জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তরের এনএসসি সিস্টেম জালিয়াতি করে অন্যের সঞ্চয়পত্র মেয়াদপূর্তির আগেই ভাঙিয়ে ২৫ লাখ টাকা তুলে নিয়েছে একটি চক্র। বাংলাদেশ ব্যাংকের মতিঝিল কার্যালয় থেকে কেনা সঞ্চয়পত্রের ক্ষেত্রে এই জালিয়াতি ধরা পড়েছে। মতিঝিল কার্যালয়ের পাসওয়ার্ড ব্যবহার করেই এই সঞ্চয়পত্র জালিয়াতি হয়। এ নিয়ে মতিঝিল থানায় মামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
সঞ্চয়পত্রের টাকা আত্মসাৎ বাংলাদেশ ব্যাংকের পাসওয়ার্ডে !
ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানান, ওই চক্র সব মিলিয়ে ২৫ লাখ টাকা নিজ ব্যাংক হিসাবে টাকা স্থানান্তর করেছে। একইভাবে আরও প্রায় ৫০ লাখ টাকা তুলে নেওয়ার চেষ্টা করলে তা আটকে দিয়েছেন তারা। সঞ্চয়পত্রের সিস্টেম যারা পরিচালনা করেন, তাদের কারও পাসওয়ার্ড ব্যবহার করে এই জালিয়াতি হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে মনে হচ্ছে।
বুধবার (২৯ অক্টোবর) বাংলাদেশ ব্যাংকের সহকারী মুখপাত্র মোহাম্মদ শাহরিয়ার সিদ্দিকী সাংবাদিকদের বলেন, জালিয়াতির ঘটনায় মঙ্গলবার (২৮ অক্টোবর) মতিঝিল থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়েছে। এখন মামলার প্রস্তুতি চলছে। যাদের হিসাবে অর্থ গেছে এবং যারা জালিয়াতিতে জড়িত, তাদের সবাইকে চিহ্নিত করে মামলা করা হবে বলেও জানান তিনি।
ADVERTISEMENT
সূত্র জানায়, বাংলাদেশ ব্যাংকের মতিঝিল কার্যালয় থেকে গত ২৩ অক্টোবর ২৫ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র কেনেন একজন গ্রাহক। তার ব্যাংক হিসাবটি আছে অগ্রণী ব্যাংকের জাতীয় প্রেসক্লাব শাখায়। চারদিনের মাথায় সোমবার (২৭ অক্টোবর) এই সঞ্চয়পত্র ভাঙানো হয় এবং টাকা নেওয়া হয় এনআরবিসি ব্যাংকের দিনাজপুর উপ-শাখার অন্য একজনের হিসাবে। ওই টাকা জমা হওয়ার কিছু সময়ের মধ্যেই ব্যাংকটির রাজধানীর শ্যামলী শাখা থেকে তুলে নেওয়া হয়।
একই প্রক্রিয়ায় একই দিনে ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের মাধ্যমে ৩০ লাখ ও এনআরবি ব্যাংকের মাধ্যমে ২০ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র ভাঙিয়ে টাকা তুলে নেওয়ার চেষ্টা চলে। তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের নজরে এলে তা আটকে দেওয়া হয়।
সূত্র জানায়, জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তরের নিয়ম অনুসারে, কোনো গ্রাহক সঞ্চয়পত্র কেনার সময় যে ব্যাংক হিসাবের তথ্য দেবেন, সেই হিসাবেই সঞ্চয়পত্রের মুনাফা ও আসল টাকা দেওয়া হয়। এ ছাড়া যে অফিস থেকে সঞ্চয়পত্র কেনা হয়, কোনো তথ্য পরিবর্তন, সুদ বা আসল নিতে অবশ্যই সেই অফিসে আবেদন করতে হয়। আবেদন পাওয়ার পর গ্রাহকের দেওয়া মোবাইল নম্বরে একটি ওয়ান টাইম পাসওয়ার্ড (ওটিপি) যায়। উপস্থিত গ্রাহক সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কর্মীকে তৎক্ষণাৎ সেই ওটিপি দেখানোর পর তা ব্যবহার করে নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া মেনে তথ্য পরিবর্তন করা হয়। তবে সব ক্ষেত্রে সার্ভারে ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট বা প্রমাণ থাকে।
তবে দেড় বছর ধরে অনেক ব্যাংক থেকে টাকা তুলতে ব্যর্থ হচ্ছেন গ্রাহকেরা। এসব ব্যাংকে প্রবাসী আয় বা সঞ্চয়পত্রের টাকা এলেও গ্রাহকেরা উত্তোলন করতে পারছেন না বলে অভিযোগ উঠেছে। এ কারণে সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাংক পরিবর্তনের আবেদন করছেন অনেকে। গ্রাহকের সমস্যা বিবেচনায় ব্যাংক পরিবর্তন করে দিচ্ছে প্রতিষ্ঠানগুলো। এই সুযোগ কাজে লাগিয়েই কেউ জালিয়াতির ঘটনা ঘটিয়ে থাকতে পারেন বলে ধারণা করছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের মতিঝিল কার্যালয়ের কর্মকর্তারা।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, তিনটি ঘটনায়ই সঞ্চয়পত্র ক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলেছেন তারা। গ্রাহকেরা জানান, তারা সঞ্চয়পত্র ভাঙানোর আবেদনই করেননি। ফলে তাদের মোবাইল ফোনে কোনো ওয়ান টাইম পাসওয়ার্ডও (ওটিপি) যায়নি। এরপর বাংলাদেশ ব্যাংকের যে তিন কর্মকর্তার কাছে সঞ্চয়পত্র বিক্রির পাসওয়ার্ড ছিল, তাদের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে নতুন তিনজনকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
তারা জানান, পাসওয়ার্ড ব্যবহার করেই যেহেতু এই জালিয়াতি হয়েছে, সেহেতু যাদের কাছে পাসওয়ার্ড ছিল, তারা নজরদারিতে আছেন। এছাড়া বাইরের আরও কারও সংশ্লিষ্টতা আছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
এনআরবিসি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) তৌহিদুল আলম খান জানান, এ ঘটনার পর ডিএমডির নেতৃত্বে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটি কাজও শুরু করেছে। তদন্ত প্রতিবেদন পেলে বিস্তারিত জানানো যাবে।