বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিয়েও ফুটবলের সৌন্দর্য আর মানবিকতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে ইরান। মাঠে স্বপ্নভঙ্গ হলেও, আয়োজক শহর ও সমর্থকদের উদ্দেশ্যে রেখে গেছে হাতে লেখা এক আবেগঘন বার্তা। যেখানে ছিল শান্তি, সম্মান ও বন্ধুত্বের আহ্বান।
ইরান হৃদয় ছুঁয়ে গেল বিদায়ের পরও শান্তির বার্তা,
বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বে তিন ম্যাচে অপরাজিত থেকেও শেষ ষোলোয় উঠতে পারেনি ইরান। অন্য গ্রুপের নাটকীয় ফলাফল ও টাইব্রেকারের জটিল সমীকরণে স্বপ্নভঙ্গ হয় তাদের। ফলে নির্ধারিত সময়ে একটি ম্যাচও না হেরেও বিদায় নিতে হয়েছে আমির গালেনোইয়ের দলকে।
তবে মাঠের লড়াইয়ের চেয়েও কঠিন ছিল মাঠের বাইরের বাস্তবতা। প্রশাসনিক ও ভ্রমণসংক্রান্ত জটিলতার কারণে পুরো টুর্নামেন্টজুড়ে মেক্সিকোর তিহুয়ানায় অবস্থান করতে হয় ইরানকে। সেখান থেকে প্রতিটি ম্যাচ খেলতে যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে আবার ফিরে আসতে হয়েছে।
ফলে দীর্ঘ ভ্রমণ, সীমিত বিশ্রাম ও ব্যাহত প্রস্তুতির মধ্যেই খেলতে হয়েছে দলটিকে। ভিসা জটিলতাসহ নানা প্রতিবন্ধকতার কথাও প্রকাশ্যে তুলে ধরেন প্রধান কোচ আমির গালেনোই।
মিসরের বিপক্ষে ড্রয়ের পর তিনি বলেন, আমাদের সঙ্গে খুবই খারাপ আচরণ করা হয়েছে। আশা করি বিশ্ব একদিন এই বিষয়গুলো জানতে পারবে।
আরও যোগ করেন, এই তরুণ ফুটবলাররা যা করেছে, তা ইতিহাসে লেখা থাকা উচিত। কারণ আয়োজকদের কাছ থেকে আমরা সবচেয়ে খারাপ আচরণের শিকার হয়েছি।
এসব প্রতিকূলতার মধ্যেও ফুটবলে মনোযোগ ধরে রাখার চেষ্টা করেছে ইরানের খেলোয়াড়রা। আর টুর্নামেন্ট শেষে সেই মানসিকতারই প্রতিফলন দেখা যায় তাদের এক ব্যতিক্রমী উদ্যোগে।
লস অ্যাঞ্জেলেসে বেলজিয়ামের বিপক্ষে গোলশূন্য ড্রয়ের পর তারা ড্রেসিংরুমে রেখে যান হাতে লেখা একটি চিঠি। পরে সেটি প্রকাশ করে ইরান ফুটবল ফেডারেশন।
চিঠিতে লেখা ছিল, ইরানের চেতনা সবসময় জীবন্ত ও অটুট।
সঙ্গে ছিল সব দেশের মানুষের প্রতি শান্তি, সম্মান ও বন্ধুত্বের আহ্বান। খেলোয়াড়রা জানান, তারা সম্মানের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করেছেন এবং মর্যাদা নিয়েই এই শহর ছেড়ে যাচ্ছেন। পাশাপাশি লস অ্যাঞ্জেলেসে তাদের সমর্থন দেওয়া দর্শকদের প্রতিও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
রাজনৈতিক উত্তেজনা, ভ্রমণ দুর্ভোগ ও অনিশ্চয়তায় ঘেরা একটি বিশ্বকাপে এই ছোট্ট বার্তাই হয়ে ওঠে সবচেয়ে বড় মানবিক উদাহরণগুলোর একটি।
এর আগেও তিহুয়ানার স্থানীয় মানুষদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়েছিল ইরান দল। কঠিন পরিস্থিতির মধ্যেও শহরটি তাদের আপন করে নেওয়ায় ধন্যবাদ জানিয়েছিলেন খেলোয়াড়রা। সেই সম্মান ও কৃতজ্ঞতার ধারাবাহিকতাই বজায় থাকে লস অ্যাঞ্জেলেসের বিদায়ী বার্তায়।
শেষ পর্যন্ত অন্য ম্যাচের ফলাফল ইরানের বিপক্ষে যাওয়ায় বিশ্বকাপ মিশন শেষ হয়ে যায়। অল্পের জন্য হাতছাড়া হয় নকআউট পর্বের টিকিট।
তবু বিদায়ের মুহূর্তে জয়-পরাজয়ের হিসাবকে ছাপিয়ে যায় একটি হাতে লেখা চিঠি। যেখানে ফুটবলের ভাষা হয়ে ওঠে শান্তি, সম্মান ও মানবতার বার্তা।