রাশিয়ার দ্রুতগতির জেটচালিত ড্রোন হামলা মোকাবিলায় নতুন ধরনের প্রতিরোধী ড্রোন ও অস্ত্র তৈরির চেষ্টা করছে ইউক্রেন। তবে নতুন প্রযুক্তি তৈরিতে এখনও বেশ কিছু সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছে দেশটি
ইউক্রেন নতুন প্রতিরোধ ব্যবস্থা খুঁজছে রাশিয়ার জেটচালিত ড্রোন ঠেকাতে
জুলাইয়ের শুরুতে জেটচালিত রুশ ড্রোন ঠেকাতে তৈরি নতুন প্রজন্মের ইন্টারসেপ্টর ড্রোন পরীক্ষা করে ইউক্রেনের সামরিক বাহিনী। এতে বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান অংশ নেয়। তবে পরীক্ষাটি প্রত্যাশা অনুযায়ী সফল হয়নি বলে সংশ্লিষ্ট দুটি সূত্র জানিয়েছে। খবর রয়টার্সের।
সূত্রগুলো বলেছে, ঘণ্টায় কখনও কখনও ৪০০ কিলোমিটারের বেশি গতিতে চলা ইন্টারসেপ্টর ড্রোন নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। কয়েকটি ড্রোন কাছের মাঠ ও জঙ্গলে গিয়ে বিধ্বস্ত হয়।
রয়টার্সের দেখা ইউক্রেনীয় সামরিক বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, চলতি গ্রীষ্মে মাত্র তিন মাসে রাশিয়া জেটচালিত ড্রোনের ব্যবহার প্রায় ছয় গুণ বাড়িয়েছে।
ইউক্রেনের তৃতীয় আর্মি কোরের ডেপুটি কমান্ডার মাকসিম ঝোরিন শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) টেলিগ্রামে বলেন, জেট ড্রোনের ক্ষেত্রে ইউক্রেন আবারও উদ্যোগ হারিয়েছে। তার ভাষায়, রাশিয়া জেটচালিত শাহেদ ড্রোনের ব্যাপক উৎপাদন ও ব্যবহার শুরু করলেও ইউক্রেন এখনও এগুলো মোকাবিলার কার্যকর উপায় খুঁজে পায়নি।
ইউক্রেনের বিমানবাহিনীর ডেপুটি কমান্ডার ইউরি চেরেভাশেঙ্কো দ্রুতগতির ইন্টারসেপ্টর ড্রোন তৈরির কঠিনতার কথা স্বীকার করেছেন। তবে তিনি বলেন, কম খরচে ব্যাপক উৎপাদনযোগ্য বেশ কয়েকটি সমাধান শিগগিরই মোতায়েন করা সম্ভব হবে।
রাশিয়া ২০২২ সাল থেকে ইউক্রেনে হাজার হাজার সস্তা প্রপেলারচালিত শাহেদ ড্রোন ব্যবহার করে আসছে। এসব ড্রোন ধ্বংস করতে ইউক্রেন কার্যকর প্রতিরোধব্যবস্থা গড়ে তুলেছে এবং অনেক ক্ষেত্রে প্রায় ৯০ শতাংশ ড্রোন ভূপাতিত করতে সক্ষম হয়েছে।
এর পর রাশিয়া আরও দ্রুতগতির ড্রোন তৈরিতে মনোযোগ দেয়। বর্তমানে এসব ড্রোনের গতি ঘণ্টায় ২৪০ থেকে ৫০০ কিলোমিটার পর্যন্ত হতে পারে। ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা সংস্থার হিসাবে, রাশিয়া প্রতি মাসে প্রায় ৩ হাজার জেটচালিত ড্রোন তৈরি করছে।
তথ্য অনুযায়ী, জুনে রাশিয়া ঘণ্টায় ২৪০ থেকে ৫০০ কিলোমিটার গতির প্রায় ৪৫০টি ড্রোন ছুড়েছিল। আগস্টে এই সংখ্যা বেড়ে প্রায় ২ হাজার ৮৫০টিতে দাঁড়ায়। এর বিপরীতে সাধারণ প্রপেলারচালিত শাহেদ ড্রোনের গতি ঘণ্টায় ২০০ কিলোমিটারের কম।
কিয়েভ ও এর আশপাশের অঞ্চল রুশ ড্রোন হামলার অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। মোট হামলার প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এসব এলাকায় হয়েছে। কৃষ্ণসাগরের বন্দরনগরী ওদেসাতেও ব্যাপক হামলা হয়েছে বলে ইউক্রেনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
চেরেভাশেঙ্কোর মতে, ভবিষ্যতে জেটচালিত ড্রোনের ব্যবহার আরও বাড়বে। কিছু হামলায় এসব ড্রোনের অনুপাত ইতোমধ্যে ৭০ শতাংশের বেশি হয়েছে বলেও তিনি জানান।
জেটচালিত ড্রোনের বড় সুবিধা হলো এগুলো দ্রুতগতির এবং নিয়ন্ত্রিতভাবে পথ ও উচ্চতা পরিবর্তন করতে পারে। ইউক্রেনীয় কর্মকর্তাদের ধারণা, গত সপ্তাহে দেশটির নিরাপত্তা সংস্থা এসবিইউর সদর দপ্তরে হামলা চালানো ড্রোনটি ম্যানুয়ালি নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছিল।
যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টার ফর আ নিউ আমেরিকান সিকিউরিটির গবেষক স্যামুয়েল বেনডেট বলেন, ইউক্রেনের যুদ্ধক্ষেত্রে নতুন প্রযুক্তি তৈরি এবং তা মোকাবিলার মধ্যে ক্রমাগত প্রতিযোগিতা চলছে। তার মতে, দ্রুতগতির ও কম খরচের ইন্টারসেপ্টর তৈরি হলে রাশিয়ার বর্তমান সুবিধা কমানো সম্ভব হতে পারে।
রাশিয়ার ড্রোন মোকাবিলায় ইউক্রেন আগে সাধারণত ২ হাজার ডলারের কম খরচের ইন্টারসেপ্টর ড্রোন ব্যবহার করত। এগুলো ধীরগতির শাহেদ ড্রোন ভূপাতিত করতে কার্যকর হলেও জেটচালিত ড্রোনের সঙ্গে গতিতে পেরে উঠছে না।
ইউক্রেনের একটি ইন্টারসেপ্টর ড্রোন ইউনিটের কমান্ডার বরিস দোলিনা বলেন, কিছু জেটচালিত ড্রোন গতিপথ পরিবর্তনের সময় গতি কমালে সেগুলোকে আঘাত করা সম্ভব হয়। তবে রাশিয়া এমন প্রযুক্তি তৈরি করছে, যা কাছাকাছি আসা বস্তুকে শনাক্ত করে ড্রোনের গতি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাড়াতে পারে।
জেটচালিত ড্রোন মোকাবিলায় ইউক্রেনের এক হাজারের বেশি প্রশিক্ষিত ইন্টারসেপ্টর ড্রোন ক্রু রয়েছে। দেশটির ৬০টির বেশি প্রতিষ্ঠান এ ধরনের ড্রোন প্রতিরোধের প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করছে বলে প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি জানিয়েছেন। তবে এখন পর্যন্ত অল্প কয়েকটি প্রতিষ্ঠান কার্যকর ফল দেখাতে পেরেছে।
নতুন সমাধানের মধ্যে কম খরচের নির্দেশনানির্ভর ক্ষেপণাস্ত্রকে সম্ভাবনাময় হিসেবে দেখা হচ্ছে। ইউক্রেনের কাছে থাকা পশ্চিমা দেশগুলোর সরবরাহ করা ব্যয়বহুল আকাশ প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত সীমিত এবং এগুলো মূলত ব্যাপকসংখ্যক জেটচালিত ড্রোন মোকাবিলার জন্য তৈরি হয়নি।
ইউক্রেনীয় বিমানবাহিনীর কর্মকর্তা চেরেভাশেঙ্কো জানান, নতুন কিছু রকেট ইতোমধ্যে পরীক্ষামূলক পর্যায়ে রয়েছে। এগুলোর দাম যে ড্রোনকে ধ্বংস করার জন্য ব্যবহার করা হবে, তার চেয়েও কম হবে বলে তিনি জানান।
রুশ ড্রোনের অবস্থান পরিবর্তন করতে ইউক্রেন আগে ভুয়া জিপিএস তথ্য ব্যবহার করেছিল। তবে নতুন জেটচালিত ড্রোনে উন্নত ১৬-চ্যানেলের অ্যান্টেনা ব্যবহারের কারণে এগুলো জ্যামিং ও সংকেত বিভ্রাটের বিরুদ্ধে বেশি প্রতিরোধী হয়ে উঠেছে।
প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠান ফ্লাই গ্রুপ ইউক্রেনের কর্মকর্তা আনাতোলি খ্রাপচিনস্কির মতে, এখন আর একটি মাত্র প্রতিরোধব্যবস্থা যথেষ্ট নয়। একাধিক প্রযুক্তিকে নেটওয়ার্কের মাধ্যমে একসঙ্গে ব্যবহার করে রুশ ড্রোনের নেভিগেশন ব্যবস্থা বিভ্রান্ত করাই হতে পারে কার্যকর সমাধান।
আরেকটি পদ্ধতি হলো পেছন থেকে ধাওয়া না করে সরাসরি সামনে থেকে ড্রোনকে আঘাত করা। এ ক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক লক্ষ্য নির্ধারণ ব্যবস্থা ব্যবহার করে দ্রুতগতির ড্রোনের গতিপথ নির্ভুলভাবে হিসাব করতে হবে।
চেরেভাশেঙ্কো জানান, স্বয়ংক্রিয় সফটওয়্যার এবং হাতে নিয়ন্ত্রিত ড্রোন—দুই পদ্ধতিতেই এরই মধ্যে কয়েকটি সফল মুখোমুখি প্রতিহত করার ঘটনা ঘটেছে। তবে বড় পরিসরে ব্যবহারের আগে প্রযুক্তিটির আরও উন্নয়ন প্রয়োজন।
এখন পর্যন্ত জেটচালিত ড্রোন মোকাবিলায় ইউক্রেনের ওপর সামরিক বিমানগুলোর বড় চাপ রয়েছে। এসব বিমান দ্রুতগতির ড্রোনের সঙ্গে তাল মেলাতে পারে। তবে আকাশযুদ্ধের ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত কমে যাওয়ায় পাইলটদের কখনও কখনও কামান ব্যবহার করতে হচ্ছে, যা ঝুঁকিপূর্ণ এবং ড্রোনের ধ্বংসাবশেষের সঙ্গে সংঘর্ষের আশঙ্কা তৈরি করে।