তিনি পর্দায় এলে সময় থমকে দাঁড়ায়, চরিত্রের খোলস ভেঙে জীবন্ত হয়ে ওঠে গল্প। দুই বাংলার চলচ্চিত্রপ্রেমীদের কাছে তিনি কেবল একজন সফল অভিনেত্রীই নন, বরং অভিনয়শৈলী আর অমলিন সৌন্দর্যের এক অনন্য প্রতীক। তিনি জয়া আহসান। আজ ১ জুলাই, দুই বাংলার এই শীর্ষ অভিনেত্রীর বিশেষ দিন শুভ জন্মদিন।
জয়া আহসানের জয়যাত্রা জন্মদিনে জয়া রূপালী ক্যানভাসে
বিশেষ এই দিনে জীবনের আরও একটি বসন্ত পেরিয়ে নতুন বছরে পা রাখলেন তিনি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে রূপালী পর্দার সহকর্মী আর কোটি ভক্ত-অনুরাগীর ভালোবাসায় সিক্ত হচ্ছেন এই তারকা।
অনেকেই হয়তো জানেন না, অভিনয়ের আঙিনায় থিতু হওয়ার আগে জয়ার মন জুড়ে ছিল সুর, ছন্দ আর রঙের খেলা। শৈশবেই তিনি প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি ছবি আঁকা শিখেছিলেন। একই সাথে আকৃষ্ট ছিলেন নাচ ও গানের প্রতি। তবে ভাগ্যের চাকা তাঁকে নিয়ে আসে শোবিজের আলো-ঝলমলে দুনিয়ায়। শুরুতে ছোটপর্দার মাধ্যমে ক্যারিয়ার শুরু করেন জয়া। নাটক ও বিজ্ঞাপনের মডেল হয়ে দ্রুতই জয় করে নিয়েছিলেন দর্শকের হৃদয়। তাঁর অনবদ্য এক্সপ্রেশন আর সাবলীল অভিনয় দ্রুতই তাঁকে তারকা খ্যাতি এনে দেয়। ছোটপর্দায় রাজত্ব করার পরই তিনি নিজেকে প্রস্তুত করেন বড় পর্দার মহাকাব্যের জন্য।
২০০৪ সালে মোস্তফা সরয়ার ফারুকী পরিচালিত ‘ব্যাচেলর’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে জয়া আহসানের রূপালী পর্দায় অভিষেক ঘটে। এটি ক্যারিয়ারের প্রথম ছবি হলেও এরপর বড় পর্দায় দীর্ঘ এক বিরতি নেন তিনি। ২০১০ সালে নূরুল আলম আতিকের ‘ডুবসাঁতার’ ছবির মাধ্যমে আবারও বড় পর্দায় ফিরে আসেন জয়া। তবে ২০১১ সালটি ছিল জয়ার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় টার্নিং পয়েন্ট। নাসির উদ্দীন ইউসুফ পরিচালিত ‘গেরিলা’ ছবিতে ‘বিলকিস’ চরিত্রে তাঁর দুর্দান্ত অভিনয় পুরো দেশের নজর কাড়ে। এই ছবিতে অভিনয়ের সুবাদেই তিনি প্রথমবারের মতো লাভ করেন মর্যাদাপূর্ণ 'জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার'।
শুধু ঢালিউডেই নয়, কলকাতার টলিউড ইন্ডাস্ট্রিতেও জয়া নিজের অভিনয় দক্ষতার একচেটিয়া আধিপত্য বিস্তার করেছেন। বিশেষ করে কৌশিক গাঙ্গুলী পরিচালিত ‘বিসর্জন’ সিনেমা জয়ার ক্যারিয়ারে ভিন্ন মাত্রা যোগ করে। এই ছবির জন্য প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে কলকাতার ‘ফিল্মফেয়ার অ্যাওয়ার্ড’ (জনপ্রিয় ক্যাটাগরি) ও ‘জি সিনে অ্যাওয়ার্ডস’-এ সেরা অভিনেত্রীর পুরস্কার পান তিনি। এ ছাড়া কৌশিক গাঙ্গুলী পরিচালিত ছবিটি শ্রেষ্ঠ বাংলা সিনেমা বিভাগে ভারতের ৬৪তম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার জিতে নেয়।
কলকাতায় জয়ার কাজের পরিধি দিন দিন বেড়েই চলেছে। নন্দিতা রায় ও শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের ‘কণ্ঠ’ সিনেমায় তাঁর অভিনয় দর্শক ও সমালোচক মহলে বিপুল প্রশংসিত হয়। এরপর টলিউড সুপারস্টার প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে ‘রোববার’ ছবিতেও তিনি দেখিয়েছেন তাঁর অভিনয় জাদু। শুধু দর্শক নয়, কলকাতার বড় বড় তারকারাও জয়ার অভিনয়ের প্রশংসায় পঞ্চমুখ। জয়া এখন নিয়মিত দুই বাংলার ছবিতে অভিনয় করে চলছেন।
অভিনয়ের গণ্ডি পেরিয়ে জয়া নিজেকে আত্মপ্রকাশ করেছেন একজন সফল প্রযোজক হিসেবেও। ২০১৮ সালের ১৯ অক্টোবর মুক্তি পায় তাঁর সি-তে সিনেমা প্রযোজিত প্রথম চলচ্চিত্র ‘দেবী’। কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের বিখ্যাত উপন্যাস অবলম্বনে অনম বিশ্বাস পরিচালিত এই ছবিতে রানু চরিত্রে তাঁর অভিনয় এবং ছবির নির্মাণশৈলী দারুণ ব্যবসা সফল হয়। ১০৩ মিনিট দৈর্ঘ্যের এই ছবিতে অভিনয় করেছেন চঞ্চল চৌধুরী, জয়া আহসান, শবনম ফারিয়া, ইরেশ যাকের, অনিমেষ আইচ প্রমুখ। জয়া প্রযোজিত দ্বিতীয় চলচ্চিত্র ‘ফুরুৎ’ এর কাজও বর্তমানে প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
জয়া আহসান নিজেকে প্রতিনিয়ত ভেঙে নতুন করে গড়তে ভালোবাসেন। ২০২৩ সালের শেষের দিকে ভারতের মূলধারার হিন্দি সিনেমা অর্থাৎ বলিউডে তাঁর বর্ণিল অভিষেক ঘটে। অনিরুদ্ধ রায় চৌধুরী পরিচালিত 'কদক সিং' চলচ্চিত্রে পঙ্কজ ত্রিপাঠীর মতো তুখোড় অভিনেতার সাথে স্ক্রিন শেয়ার করে হিন্দি বলয়েও দারুণ প্রশংসা কুড়ান তিনি।
পাশাপাশি তাঁর আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারও এখন দারুণ তুঙ্গে। জয়া অভিনীত ও মুর্তজা অতাশ জমজম পরিচালিত বাংলাদেশ-ইরান যৌথ প্রযোজনার 'ফেরেশতে' চলচ্চিত্রটি আন্তর্জাতিক মহলে দারুণ সাড়া ফেলেছে। ছবিটি গোয়া আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবসহ বিশ্বের বিভিন্ন মর্যাদাপূর্ণ উৎসবে প্রদর্শিত ও প্রশংসিত হয়েছে। এর বাইরেও কান চলচ্চিত্র উৎসবের লাল গালিচায় ও বিভিন্ন প্রিমিয়ারে জয়া আহসানের উপস্থিতি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের নজর কেড়েছে।
বর্তমানে বাংলাদেশে রেকর্ড পাঁচবার শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রী হিসেবে ‘জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার’ (গেরিলা, চোরাবালি, জিরো ডিগ্রী, দেবী এবং বিউটি সার্কাস) পেয়ে জয়া এখন দেশের চলচ্চিত্রের ইতিহাসে অন্যতম শীর্ষ সম্মানিত তারকা। দুই বাংলার সীমানা পেরিয়ে জয়া আহসান এখন বিশ্বমঞ্চে বাংলার সংস্কৃতির প্রতিনিধিত্ব করছেন। জন্মদিনের এই শুভক্ষণে এই গুণী অভিনেত্রীর জন্য রইল নিরন্তর শুভকামনা।