বন্যাদুর্গত এলাকায় ত্রাণ তৎপরতা বাড়াতে হবে

Total Views : 7
Zoom In Zoom Out Read Later Print

বন্যাদুর্গত এলাকায় গণবিপর্যয়ের শেষ নেই। লাগাতার বৃষ্টি ও সীমান্তের ওপার থেকে আসা ঢলে বৃহত্তর চট্টগ্রাম ও সিলেট এলাকার পরিস্থিতির ভয়াবহ অবনতি ঘটেছে। পার্বত্য তিন জেলার সড়কযোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। লাখ লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। তাদের উদ্ধার করে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে আনা জরুরি। যারা ইতোমধ্যে উঁচুস্থানে, বাড়িঘরের মাচায়, রাস্তায়, বাঁধে এবং আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় নিয়েছে, তাদের জন্য সবচেয়ে বড় প্রয়োজন খাদ্য ও নিরাপদ পানি। ইনকিলাবে প্রকাশিত এক খবরে জানানো হয়েছে, বৃহত্তর চট্টগ্রামে সাড়ে সাত লাখের বেশি মানুষ এখনো পানিবন্ধি অবস্থায় রয়েছে। নদনদীর বিভিন্ন পয়েন্ট পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। কিছু কিছু এলাকায় নদীভাঙন ভয়ংকর রূপ নিয়েছে। দুর্গত এলাকায় যে পরিমাণ ত্রাণ সরকারিভাবে দেয়া হয়েছে, তা খুবই অপ্রতুল। ত্রাণ সহায়তার জন্য সর্বত্র হাহাকার দেখা দিয়েছে। উদ্ধার কার্যক্রম ও খাদ্য-পানিসহ ত্রাণ তৎপরতা এখন সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার হলেও এ দু’ক্ষেত্রেই উদ্যোগ ও ব্যবস্থাপনা যথেষ্ট নয়। উদ্ধারযান, ত্রাণসামগ্রী মালামালবাহী যানবাহন আবশ্যক। এ জন্য প্রচুর অর্থের প্রয়োজন। জেলা প্রশাসনের কাছে এত অর্থ নেই যে, এসব কাজ তার পক্ষে করা সম্ভব। নির্দেশ দিলেই জেলা প্রশাসন করতে পারবে, বাস্তব অবস্থা মোটেই তেমন নয়। সেনাবাহিনী যে উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম ভালোভাবে চালাবে সে জন্যও তার অর্থের দরকার। অতীতে বন্যাসহ বিভিন্ন দুর্যোগ মোকাবিলায় সরকারি তৎপরতার পাশাপাশি বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সংগঠন, এনজিও প্রভৃতির তৎপরতা দেখা যেতো। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সেটাও আর দেখা যায় না। বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাসের মতো বড় ও ব্যাপক বিপর্যয় সরকারের একার পক্ষে সামাল দেয়া সম্ভব হয় না বাস্তবকারণেই। এক্ষেত্রে বেসরকারি উদ্যোগ অত্যাবশ্যক হয়ে পড়ে, যার অভাব এখন বড় আকারে পরিলক্ষিত হচ্ছে। বিরোধীদল জামায়াতে ইসলামী বন্যা-দুর্গতদের সহায়তায়, প্রথম এগিয়ে গিয়ে প্রশংসাধন্য হয়েছে। সরকারিদল বিএনপির তরফে নেতাকর্মীদের নির্দেশ দেয়া হয়েছে দুর্গতত্রাণে অংশ নেয়ার জন্য। এ জন্য ফান্ডের প্রয়োজন। সেটা কোথা থেকে আসবে? আগে রাজনৈতিক দল থেকে শুরু করে বিভিন্ন সংগঠন-সংস্থার পক্ষ থেকে শুকনো খাবারসহ ত্রাণসামগ্রী সংগ্রহ করা হতো। সংগৃহীত ত্রাণসামগ্রী দুর্গতদের মাঝে বিতরণ করা হতো। এখন যেহেতু সে রকম কোনো উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না, কাজেই রাজনৈতিক দলগুলোকে ফান্ডের যোগান দিতে হবে। নির্দেশ দিয়ে দায়িত্ব শেষ করলে হবে না।

দুর্গত ও বিপর্যস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানো মানবিক কর্তব্য হিসাবে বিবেচিত হয়ে থাকে। সরকার ও সরকারিদলের দায়িত্ব এক্ষেত্রে তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি। প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহাদী আমিন জানিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দুর্যোগকবলিত এলাকার সার্বক্ষণিক খোঁজ খবর রাখছেন। তিনি এ ব্যাপারে বেশ কিছু নির্দেশনা দিয়েছেন। উল্লেখ করা যেতে পারে, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনাগুলো প্রতিষ্ঠানিক ও সাংগঠনিক। সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্তৃপক্ষের প্রতি তিনি যেমন নির্দেশনা দিয়েছেন, তেমনি দলের তরফে এমপিসহ দলীয় নেতাকর্মীদের প্রতিও নির্দেশনা দিয়েছেন। উভয় ক্ষেত্রে দুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়ানো ও তাদের প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। দলীয় এমপি ও নেতাকর্মীরা প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা কতটা প্রতিপালন করছেন, তা নিয়ে ইতোমধ্যে প্রশ্ন উঠেছে। দুর্গত এলাকায় প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রীরা গেলে উদ্ধার ও ত্রাণ তৎপরতা যেমন জোরদার হতো, তেমনি দুর্গতরা অনুপ্রাণিত ও উজ্জীবিত হতো। জনপ্রতিনিধি হিসাবে সংশ্লিষ্ট এলাকার এমপিদের তো সব সময় দুর্গত এলাকায় পড়ে থাকার কথা, জনমানুষের দুঃখ-দুর্ভোগ সচক্ষে দেখার কথা, প্রতিকার করা কথা। তা কি তারা করছেন? সংসদ অধিবেশনে মন্ত্রী-এমপিদের উপস্থিতি আবশ্যকীয় হলেও প্রাকৃতিক দুর্যোগে বিপর্যস্ত মানুষের পাশে গিয়ে দাঁড়ানোও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। দরকার হলে সাময়িকভাবে সংসদ অধিবেশন স্থগিত করেও মন্ত্রী-এমপিদের এলাকায় যাওয়া নিশ্চিত করা যেতে পারে। মনে রাখতে হবে, যে কোনো সরকারি নির্দেশনা জরুরি ও গুরুত্বপূর্ণ যদি তা, যথাযথভাবে প্রতিপালিত হয়।

বন্যা আমাদের দেশে প্রতিবছরের নিয়মিত দুর্যোগ। বন্যায় বিপুল সংখ্যক মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ফসলহানি ঘটে, ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হয়, রাস্তাঘাট ভাংচুর হয়, নদীভাঙন হয়। নদীভাঙনে কত মানুষের পথে বসে, দরিদ্র হয়, উদ্বাস্তু হয়, তার ইয়ত্তা নেই। বন্যার অনিবার্য অনুষঙ্গী নদীভাঙন। বন্যার সময় নদী ভাঙে; আবার পানি সরে গেলেও নদী ভাঙে। পদ্মা, মেঘনা, যমুনা, তিস্তা প্রভৃতি নদীতে এখন প্রচন্ড ভাঙন দেখা দিয়েছে। পানি নেমে গেলে আরেক দফা ভাঙন দেখা দেবে। এমতাবস্থায়, কীভাবে বন্যা প্রতিরোধ এবং নদীভাঙন থেকে রেহাই পাওয়া যাবে, তা নিয়ে আরো গভীরভাবে চিন্তভাবনা ও পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। বন্যানিরোধ ও ভাঙনরোধক বাঁধ এমনভাবে নির্মাণ করতে হবে, যাতে উভয় ক্ষেত্রে নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়। একইসঙ্গে পানিনিকাশ ব্যবস্থার উন্নয়ন সাধন করতে হবে, যাতে বানের পানি দ্রুত নেমে যায়। আবহাওয়ার পরিবর্তনজনিত কারণে নানা রকম দুর্যোগ বিপর্যয় বাড়ছে। সেক্ষেত্রে দুর্যোগ প্রতিরোধ ও দুর্যোগব্যবস্থাপনার কোনো বিকল্প নেই। বন্যাদুর্গত মানুষের পুনর্বাসন ও তাদের অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার খুবই জরুরি। খাদ্যখাবার জোগানো, বাড়িঘর নির্মাণ-সংস্কার করা, পুনরায় ফসলাদির আবাদ শুরু করা এবং বীজ-সার-সেচের ব্যবস্থা করার জন্য অর্থের প্রয়োজন হবে। এসব ব্যাপারে সরকারকে সহযোগিতা করতে হবে। বন্যায় রাস্তাঘাটের যে ক্ষতি হয়েছে বা হবে তা একটি বড় ক্ষতি। এর মধ্যেই ঢাকা-চট্টগ্রাম, ঢাকা-সিলেট প্রভৃতি মহাসড়ক ও সড়ক ভেঙেচুরে একাকার হয়ে গেছে। সড়ক-মহাসড়কের বুক জুড়ে খানাখন্দক তৈরি হয়েছে। অবিলম্বে সংস্কার না করলে এসব সড়ক-মহাসড়কে যান চলাচল অসম্ভব হয়ে পড়বে। আমরা আশা করবো, সরকার চলমান বন্যা মোকাবিলা, দুর্গতদের উদ্ধার ও ত্রাণ এবং বন্যা পরবর্তী পরিস্থিতি নিরসনে কার্যকর ব্যবস্থা নিশ্চিত করবে

See More

Latest Photos