Home মতামত যথাসময়ে শিক্ষার্থীদের হাতে পাঠ্যবই তুলে দিন
মতামত - শিক্ষা - সম্পাদকীয় - ডিসেম্বর ১৯, ২০২১

যথাসময়ে শিক্ষার্থীদের হাতে পাঠ্যবই তুলে দিন

২০২১ সাল শেষ হওয়ার পথে। সারা বছরের রাজনৈতিক-সামাজিক-সাংস্কৃতিক জীবনাচারের হিসাব-নিকাশ চুকিয়ে ফেলে নতুন বছরের ক্ষণ-গণনা শুরু হয়েছে। নগর-মহানগরের সাধারণ নাগরিকরাই মূলত এটা করেন। গ্রামের লোকরা নতুন বছর কখন আসে সেটা বুঝতে পারে, যখন তাদের শিশুরা ¯ু‹লে যেতে শুরু করে। তার মানে ২০২২ সালের পহেলা জানুয়ারি তারা বুঝবে যে, নতুন বছর এসেছে। কিন্তু প্রশ্নটা সেখানে নয়, প্রশ্নটা হচ্ছে সব কৃষক বা সব গ্রামের সব মানুষই কি তা বুঝতে পারে? না, পারে না। কারণ সব কৃষকের বা সব মানুষের শিশুই স্কুলে যায় না।

স্বাধীনতার ৫০ বছরেও যখন এ কথা লিখতে হয় যে, দেশের ২৫-৩০ হাজার গ্রামে এখনো প্রাথমিক বিদ্যালয় নেই, তখন আমাদের লজ্জা লাগে। আমরা দেশটা যুদ্ধ করে স্বাধীন করেছিলাম প্রত্যেক শিশু যাতে শিক্ষা পেতে পারে, ¯ু‹লে যেতে পারে, সেই আশা নিয়ে। তারা যাতে নিরক্ষর না থাকে, দেশকে নিরক্ষরতামুক্ত করে একটি শিক্ষিত জাতি গড়ে তুলতেই আমরা অস্ত্র তুলে নিয়েছিলাম। দুনিয়ার বুকে মাথা তুলে দাঁড়ানোর শপথ নিয়ে যুদ্ধে গিয়েছিলাম আমরা। কিন্তু সেই শপথ ভেস্তে গেছে, দেখতে পাচ্ছি।

সব গ্রামে ৫০ বছরেও যখন প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপন করতে পারিনি আমরা তখন ওই শপথের কী মূল্য আছে? শুধু তো নিরক্ষরতা মুক্তিই নয়, আমরা আরও কিছু মৌলিক সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে অস্ত্র তুলে নিয়েছিলাম। সেই মৌলিক বিষয়গুলোর প্রথমটা দেশের স্বাধীনতা। আরও যেসব বিষয় ছিল সেসবই আমাদের সংবিধানে লিখিত আছে। গর্বের সঙ্গে তা আমরা বলি। কিন্তু কখনই এটা বলি না যে, জনগণের সেসব মৌলিক অধিকার বাস্তবায়ন করা যায়নি। বলি না এজন্য যে, আমরা এই শিক্ষিত শ্রেণিটা মূলত সুবিধাবাদী চরিত্রের। নিজেদের সুবিধা আয়ত্ত করেছি, অতঃপর আর কারও সুযোগ-সুবিধা অর্জিত হোক সেটা দেখা যেন আমার বা আমাদের দায়িত্ব-কর্তব্য নয়। এভাবেই ৫০ বছর কেটে গেছে। আমরা স্বাধীনতার ৫০ বছর মহাসমারোহে পালন করলাম, নতুন করে শপথ নিলাম দেশ গড়ার এবং দেশের সামগ্রিক উন্নয়নে নিজেদের ঢেলে দেওয়ার কথা পুনরায় বললাম। অবশ্য ৫০ বছর ধরেই এই বাণী আমরা রেডিও-টিভিতে জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠানে শুনতে পেয়েছি। এবং আমরা আশায় বুক বাঁধি প্রতিবারইÑ এইবার, এইবার খুকুর চোখ, শিক্ষায়-দীক্ষায় খুলবে। কিন্তু হায়! অনেক খুকুরই চোখে আলো পড়ে না, জ্বলেও ওঠে না।

কোনো একটি পত্রিকায় পড়েছি আজ ১৭ ডিসেম্বরেও দেশের মাধ্যমিক ও প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিশু-কিশোরদের জন্য সরকার যে বিনা পয়সায় বই দেয়, তার ৭ কোটি ও ২৭ শতাংশের মুদ্রণ কাজ শেষ হয়নি। আশঙ্কা করা হয়েছে সেই রিপোর্টে যে, ২০২২ সালের পহেলা দিন সব শিশু হাতে বই পাবে না। কিন্তু এই কাজে দায়িত্বশীল কর্তৃপক্ষ দাবি করেছে, ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে ছাপা সম্পন্ন হবে এবং শিশু-কিশোর শিক্ষার্থীরা বই যথানিয়মেই তা পাবে। আশার বাণী সব সময়ই আনন্দের। আমরাও সেই আনন্দের ভাগীদার এ কারণে যে, ওই শিশুরা আমাদেরই পরিবার-পরিজনদের। ওরাই আগামী দিনের নাগরিক এবং তারাই দেশ গড়ে নেবে। জাতির লক্ষ্য পূরণে আমরণ সংগ্রাম করে যাবে। আমরণ শব্দটি হঠাৎ মনে আসেনি। চিন্তা করেই তা লিখেছি। কারণ যে শিশুটি ৫০ বছর আগে অর্থাৎ ১৯৭১ সালে জন্ম নিয়েছে তার বয়স এখন পঞ্চাশ। আমাদের গড় আয়ু বেড়ে ৭২ দশমিক ৮ বছরে উন্নীত হয়েছে। ওই মানুষরা মরে যাওয়ার আগে তাদের শিশুদের জন্য একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় তাদের গ্রামে প্রতিষ্ঠিত হবে, এটা দেখে যেতে পারবে না। আগামী ২০ বছরে বাকি গ্রামগুলোতে প্রাথমিক বিদ্যালয় গড়ে তোলা অত সহজ নয়। কারণ ৫০ বছরে যদি ৫০-৬০ হাজার গ্রামে প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়ে থাকে, তা হলে বাকি গ্রামে কুড়ি বছরে সম্পন্ন হবে না। অথচ সরকারের এ বিষয়ে সদিচ্ছার কমতি নেই। সরকার চায় সব শিশু তাদের শিক্ষার অধিকার পাক। কিন্তু সরকারের নীতিনির্ধারকরা বোধহয় চান না বা তাদের গড়িমসির কারণেই সেটা বাস্তব হয়ে ওঠে না। যে প্রশাসনের অধীনে দেশের উন্নয়ন ধারার রেললাইনটি বসানো, তাতে জং ধরেছে বহুকাল আগেই। সেই রেললাইনের শ্লিপার পাল্টানো জরুরি, সেটা মনে হয় আসলেও পচে যাওয়া প্রশাসনের ঘুণ তা হতে দেয় না। আমরা বহুবারই দেখেছি, প্রধানমন্ত্রী চেয়েছেন, তিনি নির্দেশ দিয়েছেন, সেই প্রকল্পও যথাসময়ে, প্রাক্কলিত ব্যয়ে সম্পন্ন হয়নি। কেন হয়নি, সেই জবাবদিহি চাইলে আমলাদের নানান জটিল ও ভুয়া যুক্তির তোড়ে উড়ে যায় প্রধানমন্ত্রীর প্রত্যাশা। এ কেবল শেখ হাসিনার আমলেই নয়, সব রাজনৈতিক ও সামরিক-আধাসামরিক ও সামরিক-বেসামরিক মেশানো সরকারগুলোর দশাই এমনটা হয়েছে। যদি কেউ চ্যালেঞ্জ করেন, তা হলে বিনীতভাবে বলব, গবেষণা করে দেখেন এবং সেই রেজাল্ট দেশবাসীকে জানান। অন্ততপক্ষে শিক্ষাক্ষেত্রে, গ্রামে গ্রামে স্কুল প্রতিষ্ঠার বিষয়ে গবেষণা করে ফলটা জানান আমাদের।

দেশ গড়ে তোলার দায়িত্ব কি কেবল রাজনৈতিক সরকারের? নাকি রাজনৈতিক সমাজ ও ব্যবসায়িক সম্প্রদায়েরও কিছু দায়-দায়িত্ব রয়েছে। দেশের যারা অর্থনীতির হাল ধরে আছেন, হাজার হাজার কোটি টাকার মালিক, তাদেরও দায়িত্ব আছে দেশের নিরক্ষর মানুষদের শিক্ষিত ও সাক্ষর করে তোলার ক্ষেত্রে। সরকার চাইলে তারা শিক্ষাক্ষেত্রে অবদান রাখতে পারে। সরকার যদি দেশের শিল্প গ্রুপগুলোর প্রত্যেককে ৫০০০ প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দায়িত্ব দেয় ৫ বছরের মধ্যে, সেই অবদানের পুরস্কার হিসেবে তারা প্রতিবছরের জন্য কর মওকুফ পাবেন। কত শতাংশ কর মওকুফ পাবেন তারা সেটা নির্ধারণ করবে সরকারের অর্থ মন্ত্রণালয়। শিক্ষক নিয়োগ, তাদের প্রশিক্ষণ ও উন্নত জীবনধারণের ব্যয় বহন করবেন তারাই। ঢাকা মহানগরের ভেতরে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করে যারা ব্যবসা করছেন, তাদের উচিত স্বাধীনতার সুফল জনগণের জন্য উৎসর্গ করা। আজকে যারা শিল্পপতি ও আজকে যারা শিক্ষিত হিসেবে সমাজের দণ্ডমুণ্ডের অধিকারী, তারা দেশ স্বাধীন হয়েছে বলেই শিল্পপতি হতে পেরেছেন। এটা ভুলে যেন না যান তারা। তাদের দায়-দায়িত্ব রয়েছে জাতির আগামী প্রজন্মকে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে।

মহানগরগুলোর উন্নয়নের চেয়ে গ্রামের উন্নয়নে জোর দেওয়া উচিত বলে আমরা মনে করি। কারণ গ্রাম আমাদের রাজনৈতিক প্রথা ও শক্তির উৎস। গ্রাম আমাদের সংস্কৃতির ভিত্তি। গ্রাম আমাদের উৎপাদনের ভিত্তিই কেবল নয়, আমাদের অর্থনীতির চালিকাশক্তি। গ্রাম উন্নয়ন করলে সেখান থেকে গরিব মানুষরা ঢাকা মহানগরে ও অন্যান্য মহানগরের বস্তিজীবনে বাস করতে আসবে না। গ্রাম উন্নয়ন মানে তাকে শহর বানানো নয় বরং প্রযুক্তির ব্যবহারের প্রতি মনোযোগী করে তোলা। গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে উৎপাদননির্ভর প্রকল্প বাস্তবায়ন করলে আমাদের যেসব খাদ্যশস্যের উৎপাদন ঘাটতি আছে, তা দেশেই উৎপাদিত হতে পারে। গ্রামেও উন্নয়নের ছোঁয়া লেগেছে, সত্য। কিন্তু তাকে ব্যাপক করে তোলার বিকল্প নেই। তবে সব কিছুর আগে গ্রামের সাধারণ মানুষকে শিক্ষার আলোকে আনতে হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Check Also

বিশেষজ্ঞদের আহ্বান মানসিক স্বাস্থ্যকে শিক্ষানীতিতে যুক্ত করার

দেশে প্রতিনিয়ত বেড়েই চলেছে মানসিক সমস্যা রোগী। যাদের বেশীর ভাগের বয়স ৫০ বছরের নিচে। শারীরি…