Home জাতীয় সত্যকে মিথ্যা দিয়ে চাপা দেওয়া যায় না :প্রধানমন্ত্রী
জাতীয় - সেপ্টেম্বর ৮, ২০১৮

সত্যকে মিথ্যা দিয়ে চাপা দেওয়া যায় না :প্রধানমন্ত্রী

প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, সত্যকে কখনো মিথ্যা দিয়ে চাপা দেওয়া যায় না। এক সময় বঙ্গবন্ধুর নাম নেওয়া নিষেধ ছিল। এখন বঙ্গবন্ধুর নাম বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছে। বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ বিশ্ব প্রামাণ্য ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। তিনি বলেন, বাংলাদেশের ইতিহাস থেকে বঙ্গবন্ধুর নাম মুছে ফেলার জন্য অনেক চেষ্টা করা হয়েছে, কিন্তু পারেনি। দিন যতই যাচ্ছে বাংলাদেশের ইতিহাস ততো সমৃদ্ধ হচ্ছে। শুধু বাংলাদেশে নয়, সারাবিশ্বে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নাম আরও উজ্জ্বল হয়েছে।

পাকিস্তানের পিছিয়ে যাওয়া এবং বাংলাদেশের এগিয়ে যাওয়ার চিত্র তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, সার্বিকভাবে বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশ এখন বিশ্বে উন্নয়নের রোল মডেল। যে পাকিস্তানের কাছ থেকে আমরা স্বাধীনতা অর্জন করেছি, সেই পাকিস্তানের অনেক বুদ্ধিজীবী-নাগরিকই এখন বলছেন, ‘আমাদের বাংলাদেশ বানিয়ে দাও।’

গতকাল শুক্রবার বিকালে গণভবনে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে পাকিস্তানি আমলের গোয়েন্দা প্রতিবেদনের ভিত্তিতে সংকলিত ‘সিক্রেট ডকুমেন্টস অব ইনটেলিজেন্স ব্রাঞ্চ অন ফাদার অফ দ্য নেশন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান’ বইয়ের মোড়ক উন্মোচনকালে তিনি এসব কথা বলেন। ৪০ হাজার পৃষ্ঠার ১৪ খন্ডের এই সংকলনের প্রথম খন্ডের মোড়ক উন্মোচন করেন বঙ্গবন্ধু কন্যা ।

১৯৪৮ থেকে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিদিনের কর্মকান্ড পর্যবেক্ষণ করে প্রতিবেদন তৈরি করতো পাকিস্তানের ইনটেলিজেন্স ব্রাঞ্চ (আইবি)। দীর্ঘ ২৩ বছরের সেইসব গোয়েন্দা প্রতিবেদনের ভিত্তিতে ১৪ খন্ডের এই সংকলন প্রকাশ করছে হাক্কানী পাবলিশার্স। তরুণ শেখ মুজিব নানা ঘাত-প্রতিঘাত পেরিয়ে কেমন করে বাংলার অবিসংবাদিত নেতায় পরিণত হলেন- সেই পথচিত্র যেমন এই বইয়ে এসেছে, সেই সঙ্গে এসেছে বাঙালির স্বাধীনতার আন্দোলনের চূড়ান্ত পরিণতির দিকে এগিয়ে চলার মানচিত্র। এ কারণে ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই সংকলন গ্রন্থকে বিশেষজ্ঞরা বর্ণনা করছেন ‘অমূল্য সম্পদ’ ও ‘বিশাল তথ্য ভান্ডার’ হিসেবে।

ইংরেজি ভাষায় লেখা পুরনো এসব নথি দীর্ঘদিন ধরে পুলিশের বিশেষ শাখার (এসবি) রেকর্ড রুমে পড়ে ছিল অযত্ন আর অবহেলায়। বর্তমান পুলিশ মহাপরিদর্শক জাবেদ পাটোয়ারী এসবি প্রধানের দায়িত্বে থাকার সময় প্রধানমন্ত্রীর উত্সাহে সেসব নথি সংরক্ষণ, পাঠোদ্ধার ও সংকলিত করার ব্যবস্থা করেন। সংকলন গ্রন্থটি উত্সর্গ করা হয়েছে জাতির পিতার সহযোদ্ধাদের উদ্দেশে।

অনুষ্ঠানে বঙ্গবন্ধুর লেখা আরো বই প্রকাশ করার পরিকল্পনার কথা তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, জাতির পিতা ১৯৫২ সালে চীন ভ্রমণ করেছিলেন। এটা নিয়ে তার লেখা বই শিগগিরই প্রকাশ করা হবে। ‘স্মৃতিকথা’ শিরোনামে বঙ্গবন্ধুর নিজের লেখা আরেকটি বইও প্রকাশ করা হবে। তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধুর লেখা দুটি ডায়েরি বাজেয়াপ্ত করা হয়েছিল। জাবেদ পাটোয়ারীকে আমি বিষয়টি বলি। একদিন বাজেয়াপ্ত করা ওই ডায়েরি দুটি তিনি আমাকে উপহার হিসেবে দেন। এ সময় আমি আবেগ-আপ্লুত হয়ে পড়ি। পুলিশের বিরুদ্ধে বঙ্গবন্ধু লিখেছিলেন বলেই ওই ডায়েরি বাজেয়াপ্ত করা হয়েছিল।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ছাত্রজীবন থেকেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলার মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলন শুরু করেন। তার সংগ্রাম ছিল এ দেশের মানুষকে শোষণ-বঞ্চনার হাত থেকে রক্ষা করা। তত্কালীন পূর্ব বাংলা এবং পাকিস্তানের মধ্যে যে বৈষম্য ছিল সেই বৈষম্যের কথা বলতে গিয়ে বঙ্গবন্ধু বার বার জেল খেটেছেন, বারবার তাকে কারাগারে যেতে হয়েছে। তিনি বলেন, পাকিস্তান ইন্টেলিজেন্স ব্রাঞ্চ (আইবি) প্রতিদিন প্রতিমুহূর্তে তার কর্মকান্ড পর্যবেক্ষণ করে রিপোর্ট পাঠাতো। তারা বঙ্গবন্ধুর চলাফেরা, গতিবিধির বিপক্ষে যে সমস্ত নোট দিয়েছেন সেগুলো সমৃদ্ধ করে বই প্রকাশ করা হচ্ছে। এগুলো কিন্তু বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে তারা নোট দিয়েছিল। তারপরও আমরা সেগুলো প্রকাশ করছি। খুব দ্রুত আমরা বাকি খন্ডগুলোও প্রকাশ করতে চাই। এ প্রকাশনার মধ্যে দিয়ে বাংলাদেশ তথা সারাবিশ্বের মানুষ জানতে পারবে বাংলাদেশের প্রকৃত ইতিহাস।

শেখ হাসিনা আরো বলেন, ক্ষমতা শুধু ভোগের জন্য নয়, ক্ষমতা ত্যাগেরও বিষয়। মানুষের জন্য দেশের জন্য কতটুকু দিতে পারলাম সেটাই মূল বিষয়। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়তে কাজ করছি। যে গতিতে বাংলাদেশ এগুচ্ছে তাতে আগামী ২০৪১ সালে এই বাংলাদেশ উন্নত বাংলাদেশ হবে বলে বিশ্বাস করি। বক্তব্য শেষে যে ড. জাবেদ পাটোয়ারীর নেতৃত্বে যে ২২ জনের টিম বইগুলোর তথ্য সংরক্ষণে কাজ করেছেন তাদের সঙ্গে ফটোসেশনে অংশ নেন প্রধানমন্ত্রী।

অনুষ্ঠানে পুলিশের আইজিপি ড. জাবেদ পাটোয়ারী বলেন, নথিগুলো সুবিন্যস্ত করা খুবই কষ্টকর ছিল। নথি ধরলে বিস্কুটের মতো ঝরঝর করে পড়ে যেত। প্রথমে স্ক্যান করার ব্যবস্থা করি। ন্যাশনাল আর্কাইভের বিশেষজ্ঞ টিম নিয়ে আসি। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী কাজটি সম্পন্ন করতে পেরে আমি গর্ববোধ করছি।

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেমোরিয়াল ট্রাস্ট আয়োজিত এই প্রকাশনা উত্সবে প্রধান অতিথি ছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. রফিকুল ইসলামের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খান, বঙ্গবন্ধু জাদুঘরের কিউরেটর নজরুল ইসলাম খান, ট্রাস্টের সদস্য সচিব শেখ হাফিজুর রহমান এবং হাক্কানী পাবলিশার্সের প্রকাশক গোলাম মোস্তফা বক্তব্য রাখেন। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর ছোট মেয়ে ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বোন শেখ রেহেনাসহ জাতীয় সংসদের স্পিকার, প্রধান বিচারপতি, মন্ত্রী পরিষদের সদস্য, সংসদ সদস্য, তিন বাহিনীর প্রধানগণ, আওয়ামী লীগসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতাসহ সমাজের গণ্যমান্য ব্যক্তিরা অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বিরুদ্ধে তত্কালীন পাকিস্তান ইন্টেলিজেন্স ব্রাঞ্চের গোপন নথি প্রকাশ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, সবই বঙ্গবন্ধুর বিপক্ষে, তবুও প্রকাশ করছি; কারণ মানুষ যেনো সত্যকে আবিষ্কার করতে পারে। এর ভিতর থেকে বাংলাদেশের জনগণ সত্যটা জানতে পারবে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, এটাতো পক্ষের কিছু না। রিপোর্ট আর বিরুদ্ধ রিপোর্টের মধ্যে দিয়ে আমার মনে হয় সবচেয়ে মূল্যবান তথ্য আবিষ্কার করতে পারব। যেমন কয়লা খনি খুঁড়ে খুঁড়ে হীরা বেরিয়ে আসে। আমার মনে হয়েছে ঠিক সেভাবে আমরা হীরার খনি আবিষ্কার করতে সক্ষম হয়েছি। তিনি বলেন, এ ডকুমেন্টের মধ্যে উনি যে কাজগুলো করে গেছেন তার অনেক কিছু পাবো। সবার হাতে তুলে দিতে পারলাম যে বাংলাদেশের জনগণ যেনো জানতে পারে। শেখ হাসিনা বলেন, এমন কথা বলা হয়েছে যে, ভাষা আন্দোলনের সময় উনি তো জেলে ছিলেন; ভাষা আন্দোলন কি করলেন। এই যে মানুষের একটি বৈরী চিন্তা-ভাবনা আমি আশা করি এ ডকুমেন্টগুলো পেলে পড়ে সত্যটা জানতে পারে।

প্রধানমন্ত্রী দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, বাংলাদেশের জনগণ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্নের সমৃদ্ধ দেশ গঠনে মুক্তিযুদ্ধের পথের ইতিহাস অনুসরণ করবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Check Also

‘প্রস্তুতি বহু আগে থেকে ছিল’

নির্বাচন কমিশন (ইসি) গঠনে আইন পাসের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, সরকার অনেক দিন …