Home অপরাধ প্রতিনিয়ত বাড়ছে কিশোর অপরাধ
অপরাধ - জাতীয় - ফেব্রুয়ারি ১৬, ২০২১

প্রতিনিয়ত বাড়ছে কিশোর অপরাধ

মোঃ বেলাল হোসেন বাঁধন

ইদানীং পত্রপত্রিকায় ‘কিশোর গ্যাং’ বিষয়ে প্রায় প্রতিদিনই কিছু না কিছু খবর বেরোচ্ছেই। সমস্যাটি যে করোনাভাইরাসের মতোই মহামারি হতে চলেছে, খবরের সংখ্যা বেড়ে চলা থেকেই সেটি স্পষ্ট।

এলাকাভিত্তিক গ্যাং কালচারের অন্যতম স্টাইল হচ্ছে দল বেঁধে মোটরসাইকেল মহড়া। করোনা প্রাদুর্ভাবের শুরুর দিকে কিছুদিন এই কালচার বন্ধ থাকলেও আবারও তাদের তৎপরতা আগের মতোই দৃশ্যমান। এদের মুখে মাস্ক পড়ার বালাই নেই। মাথায় হেলমেট ছাড়াই এক মোটরসাইকেলে ৩ জন উঠে ৮/১০টি মোটরসাইকেল নিয়ে তীব্র শব্দে এরা দাপিয়ে বেড়ায় নিজ নিজ এলাকার অলি-গলি। নতুন কোনো গ্যাং যেন ওই এলাকায় মাথা তুলতে না পারে, এ যেন তারই মহড়া।

বাংলাদেশে কিশোর অপরাধ বাড়ছে। গড়ে উঠছে কিশোর গ্যাং। তারা হত্যা-ধর্ষণের মতো অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। কিন্তু এর নেপথ্যে কী? দায় কার?

কিশোর গ্যাং যে কত ভয়াবহ হয়ে উঠেছে তা গত ১১ জানুয়ারি পুলিশের আইজি বেনজীর আহমেদের বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে। তিনি বলেছেন, ‘পুলিশের জন্য এই কিশোর গ্যাং বা কিশোর অপরাধীরাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।’

ডিএমপির অপরাধ পর্যালোচনার তথ্য অনুযায়ী ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় ৪০টির মতো কিশোর গ্যাং রয়েছে। প্রতিটি গ্যাং-এর সদস্য সংখ্যা ১৫-২০ জন। পুলিশ সূত্র জানায়, গত এক বছরে ঢাকায় অন্তত পাঁচটি হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে তারা। এর মধ্যে উত্তরার কিশোর গ্যাং সবচেয়ে আলোচিত। সেখানে একাধিক গ্যাং রয়েছে।

২০১৭ সালের জানুয়ারিতে উত্তরায় ডিসকো এবং নাইন স্টার গ্রুপের দ্বন্দ্বে নিহত হয় কিশোর আদনান কবির। তার পরের মাসে তেজকুনি পাড়ায় দুই গ্রুপের দ্বন্দ্বে খুন হয় কিশোর আজিজুল হক। ঢাকার বাইরে থেকেও প্রায়ই কিশোর গ্যাং-এর দ্বন্দ্বে খুনখারাবির খবর পাওয়া যায়।

গত ১২ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর মুগদায় কিশোর হাসান মিয়া হত্যার সঙ্গে জড়িত ব্যান্ডেজ নামে একটি কিশোর গ্যাং গ্রুপের সাত সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে ডিবি। সালাম না দেওয়াকে কেন্দ্র করে কিশোর গ্যাং গ্রুপটি হাসান মিয়াকে খুন করে। ওই কিশোর গ্যাং গ্রুপের নেতৃত্ব দিতো তানভীর। তাদের সবাইকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

গত শুক্রবার (৯ জানুয়ারি) রাতে রাজধানীর কামরাঙ্গীর চরে চটপটি খাওয়ার সময় কথা কাটাকাটির জের ধরে ছুরিকাঘাতে সিফাত ভূঁইয়া নামের এক কিশোরের মৃত্যু হয়।

স্থানীয়রা জানায়, একটি বোর্ড কারখানায় কাজ করতো সিফাত। বরিশাইল্লা গলির একটি দোকানে চটপটি খাওয়ার সময় শুভ নামের এক কিশোরের সঙ্গে কথা কাটাকাটি হয় সিফাতের।

এক পর্যায়ে শুভসহ দুই থেকে তিন জন মিলে সিফাতকে ছুরিকাঘাত করে। আহত অবস্থায় তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে আসলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।

বরগুনার নয়ন বন্ড তার ০০৭ গ্রুপ নিয়ে জনসম্মুখে রিফাত শরিফকে কুপিয়ে হত্যা করে। এ হত্যার জন্য ১১ কিশোরকে কারাদণ্ড দিয়ে বরগুনার আদালত বলেছেন, সারাদেশে কিশোর অপরাধ বেড়ে যাচ্ছে। গডফাদাররা এই কিশোরদের ব্যবহার করছে।

এর আগের বছর সাভারে স্কুল ছাত্রী নীলা হত্যায়ও কিশোর গ্যাং জড়িত। আর ওই হত্যাকাণ্ডের মূল আসামি মিজানুর রহমান কিশোর গ্যাং লিডার। আর তার গডফাদার স্থানীয় এক যুবলীগ নেতা।

সারাদেশের প্রত্যন্ত এলাকাতেও এখন কিশোর গ্যাং সক্রিয়। অভিযোগ রয়েছে, স্থানীয় প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতারা তাদের ব্যবহার করেন। আর সেই ক্ষমতায় গ্যাংগুলো বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। হত্যা ছাড়াও ধর্ষণ, মাদক কারবারিসহ নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে।

এ বিষয়ে ডিএমপির মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন্স বিভাগের অতিরিক্ত উপকমিশনার (এডিসি) মো. ইফতেখায়রুল ইসলাম বাংলাদেশ জার্নালকে বলেন, কিশোর গ্যাং প্রতিরোধে ইতোমধ্যে ডিএমপিতে ব্যবস্থা নেয়া শুরু হয়েছে। এর জন্য বিট কর্মকর্তাদেরকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে, যেন কোথায় কোনো গ্যাং সক্রিয় হবার আগেই আইনের আওতায় আনা যায়।

অতিরিক্ত এই উপকমিশনার আরো বলেন, ২-৩ মাস আগেও গ্যাং কালচার একদম পুরো নিয়ন্ত্রণে ছিলো। এখন কিছুটা বেরেছে। যার ফলে হাতিরঝিল ও উত্তরা থানায় অভিযান চালিয়ে কিশোর গ্যাংয়ের কিছু সদস্যদের আটক করা হয়েছে।

কিশোর উন্নয়ন কেন্দ্রের তথ্য মতে, যে কিশোররা ওইসব কেন্দ্রে আছে তাদের ২০ শতাংশ হত্যা এবং ২৪ শতাংশ নারী ও শিশু নির্যাতন মামলার আসামি। ১৪ থেকে ১৬ বছর বয়সের কিশোররাই বেশি অপরাধে জড়াচ্ছে। কিশোররা, চুরি, ছিনতাইয়ের মত অপরাধেও জড়িয়ে পড়ছে বলে কেন্দ্রের তথ্যে জানা যায়।

বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার চার কোটি শিশু-কিশোর। এরমধ্যে এক কোটি ৩০ লাখ শিশু ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন ও অপরাধ বিজ্ঞানের অধ্যাপক শেখ হাফিজুর রহমান কার্জন মনে করেন, ওই শিশুরা তো অপরাধে জড়িয়ে পড়তেই পারে।

অধ্যাপক শেখ হাফিজুর রহমান কার্জন আরো বলেন, নিম্নবিত্ত পরিবারে যেমন বাবা-মা দুইজনই কাজে বেরিয়ে যান, তেমনি মধ্যবিত্ত এবং উচ্চবিত্ত পরিবারেও বাবা-মা সন্তানকে সময় দেন না। তারা নানা ধরনের গেমস, সিনেমা দেখে, একাকিত্বের কারণে অপরাধী হয়ে ওঠে। আর সমাজ ও রাষ্ট্রে অপরাধ, দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহারও তাদের অপরাধে প্রলুব্ধ করে।

রাষ্ট্র, সমাজ ও পরিবার শিশুদের জন্য শিশুবান্ধব পরিবেশ দিতে ব্যর্থ হচ্ছে। তাদের মধ্যে মূল্যবোধ তৈরি করতে পারছে না। যার পরিণতি আমরা এখন দেখছি বলে তিনি মনে করেন।

তবে পরিবারের নজরদারি ও মূল্যবোধ এই কিশোর অপরাধ অনেক কমিয়ে আনতে পারেন বলেও জানান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই অধ্যাপক।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Check Also

গুরুতর অসুস্থ ভ্লাদিমির পুতিন ব্রিটিশ গুপ্তচরের দাবি‌

রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ‘গুরুতর অসুস্থ’ বলে দাবি করেছেন ব্রিটেনের সাবেক গুপ্তচ…