জাতীয় ঐক্য ও সংবিধান সংস্কার

Total Views : 9
Zoom In Zoom Out Read Later Print

সংবিধান সংস্কার পরিষদ ইস্যুতে সংসদের উত্তাপ গড়াচ্ছে রাজপথে। গণভোটের আলোকে জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের দাবিতে শনিবার বিক্ষোভ সমাবেশের ডাক দিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ (এনসিপি) ১১ দলীয় জোট।

অর্থাৎ, জুলাই গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্রীয় কাঠামোর আমূল পরিবর্তনের যে সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, তাকে কেন্দ্র করে বর্তমানে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে এক গঠনমূলক বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ এবং ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ বাস্তবায়নের রূপরেখা নিয়ে সরকারি দল বিএনপি এবং সংসদের বাইরের দলগুলোর মধ্যে দৃষ্টিভঙ্গির যে পার্থক্য তৈরি হয়েছে, তা মূলত একটি শক্তিশালী গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ারই অংশ। তবে এই বিতর্ক যেন রাজপথের উত্তাপে সাধারণ মানুষের জনজীবন ব্যাহত না করে, সেদিকে লক্ষ রাখা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

সরকারি দল বিএনপির পক্ষ থেকে সংবিধান সংশোধন প্রক্রিয়াকে আরও সুসংহত এবং প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার লক্ষ্যে সর্বদলীয় সংসদীয় কমিটি গঠনের যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তা ইতিবাচক। সংসদীয় কমিটির মাধ্যমে সংবিধান সংশোধনের এ প্রক্রিয়াটি দীর্ঘমেয়াদে অধিকতর কার্যকর ও টেকসই হতে পারে। সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তারা জুলাই সনদের প্রতিটি অঙ্গীকারের প্রতি শ্রদ্ধাশীল এবং তা বাস্তবায়নে একটি আইনি ও পদ্ধতিগত কাঠামোর অনুসন্ধান করছে।

একটি নবনির্বাচিত সরকারের জন্য আইনি জটিলতা নিরসন করে অগ্রসর হওয়া অত্যন্ত জরুরি, যাতে ভবিষ্যতের কোনো আইনি চ্যালেঞ্জ সংস্কারের এই মহৎ কাজকে বাধাগ্রস্ত করতে না পারে। অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামীসহ ১১ দলীয় জোটের পক্ষ থেকে গণভোটের রায় দ্রুত বাস্তবায়নের যে দাবি তোলা হচ্ছে, তা জনমতেরই একটি প্রতিফলন। ১২ ফেব্রুয়ারির গণভোটে বিপুলসংখ্যক মানুষের ‘হ্যাঁ’ ভোট প্রমাণ করে, সাধারণ মানুষ সংস্কারের পক্ষে।

তবে এই জনরায়কে কীভাবে সাংবিধানিক কাঠামোয় অন্তর্ভুক্ত করা হবে, তা নিয়ে বিশেষজ্ঞ মহলে ভিন্ন ভিন্ন মত রয়েছে। আইন বিশেষজ্ঞরা যেমন বলছেন, অধ্যাদেশ বাতিল হলেও গণভোটের কার্যকারিতা শেষ হয়ে যায় না, তেমনি সংসদীয় কমিটি মনে করছে, সাংবিধানিক অসংগতি দূর করা অপরিহার্য। সংবিধান সংস্কারের মতো একটি জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তাড়াহুড়ো করা বা জেদাজেদির অবকাশ নেই। কাজেই বর্তমান পরিস্থিতিতে রাজপথের আন্দোলন বা সংঘাতের চেয়ে সংলাপ এবং আইনি আলোচনার গুরুত্ব অনেক বেশি বলে মনে করি আমরা।

সরকার যেহেতু সর্বদলীয় কমিটির মাধ্যমে সমাধানের পথ খুঁজছে, তাই বিরোধী পক্ষগুলোর উচিত সেই প্রক্রিয়ায় নিজেদের দাবি ও প্রস্তাবগুলো জোরালোভাবে তুলে ধরা। মনে রাখতে হবে, জুলাই অভ্যুত্থানের চেতনা ছিল একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশ গড়া, যেখানে সব মতের মানুষের শ্রদ্ধাপূর্ণ সহাবস্থান থাকবে।

এখন মূল চ্যালেঞ্জ হচ্ছে, আইনি জটিলতাগুলো উচ্চ আদালতের মাধ্যমে নিরসন করা এবং রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে একটি ন্যূনতম ঐকমত্য তৈরি করা। সরকার যদি স্বচ্ছতার সঙ্গে সংস্কার প্রক্রিয়া এগিয়ে নিয়ে যায় এবং বিরোধী দলগুলো যদি ধৈর্য ও গঠনমূলক আলোচনার মাধ্যমে দাবি আদায় করে, তবেই রক্তাক্ত জুলাইয়ের চেতনা সার্থক হবে। জনরায়ের প্রতি সম্মান প্রদর্শন এবং সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষা-এ দুইয়ের সমন্বয়েই বাংলাদেশ একটি স্থিতিশীল ও সমৃদ্ধ ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাবে, এটাই প্রত্যাশা।

See More

Latest Photos