রাষ্ট্রপতি পদ শূন্য হলে রমজানের মধ্যেই নির্বাচন করার পরিকল্পনা করছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। তবে এখনই পদ শূন্য না হলে পরবর্তীতে হবে এই ভোট। ইসি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, রাষ্ট্রপতি নিজেই কয়েকবার পদে না থাকার কথা বিভিন্ন মিডিয়ায় বলেছেন। বিভিন্ন মহল থেকে বিষয়টি নিয়ে আলোচনাও হচ্ছে।
রাষ্ট্রপতি পদ শূন্য হলে ঈদের আগে নির্বাচনের প্রস্তুতি ইসির
এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ বলেন, একটা নির্বাচন তো আর হুট করে করা যায় না। এজন্য প্রস্তুতির দরকার হয়। আবার রাষ্ট্রপতির পদ কখনো শূন্য রাখা যায় না। তিনি বলেন, রাষ্ট্রপতি পদ শূন্য হলে আমাদের সংসদেরও একটি উপ-নির্বাচন করতে হতে পারে। কেননা, রাষ্ট্রপতি যদি সংসদ সদস্যের মধ্যে নির্বাচিত হন, তবে সংসদেরও একটি আসন খালি হবে। সেই আসনেও উপ-নির্বাচন করতে হবে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে ভারতে আশ্রয় নিলে পরের দিন সংসদ ভেঙে দেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন । এরপর বিভিন্ন মহল থেকে আওয়ামী লীগের আমলে নির্বাচিত রাষ্ট্রপতিকেও অপসারণের আলোচনা শুরু হয় জোরেশোরে। পদত্যাগের বিষয়ে তিনি আরও বলেন, “...নির্বাচিত সরকার এসে যদি বলে আপনি থাকবেন না। নতুন প্রেসিডেন্ট বানায়, এটা পৃথিবীতে হয় নাই, এরকম তো না, বাংলাদেশে হয়নি তা না।” কখন পদত্যাগ করতে চান, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেছিলেন, “নতুন সরকার আসলে... নতুন সরকার বললে, অনুরোধ করলে।” ইসি কর্মকর্তারা বলছেন, রাষ্ট্রপতি এখন সংসদ অধিবেশন ডাকবেন। তারপর যদি বর্তমান রাষ্ট্রপতি থাকতে না চান বা তাকে অপসারণ করা হয়; তবেই এই পদে নির্বাচন হতে পারে। এক্ষেত্রে সংবিধানে তিনটি বিধান রয়েছে। সে অনুযায়ীই কেবল পদটি শূন্য হতে পারে। রাষ্ট্রপতি পদের মেয়াদ রাষ্ট্রপতির অভিশংসন (২) এই অনুচ্ছেদের অধীন কোনো অভিযোগ তদন্তের জন্য সংসদ কর্তৃক নিযুক্ত বা আখ্যায়িত কোনো আদালত, ট্রাইব্যুনাল বা কর্তৃপক্ষের কাছে সংসদ রাষ্ট্রপতির আচরণ গোচর করিতে পারবেন। (৩) অভিযোগ-বিবেচনাকালে রাষ্ট্রপতির উপস্থিত থাকবার এবং প্রতিনিধি-প্রেরণের অধিকার থাকবে। (৪) অভিযোগ-বিবেচনার পর মোট সদস্য-সংখ্যার অন্যূন দুই-তৃতীয়াংশ ভোটে অভিযোগ যথার্থ বলিয়া ঘোষণা করিয়া সংসদ কোনো প্রস্তাব গ্রহণ করিলে প্রস্তাব গৃহীত হওয়ার তারিখে রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হইবে। (৫) এই সংবিধানের ৫৪ অনুচ্ছেদ-অনুযায়ী স্পিকার কর্তৃক রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব-পালনকালে এই অনুচ্ছেদের বিধানাবলি এই পরিবর্তন-সাপেক্ষে প্রযোজ্য হইবে যে, এই অনুচ্ছেদের (১) দফায় স্পিকারের উল্লেখ ডেপুটি স্পিকারের উল্লেখ বলিয়া গণ্য হইবে এবং (৪) দফায় রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হইবার উল্লেখ স্পিকারের পদ শূন্য হওয়ার উল্লেখ বলিয়া গণ্য হবে; এবং (৪) দফায় বর্ণিত কোনো প্রস্তাব গৃহীত হইলে স্পিকার রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালনে বিরত হবেন। অসামর্থ্যের কারণে রাষ্ট্রপতির অপসারণ (২) সংসদ অধিবেশনরত না থাকলে নোটিশ প্রাপ্তিমাত্র স্পিকার সংসদের অধিবেশন আহ্বান করবেন এবং একটি চিকিৎসা-পর্ষদ (অতঃপর এই অনুচ্ছেদে ‘পর্ষদ’ বলিয়া অভিহিত) গঠনের প্রস্তাব আহ্বান করবেন এবং প্রয়োজনীয় প্রস্তাব উত্থাপিত ও গৃহীত হবার পর স্পিকার তৎক্ষণাৎ উক্ত নোটিশের একটি প্রতিলিপি রাষ্ট্রপতির কাছে পাঠানোর ব্যবস্থা করবেন এবং তাহার সহিত এই মর্মে স্বাক্ষরযুক্ত অনুরোধ জ্ঞাপন করিবেন যে, অনুরূপ অনুরোধ জ্ঞাপনের তারিখ হতে ১০ দিনের মধ্যে রাষ্ট্রপতি যেন পর্ষদের নিকট পরীক্ষিত হবার জন্য উপস্থিত হন। (৩) অপসারণের জন্য প্রস্তাবের নোটিশ স্পিকারের নিকট প্রদানের পর হইতে ১৪ দিনের পূর্বে বা ৩০ দিনের পর প্রস্তাবটি ভোটে দেওয়া যাইবে না, এবং অনুরূপ মেয়াদের মধ্যে প্রস্তাবটি উত্থাপনের জন্য পুনরায় সংসদ আহ্বানের প্রয়োজন হইলে স্পিকার সংসদ আহ্বান করবেন। (৪) প্রস্তাবটি বিবেচিত হবার কালে রাষ্ট্রপতির উপস্থিত থাকবার এবং প্রতিনিধি-প্রেরণের অধিকার থাকবে। (৫) প্রস্তাবটি সংসদে উত্থাপনের পূর্বে রাষ্ট্রপতি পর্ষদের দ্বারা পরীক্ষিত হবার জন্য উপস্থিত না হইয়া থাকিলে প্রস্তাবটি ভোটে দেওয়া যাইতে পারিবে এবং সংসদের মোট সদস্য-সংখ্যার অন্যূন দুই-তৃতীয়াংশ ভোটে তাহা গৃহীত হলে প্রস্তাবটি গৃহীত হবার তারিখে রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হবে। (৬) অপসারণের জন্য প্রস্তাবটি সংসদে উপস্থাপিত হবার পূর্বে রাষ্ট্রপতি পর্ষদের নিকট পরীক্ষিত হবার জন্য উপস্থিত হয়ে থাকলে সংসদের নিকট পর্ষদের মতামত পেশ করবার সুযোগ না দেওয়া পর্যন্ত প্রস্তাবটি ভোটে দেওয়া যাবে না। (৭) সংসদ কর্তৃক প্রস্তাবটি ও পর্ষদের রিপোর্ট (যাহা এই অনুচ্ছেদের (২) দফা অনুসারে পরীক্ষার সাত দিনের মধ্যে দাখিল করা হইবে এবং অনুরূপভাবে দাখিল না করা হইলে তাহা বিবেচনার প্রয়োজন হবে না) বিবেচিত হবার পর সংসদের মোট সদস্য-সংখ্যার অন্যূন দুই-তৃতীয়াংশ ভোটে প্রস্তাবটি গৃহীত হলে তাহা গৃহীত হবার তারিখে রাষ্ট্রপতি পদশূন্য হবে। অনুপস্থিতিতে রাষ্ট্রপতি পদে স্পিকার নির্বাচন কমিশনার আবদুর রহমানেল মাছউদ এ বিষয়ে বলেন, সংবিধানের ওইসব কারণে রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে স্পিকার রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করতে পারেন। এক্ষেত্রে দ্রুতই নির্বাচন সম্পন্ন করতে হবে। রাষ্ট্রপতি নির্বাচন (৪) কোন ব্যক্তি রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার যোগ্য হবেন না, যদি তিনি-(ক) পঁয়ত্রিশ বৎসরের কম বয়স্ক হন; অথবা (খ) সংসদ সদস্য নির্বাচিত হইবার যোগ্য না হন; অথবা (গ) কখনও এই সংবিধানের অধীন অভিশংসন দ্বারা রাষ্ট্রপতির পদ হইতে অপসারিত হইয়া থাকেন। রাষ্ট্রপতি পদের মেয়াদ নির্বাচন পদ্ধতি সংসদের অধিবেশন চলাকালে নির্বাচনের প্রয়োজন হলে কমিশন ভোটগ্রহণের অন্যূন সাতদিন পূর্বে স্পিকারের সঙ্গে আলোচনা করে ভোটের সময়সূচি নির্ধারণ করবে। আর সংসদ অধিবেদশ না থাকলে ভোটগ্রহণের দিনে স্পিকারের সঙ্গে অন্যূন্য সাতদিন পূর্বে আলোচনা করে সংসদের বৈঠক সরকারি প্রজ্ঞাপন দ্বারা আহ্বান করবে। রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী হতে হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির মনোনয়নপত্রে একজন সংসদ সদস্যের প্রস্তাবক ও একজন সংসদ সদস্যের সমর্থক হিসেবে স্বাক্ষর থাকতে হবে। এছাড়া যিনি মনোনীত হবেন মনোনয়নপত্রের সঙ্গে সম্মতিসূচক তারও একটি বিবৃতি থাকতে হবে। এই নির্বাচনে ভোটার হবেন সংসদ সদস্যরা। কমিশন একটি ভোটার তালিকা প্রকাশ করবে। বৈধ একাধিক প্রার্থী থাকলে এবং মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের দিন শেষে একাধিক প্রার্থী থাকলে সংসদের বৈঠকে নির্ধারিত দিনে দুপুর ১২টার পর ব্যালট পেপারে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। ভোটগ্রহণ যেমন প্রকাশ্যে হবে, তেমনি ভোট গণনাও প্রকাশ্যে অনুষ্ঠিত হবে। সর্বোচ্চ ভোট যদি একাধিক প্রার্থী পেয়ে যান, তবে তাদের মধ্যে লটারির মাধ্যমে নির্বাচন কমিশনার ভোটের ফলাফল নির্ধারণ করবেন। ফলাফল ঘোষণার ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের ঘোষণাই চূড়ান্ত।
রাষ্ট্রপতি পদের মেয়াদ নিয়ে সংবিধানের ৫০ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, (১) এই সংবিধানের বিধানাবলি সাপেক্ষে রাষ্ট্রপতি কার্যভার গ্রহণের তারিখ হইতে পাঁচ বৎসরের মেয়াদে তাহার পদে অধিষ্ঠিত থাকবেন: তবে শর্ত থাকে যে, রাষ্ট্রপতির পদের মেয়াদ শেষ হওয়া সত্ত্বেও তাহার উত্তরাধিকারী-কার্যভার গ্রহণ না করা পর্যন্ত তিনি স্বীয় পদে বহাল থাকবেন।
(২) একাদিক্রমে হউক বা না হউক-দুই মেয়াদের অধিক রাষ্ট্রপতির পদে কোনো ব্যক্তি অধিষ্ঠিত থাকবেন না।
(৩) স্পিকারের উদ্দেশে স্বাক্ষরযুক্ত পত্রযোগে রাষ্ট্রপতি স্বীয় পদত্যাগ করিতে পারবেন।
(৪) রাষ্ট্রপতি তাহার কার্যভারকালে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হইবার যোগ্য হইবেন না এবং কোনো সংসদ সদস্য রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হইলে রাষ্ট্রপতিরূপে তাহার কার্যভার গ্রহণের দিনে সংসদে তাহার আসন শূন্য হইবে।
অভিসংশন নিয়ে সংবিধানের ৫২ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে—
(১) এই সংবিধান লঙ্ঘন বা গুরুতর অসদাচরণের অভিযোগে রাষ্ট্রপতিকে অভিশংসিত করা যাইতে পারবে; এর জন্য সংসদের মোট সদস্যের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশের স্বাক্ষরে অনুরূপ অভিযোগের বিবরণ লিপিবদ্ধ করে একটি প্রস্তাবের নোটিশ স্পিকারের কাছে দিতে হবে; স্পিকারের কাছে নোটিশ দেওয়ার দিন হতে ১৪ দিনের পূর্বে বা ৩০ দিনের পর এই প্রস্তাব আলোচিত হইতে পারবে না; এবং সংসদ অধিবেশনরত না থাকলে স্পিকার অবিলম্বে সংসদ আহ্বান করবেন।
৫৩ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, (১) শারীরিক বা মানসিক অসামর্থ্যের কারণে রাষ্ট্রপতিকে তাহার পদ হতে অপসারিত করা যাইতে পারবে; ইহার জন্য সংসদের মোট সদস্যের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশের স্বাক্ষরে কথিত অসামর্থ্যের বিবরণ লিপিবদ্ধ করিয়া একটি প্রস্তাবের নোটিশ স্পিকারের কাছে দিতে হবে।
৫৪ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে কিংবা অনুপস্থিতি, অসুস্থতা বা অন্য কোনো কারণে রাষ্ট্রপতি দায়িত্ব পালনে অসমর্থ হলে ক্ষেত্রমত রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত কিংবা রাষ্ট্রপতি পুনরায় স্বীয় কার্যভার গ্রহণ না করা পর্যন্ত স্পিকার রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করবেন।
সংবিধানের ৪৮ (১) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের একজন রাষ্ট্রপতি থাকবেন, যিনি আইন অনুযায়ী সংসদ সদস্যদের দ্বারা নির্বাচিত হবেন।
রাষ্ট্রপতি পদের মেয়াদ নিয়ে সংবিধানের ৫০ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, (১) এই সংবিধানের বিধানাবলি সাপেক্ষে রাষ্ট্রপতি কার্যভার গ্রহণের তারিখ হইতে পাঁচ বৎসরের মেয়াদে তাহার পদে অধিষ্ঠিত থাকবেন: তবে শর্ত থাকে যে, রাষ্ট্রপতির পদের মেয়াদ শেষ হওয়া সত্ত্বেও তাহার উত্তরাধিকারী-কার্যভার গ্রহণ না করা পর্যন্ত তিনি স্বীয় পদে বহাল থাকবেন। (২) একাদিক্রমে হউক বা না হউক-দুই মেয়াদের অধিক রাষ্ট্রপতির পদে কোনো ব্যক্তি অধিষ্ঠিত থাকবেন না। (৩) স্পিকারের উদ্দেশে স্বাক্ষরযুক্ত পত্রযোগে রাষ্ট্রপতি স্বীয় পদত্যাগ করিতে পারবেন। (৪) রাষ্ট্রপতি তাহার কার্যভারকালে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হইবার যোগ্য হইবেন না এবং কোনো সংসদ সদস্য রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হইলে রাষ্ট্রপতিরূপে তাহার কার্যভার গ্রহণের দিনে সংসদে তাহার আসন শূন্য হইবে।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আইন অনুযায়ী, প্রধান নির্বাচন কমিশনার ‘নির্বাচনী কর্তা’ হিসেবে এই নির্বাচন পরিচালনা করবেন। এজন্য একটি জাতীয় সংসদ কক্ষে সংসদ সদস্যের একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে, যেখানে নির্বাচনি কর্তা সভাপতিত্ব করবেন।