পবিত্র শবেকদরের বরকত মহিমা ও তাৎপর্য

Total Views : 9
Zoom In Zoom Out Read Later Print

উম্মতে মোহাম্মদীর জন্য শবেকদর হলো মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে এক বিশেষ নিয়ামত ও বরকতময় রাত। এটি এমনই এক মহিমান্বিত রজনি, যেখানে ইবাদতকারী বান্দাদের ওপর আল্লাহর বিশেষ শান্তি ও রহমত বর্ষিত হয়। মূলত এ পবিত্র রাতেই আল্লাহতায়ালা মানবজাতির হিদায়াতের জন্য পবিত্র কুরআন নাজিল করেছেন। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ বলেন-‘নিশ্চয়ই আমি এটি নাজিল করেছি কদরের রাতে।’ (সূরা-আল কদর-৯৭ : আয়াত ১)।

‘শবেকদর’ শব্দটি ফারসি ও আরবি ভাষার সমন্বয়ে গঠিত একটি মিশ্র শব্দ। এখানে ফারসি শব্দ ‘শব’ অর্থ হলো রাত বা রজনি এবং আরবি ‘কদর’ অর্থ মর্যাদা, সম্মান বা পুণ্য। সেই হিসাবে সামগ্রিকভাবে ‘শবেকদর’-এর অর্থ হলো অত্যন্ত পুণ্যময় রজনি বা মর্যাদাপূর্ণ রাত, যাকে পবিত্র কুরআনের পরিভাষায় ‘লাইলাতুল কদর’ বলা হয়।

মহান আল্লাহ এ পুণ্যময় রজনির মহিমা বর্ণনা করতে গিয়ে এ রাতকে অত্যন্ত বরকতময় হিসাবে অভিহিত করেছেন। বস্তুত শবেকদরের গুরুত্ব ও মর্যাদা বর্ণনা করার লক্ষ্যেই মহান রাব্বুল আলামিন পবিত্র কুরআনে ‘আল-কদর’ নামক একটি পূর্ণাঙ্গ সূরা নাজিল করেছেন। ইবাদতের ক্ষেত্রে শবেকদরের রাতের শ্রেষ্ঠত্ব ও মর্যাদা যে কতখানি, আল্লাহতায়ালা সূরা আল-কদরে তা অত্যন্ত স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছেন। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ এরশাদ করেন-‘কদরের রাত হাজার মাসের চেয়েও শ্রেষ্ঠ (সূরা-আল কদর-৯৭ : আয়াত-৩)’। আর এটি সেই মহিমান্বিত রাত, যখন অসংখ্য ফেরেশতা পৃথিবীতে অবতরণ করেন এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে ফজর পর্যন্ত চারদিকে অবারিত শান্তি ও রহমত বর্ষিত হতে থাকে। পুণ্যময় এ রাতে ফেরেশতাদের আগমন সম্পর্কে পবিত্র কুরআনে আল্লাহতায়ালা আরও ঘোষণা করেন-‘কদরের রজনিতে রুহ ও ফেরেশতা তাদের প্রতিপালকের আদেশক্রমে প্রত্যেক কাজের জন্য নেমে আসেন।’ (সূরা-আল কদর-৯৭ : আয়াত-৪)।

পবিত্র শবেকদরের রাতের ইবাদত অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ। রাসূলুল্লাহ (সা.) শবেকদরের এ বিশেষ ফজিলত সম্পর্কে ইরশাদ করেছেন-‘যে ব্যক্তি কদরের রাতে ইমানের সঙ্গে সাওয়াবের নিয়তে ইবাদত করেছে তার অতীত পাপগুলো ক্ষমা করে দেওয়া হবে।’ [সহিহ আল বুখারি, হাদিস নং ১৯০১ (আন্তর্জাতিক নম্বর)] হজরত রাসূল (সা.) নিজে এ রাতটি পাওয়ার জন্য রমজানের শেষ দশ দিনে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে ইবাদত করতেন এবং সাহাবিগণকেও উৎসাহিত করতেন। এ প্রসঙ্গে হজরত আয়েশা (রা.)-এর বর্ণনা হতে পাওয়া যায়, ‘রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন-তোমরা রমজানের শেষ দশকের বিজোড় রাতে লাইলাতুল কাদরের সন্ধান করো। [বুখারি শরিফ, হাদিস নং ১৮৯০ (ই. ফা. বা)]’ এ ছাড়া আল্লাহ্র রাসূল (সা.) রমজানের শেষ ১০ দিনে ইতিকাফের মাধ্যমে আল্লাহতায়ালার নৈকট্য তথা লাইলাতুল কদর তালাশ করার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেছেন। এ প্রসঙ্গে উম্মুল মুমিনিন হজরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে-‘রাসূলুল্লাহ্ (সা.) রমজানের শেষ দশ দিনে ইতিকাফে বসতেন এবং বলতেন, তোমরা লাইলাতুল কদরকে রমজানের শেষ দশ দিনে তালাশ করো।’ [সহিহ আল বুখারি, হাদিস নং ১৮৭৭ (আধুনিক প্রকাশনী)]। তবে সংখ্যাগরিষ্ঠ উলামায়ে কেরাম এবং অধিকাংশ সাহাবি ও তাবেয়িনদের মতে-২৬ রমজান দিবাগত রাতে তথা ২৭ রমজানের রাতটিই হলো পবিত্র শবেকদর। মূলত এ কারণেই দীর্ঘকাল ধরে মুসলিম বিশ্বে অত্যন্ত ভক্তি ও গুরুত্বের সঙ্গে এ রাতটিকে ‘লাইলাতুল কদর’ হিসাবে পালন করার এক বিশেষ ঐতিহ্য গড়ে উঠেছে। বস্তুত গুনাহ থেকে মুক্তি লাভ এবং মহান আল্লাহর পরম নৈকট্য অর্জনের এক অনন্য সুবর্ণ সুযোগ হিসাবে এ পুণ্যময় রজনিটি আমাদের জন্য এক বিশেষ নেয়ামত ও রাব্বুল আলামিনের পক্ষ থেকে শ্রেষ্ঠ উপহার।

তাই পবিত্র শবেকদরের এ মহিমান্বিত রজনিতে আমাদের মূল করণীয় হবে-মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন এবং তার অশেষ রহমত ও বরকত লাভের লক্ষ্যে নিবিড়ভাবে ইবাদতে মগ্ন হওয়া। বিশেষ করে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহ অনুসরণ করে রমজানের শেষ দশ দিন ইতিকাফে বসা এবং শেষ দশকের বিজোড় রাতগুলোতে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে শবেকদর অন্বেষণ করা আমাদের একান্ত কর্তব্য। আর তারাবিহর নামাজ আদায়ের পর থেকে সারা রাত জেগে বেশি বেশি তওবা-ইস্তিগফার, একাগ্রচিত্তে নফল নামাজ আদায় এবং হজরত রাসূল (সা.)-এর প্রতি অধিক পরিমাণে দরুদ শরিফ পাঠ ও মিলাদ-কিয়ামের মাধ্যমে আল্লাহর স্মরণে রাতটি অতিবাহিত করা উচিত। এ ছাড়া এ মর্যাদাপূর্ণ রাতে নিকটাত্মীয়দের কবর জিয়ারত করে তাদের মাগফিরাত কামনা করা এবং নেককার ব্যক্তি তথা অলি-আউলিয়াগণের মাজার জিয়ারত করাও অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ একটি আমল। পরিশেষে, মহান রাব্বুল আলামিনের দরবারে বিনীত প্রার্থনা-তিনি যেন দয়া করে তার সর্বশ্রেষ্ঠ বন্ধু দয়াল রাসূল (সা.)-এর ওসিলায় আমাদের তকদিরের সব ধরনের খারাবি ও যাবতীয় অকল্যাণ দূর করে দেন এবং এ পুণ্যময় রজনির অশেষ রহমত ও বরকত লাভ করার তৌফিক দান করেন। আমিন।


See More

Latest Photos