বিরোধী দল ছায়া মন্ত্রিসভা গঠন করবে

Total Views : 11
Zoom In Zoom Out Read Later Print

ছায়া মন্ত্রিসভা করবে বিরোধী দল। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে নবনির্বাচিত সংসদ-সদস্যদের (এমপি) নিয়ে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর দুই দিনব্যাপী ওরিয়েন্টেশন প্রোগ্রামে এ নিয়ে আলোচনা হয়েছে। তবে এর কাঠামো কেমন হবে, সেটি দলের নির্বাহী পরিষদের ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।

নির্বাহীতে আলোচনা শেষে ১১ দলের শরিকদের সঙ্গে আলোচনা করে চূড়ান্ত করা হবে। জামায়াতের একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র এমনটি জানিয়েছে।

সূত্রমতে, মঙ্গলবার সংসদ-সদস্যদের শপথগ্রহণের পর কোনো সংসদ-সদস্যকেই এলাকায় যেতে দেয়নি জামায়াত। বুধবার সকাল থেকে ওরিয়েন্টেশন প্রোগ্রামের আয়োজন করা হয় ঢাকার মগবাজারে আল ফালাহ মিলনায়তনে।

বৃহস্পতিবার বেলা ১টায় জামায়াত আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমানের দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্যের মাধ্যমে শেষ হয় দুই দিনব্যাপী এই কর্মশালা।

সূত্র জানায়, দলের অভিজ্ঞ সংসদ-সদস্যদের পাশাপাশি সাবেক সচিব, বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও কয়েকজন রিসোর্স পার্সন কয়েকটি সেশনে বক্তৃতা করেন। অধিকাংশ সংসদ-সদস্যই নতুন হওয়ায় সংসদে তারা কী কথা বলবেন, কীভাবে বলবেন-এ নিয়ে বুনিয়াদি প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় এ প্রোগ্রামে।

নীতিনির্ধারণী বিষয়ে দলের আমির ডা. শফিকুর রহমান, নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের, সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ারসহ দলের সিনিয়র নেতারা কথা বলেন।

জামায়াত সংসদে কীভাবে কার্যকর বিরোধী দলের ভূমিকা রাখতে পারে, তা তুলে ধরেন তারা। জানান, সরকারের গঠনমূলক সমালোচনা করবেন তারা। শুধু বিরোধিতার খাতিরে বিরোধিতা নয়, সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে কথা বলবেন। জাতীয় পার্টির মতো অনুগত বিরোধী দল হবে না জামায়াত। বরং তার উলটো, অর্থাৎ সরকারের ভুল পদক্ষেপে কঠোরতা থাকবে।

সূত্রমতে, ছায়া মন্ত্রিসভা গঠনের বিষয়ে প্রোগ্রামে আলোচনা হয়েছে। তবে এ ধারণা আমাদের দেশে নতুন। আগে কখনো হয়নি। ওরিয়েন্টেশনে লন্ডন থেকে আসা কয়েকজন বাংলাদেশি ব্যারিস্টার এ সংক্রান্ত ধারণা দিয়েছেন। ব্রিটেনে ছায়া মন্ত্রিসভা আছে, যা বিরোধী দলের নীতি-আদর্শ এবং জনগণের স্বার্থের বিরুদ্ধে সরকার কোনো পদক্ষেপ নিলে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেয়। সরকার না মানলে সংসদ উত্তপ্ত হয়। সব মিলিয়ে একটি কার্যকর প্রাণবন্ত সংসদ আশা করে জামায়াতে ইসলামী। ছায়া মন্ত্রিসভার বিষয়ে দলের নির্বাহী পরিষদে বিস্তারিত আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

সবশেষে জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান সংসদ-সদস্যদের দ্রুত এলাকায় ফিরে যাওয়ার পরামর্শ দেন। বিশেষ করে দাঁড়িপাল্লায় ভোট দেওয়ায় কারও ওপর কোনো স্বার্থান্বেষী মহল যেন হামলা করতে না পারে, সেই ব্যবস্থা নেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি। সুখে-দুঃখে জনগণের পাশে ছায়ার মতো থাকতে বলেছেন নবনির্বাচিত আইনপ্রণেতাদের।

১২ ফেব্রুয়ারি সংসদ নির্বাচনের ফল আসার পরপরই জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখপাত্র সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া ছায়া মন্ত্রিসভা গঠনের কথা তোলেন। এরপর একই কথা বলেন জামায়াতে ইসলামীর পরাজিত সংসদ-সদস্য প্রার্থী আইনজীবী শিশির মনির।

ফল প্রকাশের পর রোববার ফেসবুকে আসিফ মাহমুদ লেখেন, ‘আমরা ছায়া মন্ত্রিসভা গঠনের প্রস্তুতি নিচ্ছি। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত এবং সার্বিক কার্যক্রমে ওয়াচডগ হিসাবে কাজ করবে ছায়া মন্ত্রিসভা।’ শিশির মনির ফেসবুকে লেখেন, ‘রাজনীতিতে নতুনত্ব আনুন। সরকারি দল মন্ত্রিসভা গঠন করুক। বিরোধী দল ছায়া মন্ত্রিসভা গঠন করুক। সংসদের ভেতরে-বাইরে তুমুল বিতর্ক হোক। তবেই সৃষ্টিশীল নেতৃত্ব গড়ে উঠবে।’

ছায়া মন্ত্রিসভার ধারণাটি এসেছে যুক্তরাজ্যের ওয়েস্টমিনস্টার সংসদীয় ব্যবস্থা থেকে, যা সেখানে ‘শ্যাডো কেবিনেট’ নামে পরিচিত। এ রীতি অনুযায়ী বিরোধী দল একটি ছায়া সরকার গঠন করে। এর কাজ হলো সরকারের নীতি পর্যবেক্ষণ, সমালোচনা ও বিকল্প প্রস্তাব দেওয়া। এর লক্ষ্য হচ্ছে, সংসদীয় গণতন্ত্র আরও স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করা।

যুক্তরাজ্য পার্লামেন্টের ওয়েবসাইটে ছায়া মন্ত্রিসভার সংজ্ঞায় বলা হয়েছে, এটি বিরোধীদলীয় নেতার নির্বাচিত একদল জ্যেষ্ঠ মুখপাত্রদের দল, যারা সরকারের মন্ত্রিসভার কার্যক্রমের প্রতিচ্ছবি হিসাবে কাজ করেন। এক্ষেত্রে প্রত্যেক সদস্যকে নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে বা বিষয়ে নেতৃত্বের দায়িত্ব দেওয়া হয়। তারা সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীর কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করেন, প্রশ্ন্ন তোলেন এবং চ্যালেঞ্জ জানান। এভাবে দেশের বিরোধী দল নিজেকে একটি ‘অপেক্ষমাণ বিকল্প সরকার’ হিসাবে প্রস্তুত রাখে। মন্ত্রিসভায় যেমন বিভিন্ন দপ্তরের মন্ত্রী থাকেন, তেমনই ছায়া মন্ত্রিসভায়ও বিরোধী দলের বিভিন্ন সদস্যকে একেকটি দপ্তরের দায়িত্ব দেওয়া হয়। সংশ্লিষ্ট দপ্তরের মন্ত্রী কী করছেন, তার ওপর নজর রাখেন তিনি। আবার ছায়া মন্ত্রিসভায় সরকারের মন্ত্রীদের সবার বিপরীতে ছায়া মন্ত্রী নাও থাকতে পারেন। এটি বিরোধীদলের সিদ্ধান্ত যে, তারা কোন বিষয়ে ছায়ামন্ত্রী রাখতে চায়।

এ ছাড়াও অস্ট্রেলিয়া ও কানাডায় ছায়া মন্ত্রিসভার কার্যক্রম দৃশ্যমান। অস্ট্রেলিয়ার ক্ষেত্রে দেখা যায়, বিরোধী দলের ছায়া মন্ত্রিসভা সরকারে থাকা মন্ত্রীদের কার্যক্রম ছায়ার মতো অনুসরণ করেন। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, নির্বাচনের মধ্য দিয়ে সরকার পরিবর্তনে বিরোধী দল ক্ষমতায় এলে ছায়া মন্ত্রীরা মন্ত্রিসভার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পান।

ব্রিটেনে ২০২০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত বিরোধী দল ছিল লেবার পার্টি। সেসময় দলের নেতা কিয়ার স্টারমার একটি ছায়া মন্ত্রিসভা গঠন করেন। ২০২৪ সালে লেবার পার্টি নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে সরকার গঠন করলে ছায়া মন্ত্রিসভার অনেককেই নতুন সরকারে মন্ত্রী করেছিলেন।

ওরিয়েন্টেশনে অংশ নেওয়া একাধিক সংসদ-সদস্য যুগান্তরকে জানান, সরকারের সব মন্ত্রণালয়ের বিপরীতে ছায়ামন্ত্রী দেওয়া হতে পারে। বিশেষ করে স্বরাষ্ট্র, পররাষ্ট্র, প্রতিরক্ষা, স্থানীয় সরকার, আইন, যোগাযোগ, তথ্য ও সম্প্রচার, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও গণশিক্ষা, আইসিটি, ধর্ম, সমাজকল্যাণ, শ্রম ও কর্মসংস্থান, সংস্থাপন, মুক্তিযুদ্ধ ও জুলাই বিপ্লবের মতো মন্ত্রণালয়গুলোকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হবে। দায়িত্বপ্রাপ্ত বিরোধীদলীয় সংসদ-সদস্যরা স্ব স্ব বিষয়ে সংসদে কথা বলাসহ প্রয়োজনীয় ভূমিকা রাখবেন।

See More

Latest Photos