন, তারাও নতুন বাস নামাতে চাইলে পরিবহন নেতাদের টাকা দিয়ে অনুমতি পেতে হয়।

সাধারণ মালিকরা এ বিষয়ে মুখ খুলতে চান না। কিন্তু সবাই স্বীকার করেছেন, রুট পারমিট থাকলেই চলে না, সড়কে চলতে মালিক-শ্রমিক সংগঠনগুলোর অনুমতি প্রয়োজন হয়। ওয়েলকাম পরিবহনের পরিচালক নাবির হোসেন সমকালকে জানান, এসব অনিয়ম প্রতিষ্ঠা পেয়ে গেছে। বছরের পর বছর চলছে।

মালিকদের দেওয়া তথ্যানুযায়ী, রুট পারমিট পাওয়ার পর বাস চালাতে প্রতিদিন নানা নামে চাঁদা দিতে হয়। প্রতিদিন সকালে একটি বাস পথে নামতে গেট পাস (জিপি) দিতে হয় ১০০ টাকা। যে কোম্পানির অধীনে বাস চলে, তার নাম ব্যবহারে দৈনিক ‘চাঁদা’ দিতে হয় ৭০০ থেকে ৯০০ টাকা। মালিক ও শ্রমিক সমিতিতে চাঁদা দিতে হয় ৭০ টাকা। টার্মিনালভিত্তিক সমিতিতেও চাঁদা দিতে হয়। এ ছাড়া পথ খরচের নামে ট্রাফিককেও ‘ঘুষ’ দিতে হয়। একটি বাসকে দিনে কমপক্ষে এক হাজার ২০০ টাকা চাঁদা দিতে হয়।

ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সভাপতি আবদুল কালাম বলেন, সমিতির জন্য যে চাঁদা নেওয়া হয়, তা মালিক-শ্রমিকদের কল্যাণে ব্যয় করা হয়। কোম্পানির ব্যানার ব্যবহারের চাঁদার বিষয়ে তিনি বলেন, এটা কোম্পানির ব্যবসায়িক বিষয়। কোন বাস কোন কোম্পানিতে চলবে, তা মালিকদের ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত।

তবে মালিকরা বলছেন, অধিকাংশ কোম্পানির চেয়ারম্যান, ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদে রয়েছেন রাজনৈতিক নেতারা। তাদের রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে রুট পারমিট নেওয়া ও টিকিয়ে রাখা হয়। তারা দু-একটি বাস দিয়ে কোম্পানির শীর্ষ পদে বসে যান। আর কোম্পানির অধীনে চলা বাসগুলোকে প্রতিদিন টাকা দিতে হয়।

যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, চাঁদা দিয়ে প্রশ্রয় পাওয়া বাসমালিক-চালকরা কোনো নিয়ম মানতে চান না। এ প্রভাবের কারণে মালিকরা সরকার নির্ধারিত ভাড়া না মেনে ফিটনেসবিহীন গাড়ি চালান।

যেসব কারণে দুর্ঘটনা :ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) সদর দপ্তরের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত চার মাসে রাজধানীতে সড়ক দুর্ঘটনায় মামলা হয়েছে ১১৬টি। এ ছাড়া সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে- মামলা না হওয়ায় যেগুলো এ হিসাবে নেই।

সড়ক দুর্ঘটনার প্রধান কারণ ছয়টি- চালকের অদক্ষতা ও অসতর্কতা, ওভারটেক. বেপরোয়া গতি, ফিটনেসবিহীন গাড়ি এবং পথচারীর অসতর্কতা। অন্যান্য কারণের মধ্যে রয়েছে- এই পেশাজীবীদের পেশাগত নিরাপত্তাহীনতা। রাজধানীর বেশিরভাগ চালক বেতনভুক্ত নন। তারা মালিকের সঙ্গে দিন চুক্তিতে বাস চালান। রাস্তার সব খরচও চালকের। এসব খরচ মিটিয়ে হেলপার, সুপারভাইজারসহ নিজের হাজিরা তুলতে হয় তাকে। একদিকে এই বিনিয়োগটুকু ওঠানোর চিন্তায়, অন্যদিকে যানজটসহ টানা ১৪-১৬ ঘণ্টা গাড়ি চালানোর ক্লান্তিতে অধৈর্য ও উদ্বিগ্ন হয়ে ওঠেন তারা। এটিও দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ।

এ ছাড়া যাত্রী ওঠানোর সড়কের বাঁ লেন দখলে রাখার চেষ্টা, চলমান অন্য গাড়ির সামনে দিয়ে বাসের মাথা ঢুকিয়ে দেওয়া, পেছনের বাসকে বাধা দিতে সামনে আড়াআড়ি করে রাখা, চলন্ত বাসে যাত্রী ওঠানো-নামানো, চলন্ত অবস্থায় মোবাইল ফোনে কথা বলা এবং মাদক সেবনের কারণেও সড়ক দুর্ঘটনা ঘটছে।

নিরাপদ সড়ক চাইয়ের চেয়ারম্যান চিত্রনায়ক ইলিয়াস কাঞ্চন বলেন, একটি দুর্ঘটনা ঘটলে গণমাধ্যমে সংবাদ ছাপা হয়, বিভিন্ন সংগঠনের নেতারা সরগরম হয়ে ওঠেন। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ সংশ্নিষ্টরাও তখন নড়েচড়ে বসেন। লোক দেখানো অভিযান চলে তখন। দু’দিন পর এ অভিযান বন্ধ হয়ে যায়। অথচ রাস্তায় ২৪ ঘণ্টা গাড়ি চললে সারাদেশে অভিযানও ২৪ ঘণ্টা অব্যাহত রাখা প্রয়োজন। তিনি বলেন, গাড়ির চেয়ে চালকের সংখ্যা কম। এ কারণে অদক্ষ চালক দিয়েই গাড়ি চালান মালিকরা। তাদের পক্ষ থেকে দক্ষ চালক তৈরিরও কোনো উদ্যোগ নেই। দুর্ঘটনা এড়াতে পথচারী এবং যাত্রীদেরও সতর্ক হতে হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

ডিএমপির যুগ্ম কমিশনার (ট্রাফিক) মোসলেহ উদ্দিন বলেন, চালকদের অসুস্থ প্রতিযোগিতা বন্ধ করতে প্রতিদিনই বাসের বিরুদ্ধে চলা অভিযানে মামলা-জরিমানা ও বাস ডাম্পিং হচ্ছে। পাশাপাশি ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে জেল-জরিমানাও করা হচ্ছে চালকের।

বিআরটিএর পরিচালক (এনফোর্সমেন্ট) নূর মোহাম্মদ মজুমদার বলেন, চালকরা যাতে আইন মান্য করে, সে জন্য সড়কে নিয়মিত বিআরটিএর পক্ষ থেকে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হচ্ছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Check Also

ড. ইউনূসের ব্যাংক হিসাব তলব

নোবেলজয়ী একমাত্র বাংলাদেশি ও গ্রামীণ ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা ড. মুহম্মদ ইউনূসের ব্যাংক হিসাবে…