২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক হামলা শুরু করার পর থেকে পারস্য উপসাগরকে কাঁপিয়ে দেওয়া সহিংসতা ও বিশৃঙ্খলার অবসানের পথ যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার কাঠামো চুক্তিটি প্রশস্ত করতে পারে। তবে, এতে ইতিমধ্যেই ক্ষতিগ্রস্ত বিশ^ অর্থনীতি সহসাই পুরুদ্ধারের সম্ভাবনা কম। এই সংঘাত এমন কাঠামোগত পরিবর্তনকে ত্বরান্বিত করেছে, যা ইতোমধ্যেই বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার, বাণিজ্য পথ এবং ভূ-রাজনৈতিক জোটগুলোকে নতুন রূপ দিচ্ছে। সবচেয়ে তাৎক্ষণিক পরিবর্তনটি ঘটেছে জ্বালানি খাতে। মধ্যপ্রাচ্যের তেল ও গ্যাস রপ্তানি প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় দাম আকাশচুম্বী হয়েছে এবং আমদানিকৃত জ্বালানির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল দেশগুলোর ভঙ্গুরতা প্রকাশ পেয়েছে।
বিশ্ব অর্থনীতিকে স্থায়ীভাবে বদলে দিয়েছে ইরান যুদ্ধ
এশিয়া ও ইউরোপ জুড়ে সরকারগুলো সরবরাহ বৈচিত্র্যময় করতে এবং কৌশলগত দুর্বলতা কমাতে প্রচেষ্টা জোরদার করেছে। যদিও জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়াসহ কিছু দেশ সাময়িকভাবে কয়লার ব্যবহার বাড়িয়েছে, তবে এই সংকট নবায়নযোগ্য ও পারমাণবিক শক্তিতে দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগকে ত্বরান্বিত করবে বলে আশা করা হচ্ছে।ব্যাটারি প্রযুক্তি এবং শক্তি সঞ্চয় ব্যবস্থার অগ্রগতি ২০২২ সালে ইউক্রেন সংঘাতের কারণে সৃষ্ট জ্বালানি সংকটের সময়ের তুলনায় এই রূপান্তরকে আরও বেশি অর্জনযোগ্য করে তুলেছে। দেশগুলো যখন বিকল্পের সন্ধান করছে, তখন চীনই এর প্রধান সুবিধাভোগী হিসেবে আবির্ভূত হতে চলেছে। দেশটি সৌর প্যানেল, ব্যাটারি, উইন্ড টারবাইন, ট্রান্সফরমার, উচ্চ-ভোল্টেজ সঞ্চালন সরঞ্জাম এবং শক্তি-ব্যবস্থাপনা সফটওয়্যার উৎপাদনে আধিপত্য বিস্তার করছে, যা এটিকে দ্রুত পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক জ্বালানি ব্যবস্থার কেন্দ্রে হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে।
এই সংঘাত ঐতিহ্যবাহী জ্বালানি উৎপাদকদের মধ্যেও ফাটল উন্মোচিত করেছে। এতে, সউদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যে উত্তেজনা তীব্রতর হয়েছে, যা ওপেক প্লাস জোট থেকে আমিরাতের বেরিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছে। একই সময়ে, সউদি আরব রাশিয়ার আরও ঘনিষ্ঠ হয়েছে, অন্যদিকে লাতিন আমেরিকা জুড়ে জ্বালানি রপ্তানিকারকরা বৈশ্বিক চাহিদা মেটাতে তাদের উৎপাদন ক্ষমতা বাড়াচ্ছে।এর ভূ-রাজনৈতিক প্রভাবও সমানভাবে তাৎপর্যপূর্ণ।
ইরানের সাথে সামরিক সংঘাত চালিয়ে যাওয়ার ওয়াশিংটনের সিদ্ধান্ত ইউরোপীয় মিত্রদের সাথে বিভেদ আরও গভীর করেছে এবং ক্রমবর্ধমান অস্থিতিশীল মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির ধারণাকে আরও শক্তিশালী করেছে। সমালোচকদের মতে, এই সংঘাত বৈশ্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য রক্ষা করার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের সক্ষমতার ওপর আস্থা দুর্বল করে দিয়েছে, বিশেষ করে হরমুজ প্রণালীর মতো কৌশলগত নৌপথে।
এদিকে, ইরান ব্যাপক সামরিক চাপ সত্ত্বেও হুরমুজ নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে আঞ্চলিক বাণিজ্যে চাপ তৈরির সক্ষমতা প্রদর্শন করেছে, এবং উপসাগরীয় অর্থনীতিগুলোর এমন দুর্বলতা প্রকাশ করেছে, যা ভবিষ্যতের বিনিয়োগ সিদ্ধান্তকে বদলে দিতে পারে।
কাতার ও সউদি আরবে জ্বালানি অবকাঠামোর ক্ষতি এবং আর্থিক ও পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে সংযুক্ত আরব আমিরাতের সুনামকে ক্ষতিগ্রস্ত করা হামলাগুলো আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতার অর্থনৈতিক মূল্যকে তুলে ধরেছে।এই যুদ্ধে বৃহত্তর বৈশ্বিক অর্থনীতিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিশ্বব্যাংক এখন আশা করছে যে, ২০২৫ সালের ২.৯ শতাংশ থেকে কমে ২০২৬ সালে বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি ২.৫ শতাংশে নেমে আসবে, এবং একই সাথে প্রধান অর্থনীতিগুলোতে মুদ্রাস্ফীতির চাপ বাড়ছে। উচ্চ ঋণ ব্যয়, ক্রমবর্ধমান সরকারি ঋণের বোঝা এবং বর্ধিত সামরিক ব্যয় আগামী কয়েক বছর ধরে প্রবৃদ্ধিকে বাধাগ্রস্ত করার হুমকি দিচ্ছে।
বিশ্বব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ ইন্দরমিত গিল যেমন সতর্ক করেছেন, বিশ্ব অর্থনীতি আরও অনিশ্চিত ও অস্থিতিশীল হয়ে উঠছে। ইরান যুদ্ধ শুধু বাজারকেই ব্যাহত করেনি; এটি অর্থনৈতিক প্রভাবের পুনর্বণ্টনকে ত্বরান্বিত করেছে, উদীয়মান জ্বালানি শিল্পে চীনের অবস্থানকে শক্তিশালী করেছে এবং মার্কিন নেতৃত্বাধীন সামরিক হস্তক্ষেপের সুদূরপ্রসারী পরিণতিকে তুলে ধরেছে।