রুদ্ধশ্বাস ফাইনালে প্রোটিয়াদের হারিয়ে ১৭ বছর পর টি-টোয়েন্টি চ্যাম্পিয়ন ভারত

Total Views : 35
Zoom In Zoom Out Read Later Print

১৭৬ রানের লক্ষ্য বুমরাহ-আর্শদীপের বিরুদ্ধে মোটেও সহজ হওয়ার কথা ছিলনা। তবে হেনরিখ ক্লাসেনের মহকাব্যিক এক ইনিংস সেই কাজটা প্রায় করেই দিয়েছিল প্রোটিয়াদের জন্য। মাত্র এক ওভারে ঝড়ে ৩৬ বলে ৫৪ রান কঠিন সমীকরণ থেকে ৩০ বলে ৩০ রানে নামিয়ে এনে ছিলেন এই বিধ্বংসী ব্যাটার। আরও একবার ফাইনালের হারের বেদনায় নীল হওয়ার শঙ্কায় তখন আকশী নীলরা।তবে জাসপ্রিত বুমরাহর দুইটি ওভার বাকি ছিল বলে যেন এরপরেও আশায় বুকবেঁধে ছিল ভারত। বিশ্বসেরা এই পেসার সংকটের মুহূর্তে আরও দলকে আরও একবার পথ দেখালেন।দুই ওভারে দিলেন কেবল ছয়,নিলেন উইকেটও।আগে পরে বুমরাহ-আর্শদীপ সম্ভবত করে ফেললেন নিজেদের জীবনের সেরা তিন ওভার।আর তাতে ববিশ্বাস্য এক জয় তুলে নিয়ে ১১ বছরের খরা কাটাল ভারত। ব্রিজটাউনের রুদ্বশ্বাস ফাইনালে দক্ষিণ আফ্রিকাকে ৭ রানে হারিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো টি-টোয়েন্টি শিরোপা জিতল ভারত।রোহিত শর্মাদের দেওয়া ১৭৬ রানের জবাবে প্রোটিয়াদের ইনিংস থেমেছে ৮ উইকেটে ১৬৯ রানে।

প্রথমবার ভারত টি-টোয়েন্টি শিরোপা জিতেছিল ২০০৭ সালে। দ্বিতীয় শিরোপা জন্য দলটিকে অপেক্ষা করতে হয়েছে ১৭ বছর।আর আইসিসি শিরোপা মিলিয়ে ১১ বছর।মাঝে কত ফাইনাল আর নকআউটে কতবার যে ভারতের স্বপ্ন ভেঙেছে, কতবার যে আকাশী নিলের সমর্থকরা চোখের সামনে শিরোপা হাতছাড়া হতে দেখেছেন সেই গল্প বলতে গেলে দীর্ঘ সময়ের দরকার।তবে ম্যাচ শেষে হওয়া মাত্রই রোহিত শর্মা যেভাবে মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন,হার্দিক পান্ডেয়ার চোখ দিয়ে গড়িয়ে পড়লো অশ্রু তাতে যেন মিশেছিল সেই দীর্ঘশ্বাসের গল্প শেষ হওয়ার আনন্দ।


সেই গল্পের আখ্যান বাদ দিয়ে ম্যাচে ফেরা যাক।১৭৭ রানের লক্ষ্য আগে কখনও তাড়া হয়নি বিশ্বকাপেম ফাইনালে। কাজটা তাই মোটেও সহজ ছিলনা দক্ষিণ আফ্রিকা। সেই কঠিন কাজটা আরও কঠিনতর হয়েছে ভারতীয় পেসারদের বোলিং তোপে।প্রথম ওভারে সুযোগ তৈরি করলেও উইকেটের দেখা পাননি আর্শদীপ।বোলিংয়ে এসেই বুমরাহর ম্যাজিক। দুর্দান্ত এক ডেলিভারিতে বোল্ড করলেন রেজ হেন্ড্রিকসকে(৫ বলে ৪ রান)।আউট হওয়ার পর ওপেনারের চেহারাই যেন বলে দিচ্ছিল ক্রিজের অ্যাঙ্গেল ইউজ করে বুমরাহর করা নিখুঁত আউটসুইঙ্গারটির কোন জবাবই যেন তার সামনে ছিল না। 

 

আর্শদীপের পরের ওভারে অল্পতে ফিরেন এইডেন মার্করামও।প্রোটিয়া ক্যাপ্টেনও করতে পেরেছেন কেবল ৪ রান।২.৩ ওভারে ১২ রানে ২ উইকেট হারিয়ে তখন বিপদে প্রোটিয়ারা।তবে ডি কক ও ট্রিস্টান স্টাবস হাল ছাড়তে নারাজ ।এই দুজন শুধু বুমরাহ-আর্শদীপকে পাওয়ারপ্লেতে নিরাপদেই খেলেননি,এরপর আস্কিং রেটের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে রানও তুলেছেন। আর তাতে ৪ ওভারে ২২ রানে থাকা দক্ষিণ ৮ ওভার শেষে তুলে ফেলে ৬২ রান।দারুন ছন্দে থাকা স্টাবস নবম ওভারও শুরু করেছিলেন ছয় মেরে।তবে এরপর অক্ষর প্যাটেলের ফুলটস অবিশ্বাস্যভাবে মিস করে হয়েছেন বোল্ড।২১ বলে ২১ রান করে আউট হন স্টাবস।

তবে প্রোটিয়াদের সেই ধাক্কা বুঝতে দেননি হেনরিখ ক্লাসেন-ডি কক জুটি।আগ্রাসী মেজাজেই ক্রিজে এসেছিলেন হেনরিখ ক্লাসেন। শুরু থেকেই স্পিনারদের উপর চড়াচ্ছিলেন এই বিধ্বংসী ব্যাটসম্যান।বিশেষ করে ১২ তম ওভারে কুলদীপ যাদবকে মীড অফের উপর দিয়ে মারা ছক্কাটা নিঃসন্দেহে পুরো ফাইনালের সেরা শট।ডি-কক পেতে শুরু করেছিলেন বাউন্ডারির দেখা।তবে আর্শদীপের বলে মিসটাইম এক শটে  দলীয় ১০৬ রানের মাথায় ৩১ বলে ৩৯ রান করে আউট হন।

ক্রিজে আসলেন ডেভিড মিলার। ৪৫ বলে তখন জয়ের জন্য দরকার ৭১ রান।তবে এই দুজন মিলে পরের ১৫ নিলেন ৪১ রান।যাতে ক্লাসেনের কৃতিত্বই বেশি। 

কুলদীপের করা ১৪তম ওভারের শেষ বলে মিলার চার-ছক্কায় তুলেছিলেন ১০। এর পরের ওভারে অক্ষরের ওপর ঝড় বইয়ে দেন ক্লাসেন। মারেন বিশাল দুটি ছক্কা আর দুটি চার। অক্ষরের করা ১৫তম ওভারে আসে ২৪ রান।দক্ষিণ আফ্রিকার হাতের মুঠোয় ম্যাচ।

উপায় না দেখে রোহিত শর্মা বল তুলে দিলেন বুমরাহর হাতে।সে ওভারে বুমরাহ দিলেন কেবল ৪ রান।পরের ওভারেই হার্দিক ম্যাচ ঘুরিয়ে দেওয়া ব্রেক থ্রু।ওয়াইড স্লোয়ারে ক্লাসেনকে ক্যাচ বানিয়ে ফেরালেন।সে ওভারেও চার রান।

 

পরের ওভারে আরও অপ্রতিরোধ্য বুমরাহ।মার্কো জেনসেনকে 'আনপ্লেয়বল' ইন সুইঙ্গারে ভুল করে পুরো ওভারে দিবেন কেবল দুই রান।৩০ বলে ৩০ রানের সমীকরণ তখন গিয়ে দাঁড়ায় ১২ বলে ২২ রানে।অর্শদীপ নিখুঁত এক  ১৯ তম ওভারে ৪ দিলে শেষ ওভারে প্রোটিয়াদের জয়ের সমীকরণ ৬ বলে ১৬ রান।

 

পুরো ছয় বল খেলতে পারলে সেটা হয়তো মিলার নিয়েও ফেলতে পারতেন।তবে পারলেন না সূর্যকুমারের অবিশ্বাস্য এক ক্যাচে।পান্ডেয়ার করা শেষ ওভারের প্রথম বলটি ছিল ফুলটস,মিড অফের উপর দিয়ে ছয় প্রায় পেয়েই গিয়েছিলেন মিলার।তবে বাউন্ডারির বাইরে থেকে বল টেনে নিয়ে ভারতের ইতিহাসের অন্যতম সেরা ক্যাচ ধরেই সূর্যকুমার সেটিকে ডট।তার থেকে গুরুত্বপূর্ণ সাজঘরে ফিরবেন মিলার।

 

সেই ক্যাচেই মূলত শেষ হয়ে গিয়েছিল ম্যাচ। রাবাদা নেমে প্রথম বলে চার মারলেও কঠিন সেই সমীকরণ আর মেলাতে পারেননি।টি-টোয়েন্টিয়্ব প্রথমবার ফাইনালে উঠে দক্ষিণ আফ্রিকাকে শিরোপা থেকে ৭ রান দূরে থাকতেই থামতে হয়।

এর আগের ভারতের প্রথম ইনিংসের নায়ক ছিলেন বিরাট কোহলি।সেমিফাইনাল শেষে কোহলির অফ-ফর্ম নিয়ে জানতে চাইলে রোহিত শর্মা বলেছিলেন,সে হয়তো নিজের সেরাটা ফাইনালের জন্য জমিয়ে রেখেছে।ভারতীয় ক্যাপ্টেনের কথা যেন মিলে গেল পুরোপুরি। পুরো বিশ্বকাপ জুড়ে ফ্লপ বিরাট ফাইনালে জ্বলে উঠেন দুর্দান্তভাবে।

 

আগে ব্যাট করতে নেমে দ্রুত তিন উইকেট হারিয়ে বিপদে পড়া ভারতকে একমাত্র আগলে রেখে  দলকে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছেন। আক্ষর প্যাটেলকে নিয়ে ভারতকে নিয়ে বিপদ মুক্ত করে ভারতকে নিয়ে গেছেন চ্যালেঞ্জিং সংগ্রহের দিকে।জুটির শুরুতে সাবধানী ব্যাট করলেও শেষে আগ্রাসী ছন্দে তুলেছেন একের পর এক বাউন্ডারি।তার ব্যাটে শুরুর ধাক্কা সামলে প্রথম ইনিংস শেষে সুবিধাজনক অবস্থানেই ছিল ব্লুজরা।

এদিন অবশ্য ব্যাট করতে নেমে শুরুটা দারুণ হয়েছিল ভারতের।কাগিসো রাবাদার প্রথম ওভারে ৩ চারে তুলেছেন ১৫ রান।কেশব মাহরাজের করা দ্বিতীয় ওভারে টানা দুই চারে শুরু দুর্দান্ত ফর্মে থাকা রোহিত শর্মার।আগে ব্যাট করতে নেমে ভারত তখন প্রথম ইনিংসে বিশাল রান জমা করারই ইঙ্গিত দিচ্ছিল। 

তবে এরপরই দলটির উড়ন্ত যাত্রায় ছেদ পরে। সেই ওভারে ওভারের চতুর্থ বলে সুইপ করতে গিয়ে ঠিকঠাক টাইম করতে পারেননি রোহিত শর্মা।হেনিরক ক্লাসেনের কাছে ধরা পড়েন ব্যাকওয়ার্ড স্কয়ার লেগে। আগের দুই ম্যাচে ফিফটির টাকা পাওয়া ভারতীয় ক্যাপ্টেন এদিন ফিরেছেন ৫ বলে ৯ রান করে।মাহরাজের পরের বলে নেমেই আউট রিষাভ পান্থ।প্রথমবারের তিনটি চার হজম করা কাগিসো রাবাদা নিজের দ্বিতীয় ওভারে এসে রান দিয়েছেন তিন। মাহরাজ পরের ওভারে এক চার সহ কোহলি তুললেন ছয় রান।টানা তৃতীয়বারে বোলিংয়ে এসে সাফল্যের দেখাবেন রাবাদা। মাত্র ৩ রানে সাজঘরে ফেরান আক্রমণাত্মক ব্যাটসম্যান সূর্যকুমার যাদব কে।১.২ ওভারে ২৩/০ থেকে ভার‍ত মুহূর্তেই পরিণত হয় ৩৫/৩ এ! ব্যাটিং পাওয়ার প্লেতে রান উঠেছে ৪৫।

 

চাপ থেকে ভারতকে ধীরে ধীরে বের করে আনেন বিরাট কোহলি ও ব্যাটিং অর্ডারের আগে নামা অক্ষর প্যাটেল।জুটিতে প্যাটেলই ছিলেন আগ্রাসী ভূমিকায়  কোহলি সিঙ্গেল ডাবলসে রানের চাকা সজল রাখলেও নিয়মিত বাউন্ডারি নিয়মিত মারার কাজটা করছিলেন এই বাঁহাতি। অষ্টম ও নবম ওভারে যথাক্রমে মার্করাম ও মহারাজকে একটি করে ছক্কা হাঁকান অক্ষর।প্রথম ১০ ওভারে আসে ৭৫ রান।১৪তম ওভারে এই জুটি ভাঙেন উইকেটরক্ষক ডি কক। তার সরাসরি থ্রোতে  রানআউট হয়ে যান দারুণ খেলতে থাকা অক্ষর।তার ব্যাট থেকে আসে ৩১ বলে ৪৭ রান। এতে ভাঙে ভারতের ৫৪ বলে ৭২ রানের চতুর্থ উইকেট জুটি।

 

অক্ষর আউট হওয়ার বদলে যায় কোহলির খেলার ধরণ,রান তুলতে থাকেন ঝড়ের গতিতে।শেষ ৭ ওভারে ভারত তুলেছে ৮১ রান।১৯ তম ওভারে আউট হওয়ার আগে ৫৯ বলে সর্বোচ্চ ৭৬ রান আসে তার ব্যাট থেকে। তিনি ৬ চারের সঙ্গে মারেন ২ ছক্কা।শেষদিকে নেমে শিবম দুবে নেমে ১৬ বলে ২৭ রান করেন ৩ চার ও ১ ছক্কায়।


See More

Latest Photos