২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলা এবং পরবর্তীতে গাজায় ইসরায়েলের শুরু করা অভিযানের তিন বছর পার হয়েছে। এই দীর্ঘ সময়ে মধ্যপ্রাচ্যের পুরো সামরিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ভারসাম্য আমূল বদলে গেছে। ধ্বংস হয়েছে বহু বছরের রাজনৈতিক রূপরেখা, দুর্বল হয়েছে মার্কিন প্রভাব এবং ক্ষুণ্ণ হয়েছে আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য। সম্প্রতি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম আল জাজিরার এক বিশ্লেষণে এসব তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, যুদ্ধের গত তিন বছরে আঞ্চলিক পরাশক্তি ইরানের অক্ষ বা মিত্র নেটওয়ার্ক ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। লেবাননের হিজবুল্লাহ এবং ফিলিস্তিনের হামাসের শীর্ষ নেতৃত্বসহ চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি আততায়ীর হাতে নিহত হন। তা সত্ত্বেও ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা এখনো এই অঞ্চলের বাণিজ্যের অন্যতম মূল পথ লোহিত সাগরে নিজেদের শক্ত অবস্থান বজায় রেখেছে।
যেভাবে বদলে গেল মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতি,৭ অক্টোবরের তিন বছর
অন্যদিকে, ইসরায়েল সামরিক দিক থেকে গাজার সিংহভাগ দখল এবং অঞ্চলটিকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করলেও বিশ্বমঞ্চে তা নিঃসঙ্গ হয়ে পড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের মতো ঐতিহ্যবাহী মিত্রদের কাছেও তেল আবিব তার আগের সমর্থন হারিয়েছে। আব্রাহাম অ্যাকাডের মাধ্যমে আরব বিশ্ব ও ইসরায়েলের মধ্যকার সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের যে মার্কিন উদ্যোগ ছিল, তা এখন অনিশ্চয়তার মুখে। এমনকি কাতারসহ মধ্যপ্রাচ্যের একাধিক দেশে সামরিক হামলা চালিয়ে ইসরায়েল আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক নিয়মনীতি ভেঙেছে বলে বিশ্বজুড়ে তাদের সমালোচনা হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা বলয়ের ওপর ভরসা কমে যাওয়ার পর মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো নতুন মিত্রের সন্ধান করছে। এরই ধারাবাহিকতায় সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান একযোগে ‘মক্কা নিরাপত্তা চুক্তি’ (Mecca Security Pact) স্বাক্ষর করেছে, যেখানে যেকোনো এক দেশে হামলা হলে তা বাকি দুই দেশের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচিত হবে।
সংকট কেবল যুদ্ধক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; এর বড় প্রভাব পড়েছে অর্থনীতিতেও। পারস্য উপসাগরের গুরুত্বপূর্ণ বাব আল-মান্দেব ও হরমুজ প্রণালী অবরুদ্ধ হওয়ায় বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহ বিঘ্নিত হয়েছে। ফলে কাতার ও সৌদি আরবের মতো উপসাগরীয় তেল রপ্তানিকারক দেশগুলো অর্থনৈতিক মন্দা ও প্রবৃদ্ধির ক্ষতির মুখে পড়েছে। অন্যদিকে বিকল্প ব্যবস্থার কারণে পাশ্চাত্য দেশগুলো বড় ধস এড়াতে পারলেও পুরো অঞ্চল জুড়ে সামরিক অনিশ্চয়তা চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক এসব ঘটনার পর বিশ্ব রাজনীতিতে ইসরায়েল অস্থিতিশীলতার প্রধান কারক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে এবং পুরো মধ্যপ্রাচ্য বর্তমানে এক নতুন ও বহুমাত্রিক অক্ষের দিকে মোড় নিচ্ছে। সূত্র: আল জাজিরা।