কেউ কাঁদে, কেউ হাসে শেষ রাতে

Total Views : 5
Zoom In Zoom Out Read Later Print

রাত তখন অনেকটা গড়িয়ে গেছে। অ্যাথলেট ভিলেজের করিডরে আর দিনের মতো কোলাহল নেই। নীরবতাও পুরোপুরি নামেনি। কোথাও স্যুটকেসের চাকা মেঝেতে ঘষে এগিয়ে যাচ্ছে, কোথাও আলমারির দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দ, কোথাও শেষ মুহূর্তের হাসি, কোথাও চাপা দীর্ঘশ্বাস। প্রতিটি ঘর নিজের মতো করে গুছিয়ে নিচ্ছে।

স্টেডিয়ামের আলো তখনও কোথাও কোথাও জ্বলছে, প্রতিযোগিতা শেষ। করতালি থেমে গেছে। কেউ গলায় ঝুলিয়ে রেখেছেন পদক, কেউ ফিরছেন খালি হাতে। এই রাতের শেষে সবাই সমান।সবাই ফিরছেন একটি শহরের স্মৃতি নিয়ে।

কয়েক দিন আগেও এই অ্যাথলেট ভিলেজ ছিল পৃথিবীর ছোট্ট সংস্করণ। একই ডাইনিং হলে বসে খাচ্ছেন আফ্রিকার দৌড়বিদ, ক্যারিবীয় দ্বীপের সাঁতারু, এশিয়ার বক্সার, ইউরোপের জিমন্যাস্ট। ভাষা আলাদা, সংস্কৃতি আলাদা, তবু সকালের নাশতা, দুপুরের অনুশীলন আর রাতের আড্ডায় অচেনা মানুষগুলো হয়ে উঠেছিলেন আপন।

একটি কক্ষের সামনে দাঁড়িয়ে দেখা গেল কয়েকজন অ্যাথলেট নিজেদের দেশের জার্সি বিনিময় করছেন। ট্র্যাকে কিংবা রিংয়ে তাঁরা ছিলেন প্রতিদ্বন্দ্বী। এক ইঞ্চি জায়গাও কাউকে ছেড়ে দেননি। আজ সেই জার্সিই হয়ে উঠেছে বন্ধুত্বের সবচেয়ে মূল্যবান স্মারক।

এক তরুণ অ্যাথলেট হাসতে হাসতেই বলছিলেন, ‘পদক সবাই পায় না। কিন্তু এই জার্সিটা আমি সারাজীবন রেখে দেব। এটা আমাকে একজন বন্ধুর কথা মনে করিয়ে দেবে।’

বাংলাদেশ দলের কক্ষেও তখন একই ব্যস্ততা। কেউ যত্ন করে ভাঁজ করছেন লাল-সবুজ জার্সি, কেউ গুছিয়ে রাখছেন অ্যাক্রেডিটেশন কার্ড, কেউ আবার মোবাইলে তোলা ছবিগুলো শেষবারের মতো দেখে নিচ্ছেন। কয়েক দিনের পরিচিত বিছানা, টেবিল, জানালা হঠাৎ করে আপন হয়ে উঠেছে।

অ্যাথলেটিকস ও বক্সিং দলের সদস্যরা এবার দেশে ফিরবেন। তাঁদের কারও গলায় পদক নেই, কিন্তু প্রত্যেকের ব্যাগে রয়েছে নিজের সীমা ছুঁয়ে দেখার অভিজ্ঞতা আর নতুন স্বপ্নের আলো।

বাংলাদেশের এক ক্রীড়াবিদ বলছিলেন, ‘এবার পদক আনতে পারিনি। এই অভিজ্ঞতা আমাদের বদলে দিয়েছে। আবার ফিরব, আরও ভালো প্রস্তুতি নিয়ে।’

রাত যত গভীর হচ্ছিল, ততই করিডরে বাড়ছিল বিদায়ের আলিঙ্গন। কেউ হয়তো আর কোনোদিন দেখা করবেন না। তবু একে অন্যকে জড়িয়ে ধরে বলছেন, ‘আবার দেখা হবে।’কেউ নিজের দেশের ছোট্ট একটি পতাকা উপহার দিচ্ছেন, কেউ একটি ব্যাজ, কেউ শুধু একটি ছবি তুলে রেখে দিচ্ছেন স্মৃতির জন্য।

এক কোণে বসে এক আফ্রিকান অ্যাথলেট ভিডিও কলে কথা বলছিলেন তাঁর মায়ের সঙ্গে। গলায় ঝুলছে পদক। ওপাশে আনন্দে কাঁদছেন মা। একটু দূরেই আরেকজন চুপচাপ বসে জানালার বাইরে তাকিয়ে। তাঁর  কোনো পদক নেই। চোখেমুখে অদ্ভুত এক শান্তি। তার এই যাত্রা এখানেই শেষ নয়।

অ্যাথলেট ভিলেজে জয় আর পরাজয় একই করিডরে পাশাপাশি হাঁটে। এখানে কেউ স্বর্ণপদক নিয়ে দেশে ফিরছেন, কেউ ব্যক্তিগত সেরা সময় নিয়ে, কেউ শুধু অভিজ্ঞতা নিয়ে। তবে  প্রত্যেকের স্যুটকেসে এমন কিছু স্মৃতি আছে, যার দাম কোনো পদকের চেয়ে কম নয়।

একজন তরুণী অ্যাথলেট মোবাইলের স্ক্রিনে ছবি দেখাচ্ছিলেন। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের রঙিন মুহূর্ত, অনুশীলনের ক্লান্ত বিকেল, খাবারের টেবিলে বন্ধুদের সঙ্গে হাসি, রাত জেগে গল্পের একটার পর একটা ছবি। তিনি মৃদু হেসে বললেন, ‘এই ছবিগুলো দেখলেই মনে হবে, আমি একসময় পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর কয়েকটা দিন কাটিয়েছিলাম।’

ভোরের দিকে ভিলেজ আরও নিস্তব্ধ হয়ে এল। অনেক ঘরের দরজা খোলা। বিছানা গুছিয়ে রাখা। কয়েক ঘণ্টা পর এখানকার করিডরে আর থাকবে না এত ভাষার শব্দ, থাকবে না বিভিন্ন দেশের পতাকা আঁকা ট্র্যাকস্যুট, থাকবে না রাত জেগে হাসাহাসি।

সবকিছু আবার আগের মতো হয়ে যাবে।এই দেয়ালগুলো জানবে,এখানে একসময় পৃথিবীর নানা প্রান্তের তরুণ-তরুণীরা একই স্বপ্ন নিয়ে এসেছিলেন। কেউ জিতেছিলেন, কেউ হেরেছিলেন, কিন্তু সবাই মানুষ হিসেবে একটু বেশি সমৃদ্ধ হয়ে ফিরেছিলেন।

ভোর হলে বাংলাদেশের অ্যাথলেট ও বক্সাররাও বিমানে উঠবেন। জানালার নিচে ধীরে ধীরে ছোট হয়ে আসবে স্কটস্টাউন স্টেডিয়াম, অ্যাথলেট ভিলেজ, ক্লাইড নদী। কিন্তু গ্লাসগো তাঁদের ভেতর থেকে যাবে।

শেষ রাতে কেউ কেঁদেছে। কেউ হেসেছে। কেউ বিদায় জানিয়েছে। কেউ আবার নতুন করে দেখা হওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে গেছে।

গ্লাসগোর অ্যাথলেট ভিলেজের শেষ রাত ছিল হাজারো বন্ধুত্বের, অগণিত স্মৃতির, আর নতুন স্বপ্ন নিয়ে ঘরে ফেরার এক নীরব উৎসব। কিছু বিদায় শেষ নয়। কিছু বিদায় শুধু বলে ‘আবার দেখা হবে।’

See More

Latest Photos