বর্তমান সময়ে বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক কিংবা ‘পরকীয়া’ বৃদ্ধির বিষয়টি ব্যাপকভাবে আলোচিত হচ্ছে। বিভিন্ন প্রতিবেদন ও জরিপ অনুযায়ী, এ প্রবণতা বাড়ার পেছনে সামাজিক, প্রযুক্তিগত এবং মানসিক কিছু কারণ বিদ্যমান। বিশেষ করে ভারতের প্রেক্ষাপটে দেখা গেছে, নির্দিষ্ট কিছু ‘পরকীয়া’ বা এক্সট্রাম্যারিটাল ডেটিংঅ্যাপের সাবস্ক্রাইবার সংখ্যা হু হু করে বাড়ছে। এর মধ্যে নারী ব্যবহারকারীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
হু হু করে বাড়ছে বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক
পরকীয়া বাড়ার প্রধান কারণ হচ্ছে— ক্যারিয়ারের ব্যস্ততা ও প্রতিযোগিতামূলক জীবনের কারণে অনেক ক্ষেত্রে দম্পতিরা একে অপরকে পর্যাপ্ত সময় দিতে পারছেন না। বিয়ের কয়েক বছর পর স্বামী-স্ত্রীর মধ্যকার রোমান্টিকতা কমে যাওয়া এবং সাংসারিক জটিলতা বাড়াও একটি বড় কারণ।
সামাজিক মাধ্যমে বিভিন্ন ডেটিংঅ্যাপে নতুন মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ করা এখন অনেক সহজ হয়ে গেছে। গোপনীয়তা বজায় রেখে সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হওয়ায় ‘পরকীয়া’ প্রবণতা দিন দিন বাড়ছে। দাম্পত্য জীবনে মানসিক বা শারীরিক অতৃপ্তি থাকলে মানুষ বাইরের সম্পর্কে জড়ানোর চেষ্টা করে থাকে। একঘেয়েমি কাটাতে কিংবা নতুনত্বের খোঁজে অনেকেই এ পথে পা বাড়ান। আর এর প্রভাব পড়ছে সরাসরি পরিবারগুলোতে।
আর বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলায় বিবাহবিচ্ছেদের একটি প্রধান কারণ হিসেবে পরকীয়াকে চিহ্নিত করেছেন বিশ্লেষকরা। এটি কেবল দম্পতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং সন্তানদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে এবং পারিবারিক বন্ধন শিথিল করে দিচ্ছে। তাই সুস্থ পারিবারিক সম্পর্ক বজায় রাখতে পারস্পরিক বিশ্বাস, সময় দেওয়া এবং খোলাখুলি কথা বলা অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে।
বিবাহিত জীবনের শুরুটা বেশ মধুরই হয়। কিন্তু বিয়ের বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে একটা সময় স্বামী-স্ত্রীর সেই মধ্যকার রসায়ন আর থাকে না। দিনে দিনে বরং ফিকে হতে থাকে। তবে সবার ক্ষেত্রে এমনটি নয়। এমনটি হয়ে থাকে কিছু কিছু মানুষের।
বিশেষ করে যারা সংসার বিবাগী হন, তাদের সবটা গিলে নেয় সাংসারিক জটিলতা। তাই সংসার বিবাগী হয়ে তারা জীবনে সার্থকতা খোঁজেন।
কিন্তু কবি হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় মনে করেন, বৈরাগ্য সাধনে প্রকৃত মুক্তি মেলে না। বরং সংসারের মায়ার বন্ধনে আবদ্ধ থেকেই জীবনকে বাস্তব ভিত্তি দিয়ে সফল ও সার্থক করতে হয়।
অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেখা যায়, সামান্য কথা থেকেই অশান্তি তৈরি হয়। তখন প্রয়োজন হয় একটা বন্ধুর। এবার সমস্যা হচ্ছে, চেনা বন্ধুদের কাছে ব্যক্তিগত সমস্যা জানালে তা নিয়ে সমালোচিত হওয়ার একটা আশঙ্কা থাকে। আর এই ফাঁকফোকর থেকেই জীবনে ঢুকে পড়ে ডেটিংঅ্যাপ। আর তখনই জীবনে জায়গা করে নেয় নানারকম রোমান্স অ্যাপ। বিবাহিতরাও খোলা বাতাস পেতে ডেটিংঅ্যাপে বন্ধুত্ব তৈরি করে থাকেন, যা পরে মোড় নেয় প্রেমের। মনের জানালা খুলে দেওয়া হয়। চলে হৃদয়ের আদান-প্রদান।
গ্লিডেনঅ্যাপের তথ্যানুযায়ী, ব্যবহারকারীর মধ্যে ৬৫ শতাংশই পুরুষ এবং ৩৫ শতাংশ নারী। পুরুষের সংখ্যা বেশি হলেও গত কয়েক বছরে হু হু করে বেড়েছে নারী সাবস্ক্রাইবারের সংখ্যা। গত দুই বছরে নারী সাবস্ক্রাইবারের সংখ্যা বেড়েছে ১৪৮ শতাংশ, যা শুধু নারীর একাকীত্ব নয়; বরং স্বাধীনচেতা হওয়ার প্রমাণ।
আবার সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বদলে গেছে সম্পর্কের সমীকরণ। একবিংশ শতাব্দীতে ডিজিটাল যুগে জায়গা করে নিয়েছে ‘পরকীয়া’। এখন এটা যেন পানিভাত হয়ে দাঁড়িয়েছে। দৈনন্দিন জীবনের চাপ থেকে মুক্তি পেতে বন্ধুত্বের হাতছানিতে সাড়া দিয়ে বহু নারী-পুরুষ জড়িয়ে পড়ছেন ‘পরকীয়ায়’। আর এ ক্ষেত্রে সংখ্যার নিরিখে এগিয়ে নারীরাই। এমনটিই বলছে পরকীয়া অ্যাপ গ্লিডেন। ওই অ্যাপের মোট সাবস্ক্রাইবারের সংখ্যা ৪০ মিলিয়ন পেরিয়েছে, যা অবাক করছে সবাইকে।
এই অ্যাপের ১৮ শতাংশ নারী ব্যবহারকারী বেঙ্গালুরুর। তারপরই রয়েছে হায়দরাবাদ। দিল্লির প্রায় ১১ শতাংশ বাসিন্দা এই অ্যাপ ব্যবহার করে থাকেন। এই অ্যাপ ব্যবহারকারীর আচরণেও কিছু নির্দিষ্ট প্যাটার্ন তৈরি হয়েছে। সদস্যরা প্রতিদিন এক থেকে দেড় ঘণ্টা চ্যাট করে থাকেন। তা দুপুরে ও রাত ১০টার পরে।
এক প্রতিবেদন সূত্রে জানা গেছে, বেশিরভাগ পুরুষই ২৫ থেকে ৩০ বছর বয়সি নারীকে খোঁজেন। অন্যদিকে নারীর আকর্ষণে রয়েছে ৩০ থেকে ৪০ বছর বয়সি পুরুষরা। শুধু তাই নয়, গল্প করার জন্যও এগিয়ে থাকা মানুষকেই পছন্দ করেন সবাই।
পরকীয়াসংক্রান্ত আইনি পরিবর্তন এবং সমাজের একটি অংশের আধুনিক ও উদার দৃষ্টিভঙ্গিও পরোক্ষভাবে এ প্রবণতাকে প্রভাবিত করছে।