যুক্তরাষ্ট্রের হামলা ২৬ বছরে কয়টি দেশে , প্রাণহানি ও খরচ কত?

Total Views : 11
Zoom In Zoom Out Read Later Print

ব্যয়বহুল ও ধ্বংসাত্মক যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পৃক্ততা বন্ধের প্রতিশ্রুতি দেওয়া সত্ত্বেও প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইসরায়েলের সঙ্গে মিলে ইরানের নেতৃত্ব এবং পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র অবকাঠামো লক্ষ্য করে বিশাল সামরিক আক্রমণ শুরু করেছেন। পূর্ববর্তী প্রেসিডেন্টদের মতোই ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত স্বার্থ অর্জনের জন্য সামরিক শক্তির ওপর নির্ভর করেছেন। বিগত দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে মার্কিন পররাষ্ট্র নীতির এ ধারা অব্যাহত রেখেছেন তিনি। খবর আল-জাজিরার।

২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্ক ও ওয়াশিংটন ডিসিতে হামলার পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র চারজন প্রেসিডেন্টের নেতৃত্বে তিনটি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছে এবং কমপক্ষে ১০টি দেশে বোমা হামলা চালিয়েছে। ড্রোন হামলা থেকে শুরু করে আক্রমণ সবই করেছে যুক্তরাষ্ট্র। এক বছরের মধ্যে একাধিকবার হামলার মতো ঘটনায় সম্পৃক্ত হয়েছে দেশটি।

২০০১ সাল থেকে যুক্তরাষ্ট্র যেসব দেশে বোমা হামলা চালিয়েছে, তার মধ্যে রয়েছে-আফগানিস্তান, ইরাক, ইয়েমেন, পাকিস্তান, সোমালিয়া, লিবিয়া, সিরিয়া, ভেনেজুয়েলা, নাইজেরিয়া ও ইরান। তিনটি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের মধ্যে রয়েছে ২০০১-২০২১ সাল পর্যন্ত আফগানিস্তান যুদ্ধ, ২০০৩-২০১১ সাল পর্যন্ত ইরাক যুদ্ধ এবং ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ ২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে চলমান। বিগত ২৬ বছরে এসব যুদ্ধের নেতৃত্বে ছিলেন জর্জ ডব্লিউ বুশ (২০০১-২০০৯), বারাক ওবামা (২০০৯-২০১৭), ডোনাল্ড ট্রাম্প (২০১৭-২০২১), জো বাইডেন (২০২১-২০২৫) এবং ডোনাল্ড ট্রাম্প (২০২৫ থেকে বর্তমান)।

দশকের পর দশক ধরে চলা এসব যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি

২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কের টুইন টাওয়ার ও ওয়াশিংটন ডিসিতে হামলার পর প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ নাম দিয়ে অভিযান শুরু করেন। এর মধ্য দিয়ে বিশ্ব মার্কিন পররাষ্ট্র নীতির নতুন রূপ দেখেছে এবং বহু দেশে যুদ্ধ, আক্রমণ ও বিমান হামলার সূত্রপাত হয়েছে।

ব্রাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়াটসন ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড পাবলিক অ্যাফেয়ার্সের তথ্য অনুসারে, ২০০১ সাল থেকে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন যুদ্ধের ফলে আফগানিস্তান, পাকিস্তান, ইরাক, সিরিয়া, ইয়েমেন এবং অন্যান্য সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে প্রায় ৯ লাখ ৪০ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে পরোক্ষ মৃত্যু, বিশেষ করে খাদ্য, স্বাস্থ্যসেবা বা যুদ্ধ-সম্পর্কিত কারণে রোগাক্রান্তে মৃত্যু অন্তর্ভুক্ত নয়।

সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, ২০০১ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত আফগানিস্তানে মার্কিন নেতৃত্বাধীন যুদ্ধে ২ লাখ ৪৩ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়। এর মধ্যে বেসামরিক লোক রয়েছেন ৭০ হাজার ৪১৮ জন। ২০০৩-২০২১ সাল পর্যন্ত ইরাক যুদ্ধে ৩ লাখ ১৫ হাজার মানুষ নিহত হয়, যা সর্বোচ্চ। এতে বেসামরিক লোক রয়েছেন ২ লাখ ১০ হাজার ৩৮ জন। ২০১৪ সাল থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত সিরিয়ায় যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্বাধীন যুদ্ধে ২ লাখ ৬৯ হাজার মানুষের প্রাণহানি ঘটে। এতে বেসামরিক লোক রয়েছেন ১ লাখ ৩৮ হাজার ৯৪৭ জন। ইয়েমেনে ২০০২-২০২১ সাল পর্যন্ত হামলায় ১ লাখ ১২ হাজার মানুষ নিহত হয়।

বিভিন্ন দেশে দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা সংঘাতের জন্য যুক্তরাষ্ট্র আনুমানিক ৫ দশমিক ৮ ট্রিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছে। এর মধ্যে প্রতিরক্ষা বিভাগের ব্যয় ২ দশমিক ১ ট্রিলিয়ন ডলার, হোমল্যান্ড সিকিউরিটির ব্যয় ১ দশমিক ১ ট্রিলিয়ন ডলার, প্রতিরক্ষা বিভাগের ভিত্তি বাজেট বৃদ্ধির জন্য ৮৮৪ বিলিয়ন ডলার, চিকিৎসার জন্য ৪৬৫ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করা হয়েছে।

ইতোমধ্যে ব্যয় করা ৫ দশমিক ৮ ট্রিলিয়ন ডলারের পাশাপাশি আগামী ৩০ বছরে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রবীণ সৈনিকদের চিকিৎসাসেবার জন্য কমপক্ষে আরও ২ দশমিক ২ ট্রিলিয়ন ডলার বরাদ্দ করতে হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এর ফলে ২০০১ সাল থেকে যুদ্ধের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের মোট আনুমানিক ব্যয় ৮ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছাবে।

আফগানিস্তান যুদ্ধ (২০০১-২০২১)

নিউইয়র্ক ও ওয়াশিংটনে ৯/১১ এর হামলার ঘটনায় প্রথম ও সরাসরি পদক্ষেপ ছিল আল-কায়েদাকে ধ্বংস এবং তালেবানদের ক্ষমতা থেকে উৎখাত করার জন্য আফগানিস্তানে আক্রমণ। ২০০১ সালের ৭ অক্টোবর যুক্তরাষ্ট্র ‘এন্ডুরিং ফ্রিডম’ নামে অভিযান শুরু করে।

আক্রমণ শুরুর মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যে তালেবান শাসনের পতন ঘটাতে সক্ষম হয় যুক্তরাষ্ট্র। তবে, আফগানিস্তানের সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্র বাহিনীর বিরুদ্ধে দীর্ঘস্থায়ী প্রতিরোধ গড়ে তোলে। যুদ্ধটি মার্কিন ইতিহাসের দীর্ঘতম সংঘাতে পরিণত হয়। চারজন প্রেসিডেন্টের মেয়াদে গড়ায় এ যুদ্ধ। ২০ বছর পর ২০২১ সালে আফগানিস্তান থেকে চূড়ান্তভাবে সেনা প্রত্যাহার করে যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের মিত্ররা। এর ফলে তালেবানরা আবারও আফগানিস্তানের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পায়।

ব্রাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশ্লেষণ অনুসারে, যুদ্ধে আনুমানিক ২ লাখ ৪৩ হাজার মানুষ মারা গিয়েছিল। যুদ্ধের ফলে সৃষ্ট ক্ষুধা, রোগ ও আঘাতের কারণে আরও লাখ লাখ মানুষ মারা গিয়েছিল, যাদের বেশিরভাগই বেসামরিক নাগরিক।

দ্য কস্ট অব ওয়ার প্রজেক্টের তথ্য অনুসারে, এ যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও তার ন্যাটো মিত্রদের কমপক্ষে ৩ হাজার ৫৮৬ জন সৈন্য নিহত হয়। এই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের খরচ হয়েছে ২ দশমিক ২৬ ট্রিলিয়ন ডলার।

ইরাক যুদ্ধ (২০০৩-২০১১)

২০০৩ সালের ২০ মার্চ জর্জ ডব্লিউ বুশ দ্বিতীয়বার যুদ্ধ শুরু করেন, এবার ইরাকে। প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেনের কাছে গণবিধ্বংসী অস্ত্র রয়েছে, এমন দাবিতে ইরাকে আক্রমণ শুরু করেন তিনি। কিন্তু পরবর্তীতে যুক্তরাষ্ট্রের দাবিটি মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে।

২০০৩ সালের ১ মে প্রেসিডেন্ট বুশ ‘মিশন সম্পন্ন’ এবং ইরাকে বড় ধরনের যুদ্ধ অভিযানের সমাপ্তি ঘোষণা করেন। তবে, পরবর্তী বছরগুলোতে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সহিংসতা এবং আইএসআইএসের উত্থানের ঘটনা ঘটে। ২০০৮ সালে প্রেসিডেন্ট বুশ ইরাক থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারে সম্মত হন। এই প্রক্রিয়াটি ২০১১ সালে প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা সম্পন্ন করেন।

ড্রোন হামলা : পাকিস্তান, সোমালিয়া ও ইয়েমেন

যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ ঘোষণা না করেও বিভিন্ন দেশে বিমান ও ড্রোন হামলা বাড়িয়েছে। ২০০০ সালের মাঝামাঝি থেকে সিআইএ আফগান সীমান্তের কাছাকাছি পাকিস্তানের উপজাতিদের এলাকায় ড্রোন হামলা শুরু করে। সেখানে আল-কায়েদা ও তালেবান নেতারা সক্রিয় দাবি করে এসব হামলা করা হয়। ওবামা পাকিস্তানে ড্রোন হামলা নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি করেছিলেন, বিশেষ করে প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার শুরুর দিকের বছরগুলোতে।

একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র সোমালিয়ায় সন্দেহভাজন আল-কায়েদা সহযোগীদের বিরুদ্ধে বিমান হামলা চালায়। পরবর্তীতে আল-শাবাব সশস্ত্র গোষ্ঠীর বিরুদ্ধেও হামলা চালায় তারা। এ ছাড়া ইয়েমেনে মার্কিন বাহিনী আল-কায়েদা নেতাদের বিরুদ্ধে ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোন হামলা চালিয়েছে।

লিবিয়ায় হস্তক্ষেপ

২০১১ সালে লিবিয়ার নেতা মুয়াম্মার গাদ্দাফির বিরুদ্ধে আন্দোলনের সময় ন্যাটোর নেতৃত্বাধীন হস্তক্ষেপে যোগ দেয় যুক্তরাষ্ট্র। এ সময় মার্কিন বাহিনী নো ফ্লাই জোন কার্যকর করার জন্য বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়। একপর্যায়ে গাদ্দাফিকে উৎখাত ও হত্যা করা হয় এবং লিবিয়াকে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিতিশীলতা ও দলগত লড়াইয়ের দিকে ঠেলে দেয়।

ইরাক ও সিরিয়া

২০১৪ সাল থেকে যুক্তরাষ্ট্র আইএসআইএলকে পরাজিত করার ঘোষণা দিয়ে সিরিয়ার যুদ্ধে হস্তক্ষেপ করে। ইরাকে তাদের অভিযানের ওপর ভিত্তি করে যুক্তরাষ্ট্র সিরিয়ায় ধারাবাহিক বিমান হামলা চালিয়েছে এবং স্থলভাগে তাদের স্থানীয় অংশীদার বাহিনীকে সমর্থন দিয়েছে।

ইরাকে মার্কিন বাহিনী ইরাকি সৈন্যদের পরামর্শ দিয়ে আইএসআইএলের অবশিষ্টাংশের বিরুদ্ধে লড়াই করেছে এবং ইরানের প্রভাব মোকাবিলা করার চেষ্টা করেছে, যা ২০২০ সালে ট্রাম্প-নির্দেশিত হামলায় ইরানি জেনারেল কাসেম সোলেইমানিকে হত্যার মাধ্যমে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

See More

Latest Photos