বাংলাদেশে পা রাখার পরপরই দুই দেশের জনসংখ্যা ও গণতন্ত্রকে ‘এক করার’ এক অভিনব ও বিতর্কিত মন্তব্য করে দেশের রাজনৈতিক, সামাজিক ও সচেতন মহলে তীব্র ক্ষোভ ও তোলপাড় সৃষ্টি করেছেন নবনিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী। দায়িত্ব গ্রহণের উদ্দেশ্যে সীমান্ত অতিক্রম করে বাংলাদেশে প্রবেশ করেই ‘দুই দেশের মিলে যাওয়া’ নিয়ে তিনি বিতর্কিত মন্তব্য করেন। তাঁর এই বক্তব্যকে দেশের সার্বভৌমত্ব ও স্বাধীনতার ওপর চরম আঘাত হিসেবে দেখছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সর্বস্তরের জনগণ। গত শুক্রবার (১২ জুন) বেলা ১২টার দিকে স্ত্রী মৃণাল ত্রিবেদীকে নিয়ে যশোরের বেনাপোল স্থলবন্দর ইমিগ্রেশন চেকপোস্ট দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেন ভারতের সাবেক কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ও বিজেপি নেতা দীনেশ ত্রিবেদী। সেখানে তাঁকে স্বাগত জানান বাংলাদেশে ভারতের ভারপ্রাপ্ত হাইকমিশনার পবন কুমার তুলসীদাস বাধে এবং বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ডেপুটি চিফ অব প্রটোকল আরিফ মাহমুদ।
ভারতের নতুন হাইকমিশনার বাংলাদেশে পা রাখতেই চরম বিতর্ক উসকে দিলেন
ইমিগ্রেশন ও প্রটোকলসংক্রান্ত আনুষ্ঠানিকতা শেষে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন নতুন হাইকমিশনার। এ সময় পর্যটন ভিসা চালু এবং ভারত কর্তৃক অবৈধ অভিবাসী আখ্যা দিয়ে সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে মানুষ ঠেলে দেওয়া (পুশইন) সংক্রান্ত সাংবাদিকদের সরাসরি প্রশ্ন এড়িয়ে যান তিনি।
পর্যটন ভিসা চালুর বিষয়ে জানতে চাইলে দীনেশ ত্রিবেদী বলেন, “আমি একটাই কথা বলতে পারি; আমাদের যা পপুলেশন আছে ১৪০ কোটি, আর আমি কুড়ি কোটি অ্যাড করি, তাহলে ১৬০; ... তাহলে যা হবে, একসঙ্গে হবে। আলাদাভাবে আমি ভাবছি—আমার মনে ওইটা ঢুকছেই না।” তিনি আরও যোগ করেন, “দেখুন তো হেঁটে চলে এলাম, মনে হচ্ছে না যে আমি বাংলাদেশি না। ...সব সময় আমি বলি একই আকাশ একই বাতাস একই জল তরঙ্গ।”
কোনো এক সাংবাদিক ভারতকে ‘বৃহৎ শক্তি’ হিসেবে উল্লেখ করলে তিনি তা সংশোধন করে বলেন, “নো, নো আমাদের দুজনে মিলে শক্তি; একটা শক্তি হলে হবে না—দুজনে মিলে যা শক্তি হবে, ওইটাই আসল শক্তি। আর ওই শক্তিটা পুরো পৃথিবী যেন দেখে। আমরা মিলেমিশে একটা ক্রিকেট টিম হলে কত ভালো হবে। খেলাধুলা, হেলথ তারপরে টেকনোলজি, এডুকেশন সব মিলে আমরা একটা টিম করে...।”
সীমান্তে পুশইন সংক্রান্ত জটিল প্রশ্নের জবাবে দুই দেশের ‘শক্তিশালী গণতন্ত্রের’ দোহাই দিয়ে তিনি বলেন, “ডেমোক্রেসিতে অনেক ইশুজ থাকে। আপনার একটা বাংলাদেশের স্ট্রং ডেমোক্রেসি, আমাদেরও স্ট্রং ডেমোক্রেসি; দুই ডেমোক্রেসি মিলে গেলে একটা ওয়ার্ল্ড পাওয়ার হয়ে যায়, একটা পুরো ইকোনমিক ওয়ার্ল্ড পাওয়ার হয়ে যায়।”
হাইকমিশনারের এমন দায়িত্বজ্ঞানহীন, দূরভিসন্ধিমূলক ও সার্বভৌমত্বকে প্রশ্নবিদ্ধকারী বক্তব্যের পর দেশের শীর্ষস্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ও বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ কঠোর প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন।
শনিবার (১৩ জুন) সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান তাঁর ভেরিফাইড ফেসবুক অ্যাকাউন্টে দেওয়া এক পোস্টে এই বক্তব্যের তীব্র নিন্দা জানিয়ে সরকারের কাছে সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা দাবি করেছেন। তিনি লেখেন, “তিনি ‘ভারত-বাংলাদেশের এক হয়ে যাওয়া’ বলতে কী বুঝিয়েছেন, আমাদের সরকারের উচিত হবে তাঁর কাছ থেকে তা জেনে নেওয়া। ভারত যেমন একটি স্বাধীন দেশ, বাংলাদেশও তেমনি একটি স্বাধীন দেশ। তাঁর এ বক্তব্য স্পষ্ট না হলে জনমনে অবশ্যই বিভ্রান্তি তৈরি হবে।” তিনি আরও বলেন, “যদি তিনি আক্ষরিক অর্থে এ ধরনের কিছু বুঝিয়ে থাকেন, তাহলে অবশ্যই তা নিন্দনীয়। বিষয়টি স্পষ্ট হওয়া দরকার।”
একই দিন দুপুরে রাজধানীর ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, “যারা ৫৬ হাজার বর্গমাইলের বাংলাদেশে বাংলা ভাষায় কথা বলেন, আর যারা বাইরে কথা বলেন, তাদের ভাষা এক হলেও মনোজগতে পার্থক্য রয়েছে। এজন্য সীমান্তের ওপারে কিংবা কলকাতায় গিয়ে বাঙালির সার্টিফিকেট নিতে হবে না। আমরা নৃতাত্ত্বিকভাবে বাংলাদেশি। আমাদের ক্ষণজন্মা পুরুষ শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’ একটি বিরাট অর্জন।”
তথ্যমন্ত্রী যথাযথ জবাব ও আরও হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, “যদি ১৪০ কোটি আর ২০ কোটি মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করতে চান তাহলে সার্কের ২২০ কোটি মানুষকেও ঐক্যবদ্ধ করতে হবে। যারা এটা চাইবে না আমরা এটাকে সন্দেহের চোখে দেখব। আঞ্চলিকতার জন্য সার্ক এবং আন্তর্জাতিকভাবে জাতিসংঘ—এভাবেই আমরা এগোতে চাই।”