হজ শ্রেষ্ঠ অর্জন মুমিন জীবনের

Total Views : 21
Zoom In Zoom Out Read Later Print

হজ একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ, তাৎপর্যপূর্ণ ও বরকতয় ফরজ ইবাদত। হজ আরবি শব্দ। আভিধানিক অর্থ হলো কোনো মহৎ কাজের জন্য দৃঢ় ইচ্ছা বা সংকল্প করা। ইসলামি শরিয়তের পরিভাষায় হজ হচ্ছে পবিত্র কাবা শরিফ এবং মক্কা শরিফের সন্নিকটে মীনা, মুজদালিফা ও আরাফার ময়দানে হজের মাসে নির্দিষ্ট দিনে নির্দিষ্ট সময়ে এবং নির্দিষ্ট স্থানে কাবা পরিদর্শনসহ কতগুলো ফরজ, ওয়াজিব ও সুন্নাত আমল সুন্নাত তরিকায় এবং ধারাবাহিকভাবে সম্পন্ন করা। নামাজ, রোজা, জাকাত যেমন ফরজ ইবাদত, তেমনি কোনো সুস্থ, প্রাপ্তবয়স্ক, জ্ঞানবান এবং যারা পরিবারের নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ ছাড়া হজে রওয়ানা থেকে শুরু করে হজের কাজ সম্পাদন পূর্বক বাড়ি ফেরা পর্যন্ত ব্যয় বহন করার ক্ষমতা রাখে সেসব স্বাধীন মুসলমানদের জন্য হজ একটি অন্যতম বরকতপূর্ণ অবধারিত কর্তব্য। আল্লাহতায়ালা বলেন ‘মানুষের মধ্যে যাদের বাইতুল্লাহ জিয়ারতের সামর্থ্য আছে, আল্লাহর উদ্দেশ্যে ওই গৃহের হজ করা তাদের অবশ্য কর্তব্য’। (সূরা আলে ইমরান ৯৭)।

বাইতুল্লাহর মেহমানদের মর্যাদা : হজ মুসলমানদের দুনিয়া ও আখিরাতে সম্মান ও ইজ্জতের আসন দান করে, সৌভাগ্যের দ্বার খুলে দেয় প্রকৃত হাজির জীবনে। আমাদের প্রিয়নবী (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘যখন তুমি হাজিদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করবে, তখন তুমি তাকে সালাম করবে, মুসাফাহা করবে এবং তার বাড়িতে প্রবেশের আগে তাকে তোমার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করার অনুরোধ করবে। কেননা তিনি ক্ষমাপ্রাপ্ত।’ (বুখারি ও মুসলিম)। হাজিদের জন্য আখেরাতে রয়েছে অফুরন্ত পুরস্কারের সুসংবাদ। নবী (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি কামাচার ও অন্যায় কার্যাদি হতে বিরত থেকে আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালার রেজামন্দির উদ্দেশ্যে হজ আদায় করে, সে মাতৃগর্ভ থেকে সদ্য ভূমিষ্ঠ শিশুর মতো নিষ্পাপ হয়ে ফেরে’ (বুখারি, মুসলিম)। রাসূল (সা.) আরও বলেছেন, ‘জান্নাতই হচ্ছে একমাত্র মাকবুল (বা গ্রহণযোগ্য) হজের পুরস্কার’। (বুখারি ও মুসলিম) ‘আরাফার দিন এত সংখ্যক মানুষকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেন যা অন্য কোনো দিন দেন না। এদিন আল্লাহতায়ালা নিকটবর্তী হন ও আরাফার ময়দানে অবস্থানরত হাজিদের নিয়ে তিনি ফেরেশতাদের সঙ্গে গর্ব করেন ও বলেন ‘ওরা কী চায়?।’

সর্বোত্তম আমল কী এ ব্যাপারে এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (সা.) কে জিজ্ঞেস করলেন। উত্তরে বললেন, ‘অদ্বিতীয় আল্লাহর প্রতি ইমান, তারপর মাবরুর হজ যা সব আমল থেকে শ্রেষ্ঠ। সূর্য উদয় ও অস্তের মধ্যে যে পার্থক্য ঠিক তারই মতো।’ আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণিত হাদিসে এসেছে, ‘উত্তম আমল কি এ মর্মে রাসূলুল্লাহ (সা.) কে জিজ্ঞেস করা হলো। উত্তরে তিনি বললেন, ‘আল্লাহ ও তার রাসূলের প্রতি ইমান। বলা হলো, ‘তারপর কী’? তিনি বললেন, আল্লাহর পথে জিহাদ। বলা হলো তারপর কোনটি? তিনি বললেন, মাবরুর হজ। (বুখারি ও মুসলিম)।

একদা রাসূলুল্লাহ (সা.) কে প্রশ্ন করে আয়েশা (রা.) বলেন, ‘ইয়া রাসূলুল্লাহ (সা.)! আমরা কি আপনাদের সঙ্গে জিহাদে ও অভিযানে যাব না? তিনি বললেন, ‘তোমাদের জন্য উত্তম ও সুন্দরতম জিহাদ হলো ‘হজ’, তথা মাবরুর হজ।’ (বুখারি ও মুসলিম)। ‘হজ ও উমরা পালনকারীরা আল্লাহর অফদ-মেহমান। তারা যদি আল্লাহকে ডাকে আল্লাহ তাদের ডাকে সাড়া দেন। তারা যদি গুনাহ মাফ চায় আল্লাহ তাদের গুনাহ মাফ করে দেন।’ আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত এক হাদিসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘এক উমরা হতে অন্য উমরা, এ দুয়ের মাঝে যা কিছু (পাপ) ঘটবে তার জন্য কাফফারা। আর মাবরুর হজের বিনিময় জান্নাত ভিন্ন অন্য কিছু নয়।’ (বুখারি ও মুসলিম)। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘কারও ইসলাম গ্রহণ পূর্বকৃত সব পাপকে মুছে দেয়। হিজরত তার আগের সব গুনাহ মুছে দেয় ও হজ তার আগের সব পাপ মুছে দেয়। ইবনে মাসউদ (রা.) হতে বর্ণিত, ‘তোমরা পরপর হজ ও উমরা আদায় করো। কেননা তা দারিদ্র্য ও পাপকে সরিয়ে দেয় যেমন সরিয়ে দেয় কামারের হাপর লোহা-স্বর্ণ-রুপার ময়লাকে। আর হজে মাবরুরের সওয়াব তো জান্নাত ভিন্ন অন্য কিছু নয়।

মুমিন মুসলমান মাত্রই পবিত্র হজ ও উমরা পালনের মাধ্যমে পবিত্র কাবার জিয়ারত, পুণ্যভূমি আরবের বিভিন্ন বরকতময় স্থান পরিদর্শন, মহানবী হজরত মুহাম্মাদ (সা.)-এর রওজা জিয়ারতের পূত তামান্না পোষণ করেন। অনেক সামর্থ্যবান হাজি একবার ফরজ হজ সম্পাদন করা সত্ত্বেও পুনঃপুনঃ হজ ও উমরা করেন, আল্লাহপাকের সন্তুষ্টি অর্জনে ও নবী (স.)-এর মুহাব্বতে। আসলে মুমিনদের মনমানসিকতা এমন হওয়াই স্বাভাবিক। কিন্তু এমন অনেক দুর্ভাগা ধনী রয়েছেন, যাদের আল্লাহ কোটি কোটি টাকা দেওয়া সত্ত্বেও জীবনে হজ নসিব হয়নি; কেউ কেউ যথেষ্ট বয়স পাওয়া ও দুনিয়াদারি করার সুযোগ ভোগ করা সত্ত্বেও হজের সুযোগ গ্রহণ না করে দুনিয়া থেকে চিরবিদায় গ্রহণ করেছেন। শরিয়তের দৃষ্টিতে এ এক দুর্ভাগ্যের সংবাদ। রাসূলে কারিম (সা.) হাদিস শরিফে স্পষ্ট করে বলে দিয়েছেন : যে ব্যক্তি আল্লাহর গৃহ (কাবাঘর) পর্যন্ত পৌঁছার উপযুক্ত ধনসম্পদ ও সাওয়ারির মালিক হওয়া সত্ত্বেও হজ আদায় করল না সে ইয়াহুদি হয়ে মরুক আর নাসারা হয়েই মরুক, তাতে আল্লাহর কিছুই আসে যায় না’ (তিরমিজি)। হে আল্লাহ আমাদের সবাইকে জীবনে একবারের জন্য হলেও ওই বাইতুল্লাহর মেহমান হওয়ার তাওফিক দান করুন। আমিন।

লেখক : আরবি প্রভাষক, বড়হাতিয়া এশাআতুল উলুম ফাজিল মাদ্রাসা, লোহাগাড়া, চট্রগ্রাম।

See More

Latest Photos