আন্তর্জাতিক বিশ্লেষণে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গণমাধ্যম সিএনএন বলছে, ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিমান হামলা শুরুর পর মধ্যপ্রাচ্যে পরিস্থিতি দ্রুত বিস্তৃত হচ্ছে এবং এই সংঘাত আরও বড় আকার নেওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। তাদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এক মাসের মধ্যেই অন্তত ৯টি দেশে এই সংঘাত ছড়িয়ে পড়েছে, যেখানে হাজারো মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে এবং প্রতিদিন বিপুল অর্থনৈতিক ক্ষতি হচ্ছে। এই যুদ্ধের ফলে বিশ্বজুড়ে জ্বালানিসংকটের আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে। বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ইরান ইতিমধ্যে সউদী আরবসহ উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের (জিসিসি) সদস্য দেশগুলো—কুয়েত, বাহরাইন, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ওমানের দিকে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। তবে এসব দেশ এখন পর্যন্ত সরাসরি পাল্টা হামলা না করে কৌশলগত সংযম দেখিয়েছে, যা আঞ্চলিক উত্তেজনা কিছুটা নিয়ন্ত্রণে রেখেছে।
পাকিস্তান কি যুদ্ধে জড়ানোর ঝুঁকিতে ,শান্তির দূত হতে গিয়ে ?
সউদী আরবের ভূমিকা নিয়ে আলোচনায় সাবেক পাকিস্তানি লেফটেন্যান্ট জেনারেল মুহাম্মদ সাঈদ মন্তব্য করেন, সউদী আরব এখন পর্যন্ত অসাধারণ ধৈর্য দেখিয়েছে। তিনি সতর্ক করে বলেন, যদি সউদী আরব সামরিকভাবে পাল্টা জবাব দেয়, তাহলে তারা একা থাকবে না এবং এতে পুরো অঞ্চলেই ব্যাপক যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়তে পারে।
বিশ্লেষণে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২৫ সালে সউদী আরব ও পাকিস্তানের মধ্যে একটি প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের কোনো বড় সংঘাতে সৌদি আরব জড়িয়ে পড়লে পাকিস্তানেরও সেই সংঘাতে টেনে আনার সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। ইসলামাবাদ ইতিমধ্যেই রিয়াদের প্রতি সমর্থন জানিয়েছে এবং দুই দেশের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে।
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বক্তব্য অনুযায়ী, তারা সংঘাত এড়াতে কূটনৈতিক সমাধানের ওপর জোর দিচ্ছেন। সম্প্রতি ইসলামাবাদে তুরস্ক, সউদী আরব ও মিসরের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সঙ্গে বৈঠক করে পাকিস্তান শান্তি উদ্যোগকে এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে। আলোচনার মাধ্যমে সংকট সমাধানের সম্ভাবনাও বিবেচনায় রয়েছে বলে জানানো হয়েছে।
পাকিস্তানের উপপ্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান উভয় পক্ষই পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় আলোচনায় আগ্রহ দেখিয়েছে। পাশাপাশি চীনও এই উদ্যোগকে সমর্থন করছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। তবে এসব প্রচেষ্টা কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা রয়েছে।
বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীদের ইসরায়েলের দিকে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় এই সংঘাত আরও বিস্তৃত হয়েছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে হাজারো সেনা মোতায়েন করছে, যা ইরানের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য স্থল অভিযানের শঙ্কা বাড়াচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে ইরানও দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের প্রস্তুতির কথা বলছে।
ইরানের এক জ্যেষ্ঠ নিরাপত্তা কর্মকর্তা সিএনএনকে জানান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ অব্যাহত থাকবে এবং তাদের মতে, এসব শক্তিকে ‘চরম শিক্ষা’ না দেওয়া পর্যন্ত এই লড়াই থামবে না। অন্যদিকে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বর্তমান পরিস্থিতিতে তাদের প্রধান অগ্রাধিকার নিজেদের প্রতিরক্ষা নিশ্চিত করা, তাই আলোচনার চেয়ে সামরিক প্রস্তুতিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
সব মিলিয়ে বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের মিত্রদের মধ্যে চলমান এই সংঘাত অত্যন্ত জটিল ও বিপজ্জনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। একদিকে সংযম দেখানোর চেষ্টা থাকলেও, অন্যদিকে শক্তি প্রদর্শনের প্রতিযোগিতা যুদ্ধকে আরও বিস্তৃত করার ঝুঁকি তৈরি করছে। পরিস্থিতি যেকোনো সময় নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে বলেও সতর্ক করা হয়েছে। তথ্যসূত্র : সিএনএন