সু চি কি বেঁচে আছেন চার বছর ধরে নিখোঁজ ?

Total Views : 5
Zoom In Zoom Out Read Later Print

সামরিক জান্তা পরিচালিত আদালতে শুনানির শেষ পর্ব অর্থাৎ ২০২২ সালের পর থেকে আর জনসমক্ষে দেখা যায়নি মিয়ানমারের গণতন্ত্রপন্থী নেত্রী ও নোবেলজয়ী অং সান সু চিকে। প্রায় চার বছর ধরে বন্দি এই নেত্রীর বর্তমান অবস্থা এবং অবস্থান নিয়ে তীব্র উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

তার পরিবার, বিভিন্ন দেশের কূটনীতিক ও আঞ্চলিক নেতারা এখন সু চি বেঁচে আছেন কি না, তার স্পষ্ট প্রমাণ (প্রুফ অব লাইফ) দাবি করছেন।

৮১ বছর বয়সি এই নেত্রীর সর্বশেষ পরিস্থিতি নিয়ে বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ বাড়ার প্রেক্ষাপটে তার ছোট ছেলে কিম আরিস আন্তর্জাতিকভাবে প্রচার চালাচ্ছেন। সম্প্রতি লন্ডনে দেওয়া এক বক্তব্যে আরিস গভীর শঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, তার মা কার্যত জনসমক্ষ থেকে নিখোঁজ হয়ে গেছেন। 

এমনকি ২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর থেকে তার আইনজীবীদেরও সু চির সঙ্গে দেখা করতে দেওয়া হচ্ছে না। জান্তা সরকার এ বছরের শুরুতে সু চিকে কারাগার থেকে সরিয়ে গৃহবন্দি করার দাবি করলেও, তাকে দেখতে দেওয়ার সব আবেদন বারবার প্রত্যাখ্যান করেছে।

সু চির বন্দিদশা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে কূটনৈতিক তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে। গত মাসে নয়া দিল্লিতে এক বৈঠকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি মিয়ানমারের জান্তা প্রধান সিনিয়র জেনারেল মিন অং হ্লাইংয়ের কাছে সু চির বিষয়টি উত্থাপন করেন। এর আগে মে মাসে জাতিসংঘের বিশেষ দূত জুলি বিশপও সু চির সাথে সাক্ষাতের অনুরোধ জানিয়েছিলেন। 

সংশ্লিষ্ট কূটনীতিকরা জানিয়েছেন, সু চির নাম উচ্চারণ করলেই জান্তা প্রধান ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন। এছাড়া ব্যাংককে আসিয়ান পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকেও সু চির শারীরিক অবস্থা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়।

যদিও গত এপ্রিলে সামরিক সরকার দাবি করেছিল যে সু চিকে কারাগার থেকে সরিয়ে গৃহবন্দি করা হয়েছে, তবে এর পক্ষে নির্ভরযোগ্য কোনো প্রমাণ তারা দিতে পারেনি। জান্তা কর্মকর্তারা কেবল একটি ছবি প্রকাশ করেছেন যেখানে তাকে একজন পুলিশ ও সেনা কর্মকর্তার সাথে কথা বলতে দেখা যায়। 

তবে সু চির ছেলে কিম আরিস এই ছবির সত্যতা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করে বলেছেন, ছবিটি সাম্প্রতিক সময়ে তোলা কি না তার কোনো প্রমাণ নেই। তাছাড়া নেপিডোতে তার বাড়িটি ইতোমধ্যেই ভেঙে ফেলা হয়েছে এবং ইয়াঙ্গুনের পুরনো বাসভবনেও তাঁকে রাখা হয়নি বলে জানা গেছে।

দীর্ঘদিন সু চিকে দেখতে না পাওয়ায় কূটনীতিকদের মধ্যে নানা জল্পনা ছড়িয়ে পড়েছে। কেউ কেউ আশঙ্কা করছেন, জান্তা প্রধানের এই অনীহার কারণ হয়তো সু চি গুরুতর অসুস্থ কিংবা বেঁচে নেই। 

তবে বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, সু চিকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন রাখা মূলত তার রাজনৈতিক প্রভাবকে দমিয়ে রাখার কৌশল। বর্তমানে সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে মিয়ানমারের বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠী ও গণতন্ত্রকামী বাহিনী ঐক্যবদ্ধ হয়ে লড়াই করছে। 

বিশেষজ্ঞদের ধারণা, সু চিকে মুক্তি দিলে এই ভঙ্গুর জোটে ফাটল ধরতে পারে, যা জান্তার জন্য রাজনৈতিকভাবে সুবিধাজনক হতে পারত। কিন্তু সামরিক বাহিনী হয়তো সশস্ত্র লড়াইয়ের চেয়ে সু চির নেতৃত্বে অহিংস গণ-আন্দোলন গড়ে ওঠার আশঙ্কাকেই বেশি ভয় পাচ্ছে।

এদিকে তীব্র দমনপীড়নের মধ্যেও মিয়ানমারে সু চির জনপ্রিয়তা কমেনি। গত ১৯ জুন তার ৮১তম জন্মদিনে জান্তার চোখ রাঙানি উপেক্ষা করেই অনেক সমর্থক গোপনে তার দীর্ঘায়ু কামনা করে প্রার্থনা করেছেন। বর্তমানে মিয়ানমারের কারাগারে সাড়ে চৌদ্দ হাজারের বেশি রাজনৈতিক বন্দি রয়েছেন, যাদের মধ্যে শুধু এই বছরেই চরম অবহেলা ও চিকিৎসার অভাবে অন্তত ৬০ জন মারা গেছেন। মায়ের পাশাপাশি এই বন্দিদের দুর্দশার কথাও বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরছেন তার ছেলে।

সু চির এই দীর্ঘ অনুপস্থিতির মাঝেই ইয়াঙ্গুনের বাসভবনে ঘটে গেছে এক বেদনাদায়ক ঘটনা। ২০১০ সালে সু চি গৃহবন্দিত্ব থেকে মুক্তি পাওয়ার পর ছেলে কিম আরিস তাকে ‘তাইচিতো’ নামের একটি কুকুর উপহার দিয়েছিলেন। দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে প্রিয় নেত্রীর ফেরার অপেক্ষায় থাকা বিশ্বস্ত সেই পোষা কুকুরটি গত মাসে মারা গেছে, যা সু চির দীর্ঘকালীন বন্দিদশা ও নিঃসঙ্গতাকে আরও একবার সামনে এনে দিয়েছে।

সূত্র: টাইমস অব ইন্ডিয়া।

See More

Latest Photos