চোখে আলো নেই, স্বপ্নে নেই অন্ধকার, সফলতায় দৃষ্টি প্রতিবন্ধী সমিরঞ্জন বিশ্বাস ,মোঃ আবু সঈদ

Total Views : 66
Zoom In Zoom Out Read Later Print

চোখে আলো নেই, কিন্তু স্বপ্ন দেখার শক্তি আছে। দৃষ্টির সীমাবদ্ধতা আছে, কিন্তু এগিয়ে যাওয়ার পথে নেই কোনো বাধা। অভাব, প্রতিবন্ধকতা আর দীর্ঘ অপেক্ষাকে পেছনে ফেলে নিজের যোগ্যতা ও অদম্য ইচ্ছাশক্তিতে এগিয়ে চলেছেন সুনামগঞ্জের শান্তিগঞ্জ উপজেলার জয়কলস গ্রামের সমিরঞ্জন বিশ্বাস। যে প্রতিষ্ঠানে একদিন শিক্ষার্থী হিসেবে ব্রেইল শেখার যাত্রা শুরু করেছিলেন, আজ সেই প্রতিষ্ঠানেই তিনি ব্রেইল শিক্ষক। সমিরঞ্জন বিশ্বাসের এই পথচলা যেন বলে—সফল হওয়ার জন্য চোখের আলো নয়, প্রয়োজন স্বপ্ন দেখার সাহস ও তা পূরণের অদম্য চেষ্টা। সিলেটের জিন্দাবাজারে অবস্থিত গ্রীন ডিসএ্যাবল ফাউন্ডেশন (জিডিএফ) পরিচালিত ডিকেফ দৃষ্টি প্রতিবন্ধী বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিলেন সমিরঞ্জন বিশ্বাস। গত ১ এপ্রিল থেকে তিনি একই প্রতিষ্ঠানে ব্রেইল শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন। শিক্ষার্থী থেকে শিক্ষক হয়ে ওঠার এই অর্জন তার নিজের জন্য যেমন গর্বের, তেমনি প্রতিষ্ঠানটির জন্যও একটি অনন্য সাফল্য। জন্ম থেকেই দৃষ্টিহীন, তবু স্বপ্ন থামেনি সমিরঞ্জন বিশ্বাসের। সুনামগঞ্জের শান্তিগঞ্জ উপজেলার জয়কলস এলাকার ভূমিহীন দিনমজুর সুবল বিশ্বাস ও ললিতা রাণী বিশ্বাসের ছয় সন্তানের মধ্যে দ্বিতীয়। জন্ম থেকেই তিনি দৃষ্টি প্রতিবন্ধী। দারিদ্র্য আর প্রতিবন্ধকতার কারণে ছোটবেলায় তার ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তায় ছিলেন পরিবারের সদস্যরা। আশপাশে দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিশুদের জন্য কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান না থাকায় অন্য শিশুদের মতো বিদ্যালয়ে যাওয়ার সুযোগও হয়নি তার। ফলে শৈশবের একটি দীর্ঘ সময় ঘরের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকতে হয়েছে। তবে সেই সীমাবদ্ধতাই শেষ পর্যন্ত তার জীবনের শেষ কথা হয়ে থাকেনি।

সুনামগঞ্জ ভার্ড চক্ষু হাসপাতালের আওতাধীন সামাজিক পুনর্বাসন প্রকল্প—কমিউনিটি বেইজড রিহেবিলিটেশন (CBR) এ কর্মরত ফিল্ড সুপারভাইজার মোঃ আবু সঈদের মাধ্যমে সমিরঞ্জন বিশ্বাসের পরিবার সিলেটের গ্রীন ডিসএ্যাবল ফাউন্ডেশনের সন্ধান পায়। পরে তাকে ওই প্রতিষ্ঠানে ভর্তি করা হয়। প্রতিষ্ঠানটির প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী পরিচালক মরহুম রজব আলী খান নজীব সমিরঞ্জন বিশ্বাসকে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে আবাসিক সুবিধাসহ শিক্ষার সুযোগ করে দেন।


সমিরঞ্জন বিশ্বাসের জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে মরহুম রজব আলী খান নজীবের। তিনিও ছিলেন একজন দৃষ্টি প্রতিবন্ধী। নিজের সীমাবদ্ধতাকে জয় করে তিনি দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিশুদের জন্য গড়ে তুলেছিলেন মানবিক এই প্রতিষ্ঠান। শুধু শিক্ষা নয়, শিক্ষার্থীদের থাকা-খাওয়া, চিকিৎসা, পড়াশোনা ও সাংস্কৃতিক বিকাশ নিশ্চিত করতেও তিনি কাজ করেছেন। অনেক শিক্ষার্থীর কাছে তিনি ছিলেন অভিভাবকের মতো। সীমিত সামর্থ্যের মধ্যেও দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিশুদের ভবিষ্যৎ গড়ার জন্য আমৃত্যু কাজ করে গেছেন তিনি।
সমিরঞ্জনের জীবনে সেই সুযোগের প্রভাব আজ দৃশ্যমান।

২০০৬ সালে শিক্ষাজীবন শুরু করেন সমিরঞ্জন। পড়াশোনার পাশাপাশি বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডেও অংশ নিতেন তিনি। দৃষ্টি প্রতিবন্ধী হওয়ায় শ্রুতিলেখকের সহায়তায় পরীক্ষায় অংশ নিয়ে ধারাবাহিকভাবে সফলতা অর্জন করেন।
২০১০ সালে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী, ২০১৩ সালে জেএসসি, ২০১৬ সালে এসএসসি এবং ২০১৮ সালে এইচএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন তিনি। এরপর ২০২০ সালে সিলেটের সরকারি মদন মোহন কলেজে ভর্তি হয়ে ২০২২ সালে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন।

শিক্ষাজীবনে একের পর এক ধাপ পেরিয়ে উচ্চশিক্ষা অর্জন করলেও সামনে ছিল নতুন চ্যালেঞ্জ কর্মসংস্থান। চাকরির সন্ধানে দীর্ঘ সংগ্রামে
পড়াশোনা শেষ করে পরিবারের পাশে দাঁড়াতে চাকরির স্বপ্ন দেখেন সমিরঞ্জন। কিন্তু দৃষ্টি প্রতিবন্ধী হওয়ায় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে চেষ্টা করেও চাকরি পাওয়া তার জন্য সহজ হয়নি। চাকরির সন্ধানে জাতীয় ও স্থানীয় বিভিন্ন দৈনিক পত্রিকায় প্রতিবেদনও প্রকাশিত হয়। বিষয়টি নিয়ে সমাজে আলোচনা হলেও কাঙ্ক্ষিত কর্মসংস্থানের সুযোগ পেতে তাকে অপেক্ষা করতে হয়েছে দীর্ঘ সময়।

এরপর আবারও জিডিএফে ফিরে এসে দু-তারা প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন তিনি। নিজের দক্ষতা বাড়ানোর পাশাপাশি চালিয়ে যান সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডও।
২০২৫ সালের ডিসেম্বরে বাংলাদেশ বেতারের লোকসংগীত (গ) বিভাগে শিল্পী হিসেবে স্বীকৃতি অর্জন করেন সমিরঞ্জন। কিন্তু তার স্বপ্ন ছিল একটি স্থায়ী কর্মসংস্থান। যেখানে নিজের যোগ্যতা দিয়ে পরিবারকে সহায়তা করতে পারবেন এবং অন্যদের জন্যও কিছু করতে পারবেন। 

গ্রীন ডিজএ্যাবল ফাউন্ডেশন (জিডিএফ) এর মহাসচিব ও নির্বাহী পরিচালক বায়েজিদ খানের উদ্যোগে সমিরঞ্জনের জন্য বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে চাকরির আবেদন করা হয়। কিন্তু সেখানেও কাঙ্ক্ষিত সুযোগ না পাওয়ায় শেষ পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানের কমিটির সিদ্ধান্তে তাকে ব্রেইল শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।
এ যেন দীর্ঘ অপেক্ষার পর নিজের ঘরেই ফিরে পাওয়া একটি ঠিকানা। যে শ্রেণিকক্ষে একসময় বসে ব্রেইলের অক্ষর শিখেছেন, এখন সেখানেই দাঁড়িয়ে তিনি নতুন প্রজন্মের দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের সেই অক্ষর শেখাচ্ছেন।

সমিরঞ্জনের ব্যক্তিগত সাফল্যের আড়ালে রয়েছে পরিবারের দীর্ঘদিনের আর্থিক সংকট। তার বাবা সুবল বিশ্বাস একজন ভূমিহীন দিনমজুর। অন্যের জায়গায় ঘর বানিয়ে সন্তানদের নিয়ে বসবাস করেন তিনি। ২০২৪-২০২৫ সালে বসবাসের উপযোগী এক টুকরো জায়গা বন্দোবস্তের জন্য আবেদন করেও সরকারি সহায়তা পাননি বলে পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।

এমন বাস্তবতার মধ্যেও সমিরঞ্জনের শিক্ষাজীবন শেষ করে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা তার পরিবারের জন্য যেমন আশার আলো, তেমনি অন্য দৃষ্টি প্রতিবন্ধী তরুণদের জন্যও অনুপ্রেরণার।
অন্যদের জন্যও স্বপ্ন দেখেন সমিরঞ্জন
শিক্ষার্থী থেকে শিক্ষক হওয়ার সুযোগ পেয়ে আনন্দিত ও গর্বিত সমিরঞ্জন বিশ্বাস। নিজের অর্জনকে তিনি শুধু ব্যক্তিগত সাফল্য হিসেবে দেখতে চান না। বরং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য কিছু করতে চান।

সমিরঞ্জনের ভাষায়, তিনি তার অর্জিত জ্ঞান নতুন প্রজন্মের দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে চান। তারা যেন সমাজের অন্য মানুষের মতো স্বাভাবিক ও সম্মানজনক জীবনযাপন করতে পারে এটাই তার প্রত্যাশা।

See More

Latest Photos