Home আন্তর্জাতিক শেষ হাসি কে হাসবেন, মোদি না রাহুল?
আন্তর্জাতিক - সর্বশেষ সংবাদ - ডিসেম্বর ৮, ২০১৮

শেষ হাসি কে হাসবেন, মোদি না রাহুল?

বিধিবদ্ধ সতর্কীকরণের মতো শুরুতেই বলে দেওয়া ভালো, ভারতের প্রাক–নির্বাচনী সমীক্ষা এবং নির্বাচন শেষে বুথফেরত ভোটারের মতামত নিয়ে তৈরি জরিপ প্রায়ই ভুল প্রমাণিত হয়। একটা সময় ছিল, যখন দু-একটি সংস্থা এই কাজ করত। এখন সমীক্ষা হয় গাদা গাদা। এবারও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি। পাঁচ রাজ্যের শেষ পর্বের ভোট মেটার সঙ্গে সঙ্গেই বন্যার জলের মতো ধেয়ে এসেছে বুথফেরত সমীক্ষার ফল, যা দেখে বুক বাজিয়ে বলা সম্ভব নয়, ১১ ডিসেম্বর শাসক দল বিজেপি, না বিরোধী কংগ্রেস, কার হাসি চওড়া হবে।

পাঁচ রাজ্যের মধ্যে মাত্র দুটি—রাজস্থান ও তেলেঙ্গানা—নিয়ে সমীক্ষকদের ভেতর মতান্তর নেই। রাজস্থানে বুথফেরত সমীক্ষা করেছে মোট ১০টি সংস্থা। এগুলোর মধ্যে নয়টি সমীক্ষাই এই মরু রাজ্যে কংগ্রেসকে জিতিয়েছে। একটি মাত্র সংস্থার মতে, রাজ্যের শাসক দল বিজেপি অথবা বিরোধী কংগ্রেস যে–ই জিতুক, ফারাকটা এক থেকে তিনের বেশি হবে না। রাজস্থানের ২০০ আসনের বিধানসভায় ভোট হয়েছে ১৯৯টিতে।

তেলেঙ্গানায় সমীক্ষা করেছে সাতটি সংস্থা। এই রাজ্যে বিধানসভার মোট আসন ১১৯। সরকার গড়ার ম্যাজিক সংখ্যা ৬০। সাত সংস্থার মধ্যে ছয়টিই এগিয়ে রেখেছে ক্ষমতাসীন তেলেঙ্গানা রাষ্ট্র সমিতিকে (টিআরএস)। দ্বিতীয় স্থানে কংগ্রেস-তেলেগু দেশম জোট। বিধানসভার মেয়াদ ছিল আগামী বছরের মাঝামাঝি পর্যন্ত। কিন্তু মুখ্যমন্ত্রী চন্দ্রশেখর রাও তত দিন পর্যন্ত অপেক্ষায় থাকতে চাননি। মেয়াদ শেষ হওয়ার নয় মাস আগেই বিধানসভা ভেঙে দিয়ে তিনি অকালভোটের পথে পা বাড়ান। জাতীয় পর্যায়ে কোনো জোটের সঙ্গে চন্দ্রশেখর রাও না থাকলেও বিজেপির প্রতি তাঁর দুর্বলতা প্রকাশ পেয়েছে অনেক দিন আগেই। কেন্দ্রের বিভিন্ন বিল তিনি সমর্থন করেছেন। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনেও বিজেপি প্রার্থী রামনাথ কোবিন্দকে সমর্থন জানিয়েছেন। চন্দ্রশেখর মনে করেন, লোকসভা ভোটের সঙ্গে বিধানসভার ভোট হলে কেন্দ্রীয় স্তরে বিজেপিবিরোধিতার আঁচ তাঁকে সইতে হতে পারে। তাতে ক্ষতি হতে পারে। তা ছাড়া তিনি চাননি, তেলেঙ্গানা দখলে কংগ্রেস-তেলেগু দেশম একজোট হোক। জোট তিনি রুখতে পারেননি ঠিকই, কিন্তু বুথফেরত সমীক্ষা ঠিক হলে বুঝতে হবে, ভোট এগিয়ে এনে ক্ষতির বহর তিনি নিশ্চিতই কমাতে পেরেছেন। তবে আগামী দিনে এই জোট যে তাঁকে তিষ্টোতে দেবে না, সমীক্ষার ফল তা বুঝিয়ে দিচ্ছে। টিআরএসের জয় অবশ্য বিজেপিকে খুশি করবে। কারণ, জাতীয় পর্যায়ে এই দল সরকারের পাশেই থাকবে।

পাঁচ রাজ্যের একটি মিজোরাম। উত্তর-পূর্বাঞ্চলের একমাত্র এই রাজ্যেই টিমটিম করে জ্বলছিল কংগ্রেসের বাতি। কিন্তু সমীক্ষা বলছে, ৪০ আসনের বিধানসভায় কংগ্রেস বা মিজো ন্যাশনাল ফ্রন্ট কেউই ম্যাজিক সংখ্যা ছুঁতে পারবে না। সরকার গড়ার কারিগর হবেন স্বতন্ত্র প্রার্থীরা। এই রাজ্যে বিজেপি ধারেকাছে কোথাও নেই। কিন্তু ‘শত্রু’ কংগ্রেস বধ হলেই তাদের আনন্দ।

সেই আনন্দে বিজেপি ভাসবে কি না, সমীক্ষার ফলে সে বিতর্ক এখনো অমীমাংসিত। কারণ, গোবলয় বা আর্যাবর্তে তাদের মুঠো যথেষ্ট আলগা হওয়ার আভাস এই সমীক্ষায় রয়েছে। মধ্যপ্রদেশ ও ছত্তিশগড়ে বিজেপি টানা ১৫ বছর ক্ষমতায়। এই দুই রাজ্যের সম্ভাব্য ফল নিয়ে সমীক্ষকেরা দ্বিধাবিভক্ত। কেউ কেউ বিজেপিকে এগিয়ে রেখেছে, কেউ কংগ্রেসকে। এই দুই রাজ্য থেকে বিজেপিকে সরাতে না পারলে কংগ্রেসের কাছে অবশ্যই তা ব্যর্থতা বলে প্রমাণিত হবে। একই সঙ্গে এটাও বোঝাবে, দলের নেতা হিসেবে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির জৌলুশ ফিকে হয়নি। রাজস্থান, মধ্যপ্রদেশ ও ছত্তিশগড় ধরে রাখতে মোদি ও তাঁর সহযোদ্ধা অমিত শাহ চেষ্টার ত্রুটি রাখেননি। একই রকম প্রাণপাত করেছেন রাহুল গান্ধীসহ গোটা কংগ্রেস নেতৃত্ব। শেষ হাসি কারা হাসবেন, এই সমীক্ষা সেই উত্তর অপেক্ষায় রাখল।

আগামী বছর লোকসভা ভোটের আগে এই লড়াই ইতিমধ্যেই সেমিফাইনাল হিসেবে চিহ্নিত। মরণপণ এই লড়াইয়ে বিজেপির চেয়ে কংগ্রেসের ঝুঁকি অনেক বেশি। জনপ্রিয় ধারণা, অন্তত দুটি রাজ্য বিজেপির কাছ থেকে ছিনিয়ে নিতে না পারলে কংগ্রেস নিজেকে জয়ী বলে ভাবতে পারবে না। একই রকমভাবে গোবলয়ের তিন রাজ্যই যদি কংগ্রেসের দখলে আসে, সেটা তাহলে হবে মোদি নেতৃত্বাধীন বিজেপির নৈতিক পরাজয়। এই আশঙ্কার দরুন বিজেপি এই সেমিফাইনালকে মোদির পক্ষে-বিপক্ষে গণভোটের তকমা দিতে চায়নি। সব সংস্থার সমীক্ষায় একটি বিষয় অবশ্য স্পষ্ট। এত চেষ্টা সত্ত্বেও তেলেঙ্গানায় মোদির বিজেপি সেভাবে ডানা মেলতে ব্যর্থ। চরম ব্যর্থ মিজোরামেও। অর্থাৎ​, হিন্দি-হৃদয়ের বাইরে রাজ্যস্তরের ভোটে প্রভাব ফেলতে বিজেপিকে এখনো অনেক পথ হাঁটতে হবে।

এই ভোট রাহুল গান্ধীর পক্ষেও গুরুত্বপূর্ণ। বিরোধী জোটের নেতা হিসেবে তাঁকে এখনো যাঁরা মেনে নিতে রাজি নন, গোবলয়ে জয় তাঁদের আড়ষ্টতা ভাঙতে সাহায্য করবে। ফাইনালের আগে শতাব্দীপ্রাচীন দলটিও চনমনে হয়ে উঠবে। সর্বার্থে হীনবল কংগ্রেসের পক্ষে বিজেপির মোকাবিলা অবশ্যই এক অসম লড়াই। সেই লড়াই তীব্র হয়ে উঠবে আর্যাবর্তের তিন রাজ্যকে বিজেপির মুঠো থেকে কংগ্রেস যদি ছিনিয়ে নিতে পারে। তেমন হলে সেটা হবে মোদিরই পরাজয়। কেননা, কংগ্রেসমুক্ত ভারত গড়ার ডাক তাঁরই দেওয়া। ‘নামদার’ পরিবারের (নেহরু-গান্ধী) কবল থেকে দেশের রাজনীতিকে মুক্ত করার প্রতিজ্ঞাও তাঁরই। আপাতত চলছে দমবন্ধ প্রতীক্ষা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Check Also

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অনিয়ম দূর করুন

‘বলপ্রয়োগ’ সমস্যা সমাধানের উত্তম পন্থা নয়। তাতে বরং পরিস্থিতি আরো ঘোলাটে হয়, সঙ্কট আরো বাড়…