জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির পর সরকার বাসভাড়া বাড়ালেও রাজধানীর বিভিন্ন রুটে নতুন ভাড়ার তালিকা না টাঙিয়েই যাত্রীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত টাকা নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। বুধবার রাজধানীর মিরপুর, ফার্মগেট, কাওরান বাজার ও শাহবাগ এলাকায় এমন পরিস্থিতি দেখা যায়।
নতুন ভাড়ার তালিকা ছাড়াই বাড়তি টাকা আদায়, যাত্রীদের সঙ্গে বাগ্বিতণ্ডায় পরিবহণকর্মী
যাত্রীদের অভিযোগ, কোনো কোনো বাসে নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে ৫ থেকে ১০ টাকা পর্যন্ত বেশি নেওয়া হচ্ছে। নতুন ভাড়ার তালিকা দেখতে চাইলে অনেক ক্ষেত্রে বাসের চালক ও সহকারীদের সঙ্গে যাত্রীদের তর্ক-বিতর্ক হচ্ছে। কোথাও কোথাও পরিস্থিতি হাতাহাতির পর্যায়েও পৌঁছানোর অভিযোগ পাওয়া গেছে।
মিরপুরে বাড়তি ভাড়া নেওয়ার অভিযোগ
মিরপুরের বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে যাত্রীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, নতুন ভাড়ার তালিকা না থাকায় ভাড়া নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে।
মিরপুর-১২ নম্বরের বাসিন্দা রেলওয়েত হোসেন জানান, সাগুফতা মোড় থেকে মিরপুর-১০ নম্বরের শাহআলী মার্কেট এলাকায় যেতে আগে ১০ টাকা ভাড়া দিতেন। তবে বুধবার তাঁর কাছে ১৫ টাকা চাওয়া হয়। বাসে নতুন ভাড়ার কোনো তালিকা প্রদর্শন করা হয়নি বলেও জানান তিনি।
মিরপুর-১, ২, ১০, ১১ ও ১২ নম্বর এবং কালশী এলাকার যাত্রীদের কাছ থেকেও একই ধরনের অভিযোগ পাওয়া গেছে। মিরপুর-১২ থেকে গাজীপুরের কালিয়াকৈরে চলাচলকারী এক যাত্রী বলেন, রাজধানী পরিবহণের বাসে আগের তুলনায় ৫ থেকে ১০ টাকা বেশি চাওয়া হচ্ছে।
মিরপুর-১ এলাকার কয়েকজন যাত্রীর অভিযোগ, নতুন ভাড়া কার্যকরের সুযোগ নিয়ে কিছু বাসে নির্ধারিত হারের চেয়ে ইচ্ছামতো ভাড়া দাবি করা হচ্ছে।
শাহবাগ থেকে গাবতলী যাওয়ার সময় জুয়েল সিকদার জানান, আগে তিনি ২০ টাকা ভাড়া দিলেও বুধবার তাঁর কাছ থেকে ৩০ টাকা নেওয়া হয়েছে। নতুন ভাড়ার তালিকা দেখতে চাইলেও বাসকর্মীরা তা দেখাননি বলে তাঁর অভিযোগ।
আজিমপুর থেকে মিরপুরগামী শিক্ষার্থী হাবিবুর রহমান জানান, আগে ১০ টাকা ভাড়া দিলেও এখন একই পথে ১৫ টাকা দিতে হচ্ছে। অন্যদিকে মোহাম্মদপুর থেকে মতিঝিলে নিয়মিত যাতায়াতকারী ফুয়াদ করিমের অভিযোগ, আগে ২০ টাকা নেওয়া হলেও এখন ২৫ থেকে ৩০ টাকা চাওয়া হচ্ছে।
ফার্মগেট ও কাওরান বাজারেও একই চিত্র
কাওরান বাজার এলাকার কয়েকজন যাত্রী জানান, কিছু বাসে আগের তুলনায় ৫ থেকে ১০ টাকা বেশি আদায় করা হচ্ছে। তাঁদের অভিযোগের মধ্যে ওয়েলকাম, প্রজাপতি ও বিকল্প পরিবহণের নামও এসেছে।
ফার্মগেট এলাকায় এক বাসকর্মী জানান, নতুন ভাড়ার তালিকা হাতে না থাকায় যাত্রীদের তা দেখানো সম্ভব হচ্ছে না। এ কারণেই যাত্রীদের সঙ্গে কথা-কাটাকাটি হচ্ছে বলে জানান তিনি।
তবে রজনীগন্ধা পরিবহণের চালক মো. সাকিব হাওলাদারের দাবি, নতুন ভাড়ার তালিকা না পাওয়ায় তাঁদের পরিবহণে আগের ভাড়াই নেওয়া হচ্ছে।
দূরপাল্লার বাসেও বেড়েছে ভাড়া
রাজধানীর সায়েদাবাদ আন্তঃজেলা বাস টার্মিনাল এলাকাতেও বিভিন্ন গন্তব্যে বাড়তি ভাড়া নেওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে।
কয়েকটি পরিবহণের কাউন্টার থেকে জানা যায়, ঢাকা-কুয়াকাটা রুটে আগে ২২০ টাকা নেওয়া হলেও এখন ২৫০ টাকা, ঢাকা-নবীনগর রুটে ৩২০ টাকার পরিবর্তে ৩৫০ টাকা এবং ঢাকা-পিরোজপুর রুটে একটি পরিবহণে ৬৫০ টাকার বদলে ৭০০ টাকা নেওয়া হচ্ছে।
তবে সব রুটে ভাড়া বাড়েনি। ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে হানিফ পরিবহণের নন-এসি বাসে ৭০০ টাকা এবং ঢাকা-রংপুর রুটে বিআরএম পরিবহণে ৭৪৫ টাকা আগের মতোই রাখা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট কাউন্টারকর্মীরা জানিয়েছেন।
সায়েদাবাদের একটি পরিবহণের কাউন্টার ম্যানেজার এসএম তারিফুল ইসলাম বলেন, তাঁদের পরিবহণে আগের তুলনায় ৫০ টাকা বেশি নেওয়া হচ্ছে। ইকোনমি ও বিজনেস ক্লাসের নন-এসি বাসে একই হারে ভাড়া নেওয়া হচ্ছে বলেও দাবি করেন তিনি।
অন্যদিকে হানিফ পরিবহণের ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটের এক কাউন্টারকর্মী জানান, তাঁদের বাসে যাত্রীদের কাছ থেকে আগের নির্ধারিত ভাড়াই নেওয়া হচ্ছে।
যাত্রাবাড়ী এলাকার কয়েকজন যাত্রীর অভিযোগ, কিছু দূরপাল্লার কাউন্টারে আগের তুলনায় ৫০ থেকে ১০০ টাকা পর্যন্ত বেশি চাওয়া হচ্ছে।
নির্ধারিত নতুন ভাড়া কত
সড়ক পরিবহণ ও মহাসড়ক বিভাগের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগরে ডিজেলচালিত বড় বাসের ভাড়া প্রতি কিলোমিটারে ২ টাকা ৫৩ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ২ টাকা ৭০ পয়সা করা হয়েছে।
মহানগরের মিনিবাস এবং ঢাকা পরিবহণ সমন্বয় কর্তৃপক্ষের আওতাধীন এলাকার বাস ও মিনিবাসের ভাড়া প্রতি কিলোমিটারে ২ টাকা ৪৩ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ২ টাকা ৬০ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছে।
এ ছাড়া আন্তঃজেলা ও দূরপাল্লার বাসের ভাড়া প্রতি কিলোমিটারে ২ টাকা ২৩ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ২ টাকা ৪০ পয়সা করা হয়েছে। নতুন নির্ধারিত ভাড়া মঙ্গলবার থেকে কার্যকর হয়েছে।
মহানগর এলাকায় বড় বাসের সর্বনিম্ন ভাড়া ১০ টাকা এবং মিনিবাসের সর্বনিম্ন ভাড়া ৮ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
ভাড়া নিয়ন্ত্রণে অভিযান নিয়ে প্রশ্ন
নির্ধারিত ভাড়ার অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ উঠলেও বুধবার রাজধানীতে ভাড়া তদারকিতে কোনো অভিযান পরিচালিত হওয়ার খবর পাওয়া যায়নি।
এর আগে মঙ্গলবার সড়ক পরিবহণ ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম জানিয়েছিলেন, নির্ধারিত ভাড়ার বেশি আদায় করলে সংশ্লিষ্টদের জবাবদিহির আওতায় আনা হবে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে জরিমানার পাশাপাশি রুট পারমিট বাতিলের মতো ব্যবস্থাও নেওয়া হতে পারে বলে তিনি জানিয়েছিলেন।
এদিকে ঢাকা সড়ক পরিবহণ শ্রমিক ইউনিয়নের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. আলম দেওয়ান বলেন, জ্বালানির দাম বাড়ার পর সরকার বাসভাড়া সমন্বয় করলেও নতুন ভাড়ার প্রজ্ঞাপন হাতে না পাওয়া পর্যন্ত শ্রমিকরা বর্ধিত ভাড়া নিচ্ছেন না।
ফলে একদিকে নতুন ভাড়া কার্যকর হলেও অন্যদিকে অনেক বাসে ভাড়ার তালিকা না থাকায় যাত্রী ও পরিবহণকর্মীদের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। নির্ধারিত ভাড়া কার্যকর ও অতিরিক্ত আদায় বন্ধে কার্যকর তদারকি এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।