নাগরিক ঐক্যের সভাপতি, ডাকসুর সাবেক ভিপি ও ডাকসাইটে রাজনীতিক মাহমুদুর রহমান মান্না সদ্য সমাপ্ত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে শুধু পরাজিত নন; স্বল্পভোটে তৃতীয় স্থান অধিকার ও জামানত খুইয়েছেন। ফলাফল ঘোষণার পর থেকে এ শোচনীয় পরাজয় নিয়ে নানা কথা চলছে।
জামানত বাজেয়াপ্ত মান্নার , নেপথ্যে কী?
কেউ বলছেন, তিনি এলাকায় বসবাস করেন না; কেউ বলছেন, তিনি সামাজিক নন; আবার কেউ বলছেন, তিনি আধুনিক বা কূট-রাজনীতি বোঝেন না। এসব কারণেই এলাকার গ্রহণযোগ্যতা কমে গেছে। আবার তার দলের লোকজন বলছেন, বিএনপি সমর্থন দিয়ে প্রত্যাহার ও তার বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালানোর কারণেই তিনি জামানত হারিয়েছেন।
নির্বাচন অফিস ও স্থানীয় সূত্র জানায়, নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না বগুড়ার শিবগঞ্জের বিহার ইউনিয়নের বিহার ফকিরপাড়া গ্রামের আফসার উদ্দিন আহমেদ ও মেহের আক্তারের সন্তান। এলাকায় তাদের ভিটামাটি থাকলেও বাড়িঘর নেই। জাতীয় নির্বাচন এলেই কেবল তিনি এলাকায় এসে ভাড়া বাসায় থাকেন। তিনি ১৯৯১ সাল থেকে সর্বশেষ ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ৩৫ বছরে জনতা মুক্তি পার্টি, আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও নাগরিক ঐক্য থেকে পাঁচবার প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন। তবে তিনি কোনোবারই জয়ের মুখ দেখেননি। ১৯৯১ সালে জনতা মুক্তি পার্টি (কাস্তে মার্কা) থেকে বগুড়া-২ (শিবগঞ্জ) আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে মোট দুই হাজার ১৮০ ভোট লাভ করেন।
১৯৯৬ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের (নৌকা) প্রার্থী হয়ে নির্বাচন করে ১৯ হাজার ৮৭১ ভোট পান। ২০০১ সালে আওয়ামী লীগ (নৌকা) থেকে নির্বাচন করে ৩৬ হাজার ৭৫০ ভোট পান। এরপর তিনি ২০১৮ সালে বিএনপির প্রার্থী হয়ে ৫৯ হাজার ৭১৩ ভোট পান। সর্বশেষ ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে দল নাগরিক ঐক্য (কেটলি) থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে ৩ হাজার ৪২৬ ভোট পান। প্রদত্ত ভোটের এক অষ্টমাংশ পেতে ব্যর্থ হওয়ায় তার জামানত বাজেয়াপ্ত হয়েছে।
বগুড়া-২ (শিবগঞ্জ) আসনে মোট ১১৫ কেন্দ্রে ভোটার সংখ্যা ৩ লাখ ৪২ হাজার ১৫৫ জন। প্রদত্ত ভোট ২ লাখ ৪৮ হাজার ৪৯৩টি। বিএনপির ধানের শীষের প্রার্থী মীর শাহে আলম ১ লাখ ৪৫ হাজার ২৪ ভোট পেয়ে সংসদ-সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। তার নিকটতম জামায়াতে ইসলামীর সাবেক মেয়র আবুল আজাদ মোহাম্মদ শাহাদুজ্জামান পেয়েছেন ৯৩ হাজার ৫৪৮ ভোট।
মাহমুদুর রহমান মান্না অল্প ভোট ও জামানত হারানো প্রসঙ্গে এলাকার লোকজন বলেন, এটা হবারই কথা ছিল। কারণ তিনি এলাকায় বসবাস করেন না। নির্বাচন এলে এলাকায় ভাড়া বাসায় থেকে সরব হন। সাধারণ মানুষ ও সাংবাদিকদের সঙ্গে তার সম্পর্কে নেই বললেই চলে। তিনি এলাকায় এলে ৪-৫ জন নেতাকর্মীকে নিয়ে চলাফেরা করেন। একজন সংসদ-সদস্য হওয়ার জন্য যে জনসমর্থন থাকা দরকার তা মান্নার নেই বা কখনো ছিল না।
তবে নাগরিক ঐক্যের নেতাকর্মীরা বলেন, এলাকায় মান্নার প্রচুর জনপ্রিয়তা রয়েছে। ২২ জানুয়ারি থেকে নির্বাচনি প্রচারণা শুরু করেন। সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত প্রতিটি পথসভা জনসভায় পরিণত হয়েছে। জনগণ তাকে ভোট দেওয়ার জন্য মুখিয়ে ছিলেন। মান্নার এ জনপ্রিয়তা দেখে বিএনপিসহ অন্য দলের প্রার্থীরাও ভীত হয়ে পড়েছিলেন। তবে বিএনপি মান্নাকে কথা দিয়েও শেষ পর্যন্ত সমর্থন না দিয়ে বেইমানি করেছে। বিএনপির লোকজন তার (মান্না) সম্পর্কে মিথ্যা অপপ্রচার চালিয়েছে।
তারা বলেছেন, মান্না জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে ঐক্য করেছে। আবার বলা হয়েছে, মান্না জামায়াতের টাকা খেয়ে বসে গেছে। এসব কথা বলে ভোটারদের বিভ্রান্ত করা হয়েছে। এছাড়া নাগরিক ঐক্যের অনেক ভোটারকে টাকার বিনিময়ে কেনা হয়েছিল। স্থানীয় অনেক জনপ্রতিনিধি নাগরিক ঐক্যের বিপক্ষে অবস্থান নিতে বাধ্য করেছে। বিএনপি প্রার্থীর লোকজন নির্বাচনে প্রচুর টাকা ব্যয় ও প্রশাসনকে ম্যানেজ করে ভোট নিয়েছেন। ফলে বিএনপি প্রার্থী মীর শাহে আলম বিজয়ী হলেও মাহমুদুর রহমান মান্নার শোচনীয় পরাজয় ও জামানত বাজেয়াপ্ত হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে মান্না বলেন, তিনি কম ভোট পাননি; পরাজয়ের কারণ জানলেও এ মুহূর্তে কোনো মন্তব্য করবেন না।