তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) দাম নিয়মিত নির্ধারণ করা হলেও সেই দামে সিলিন্ডার পাওয়ার নিশ্চয়তা নেই। অক্টোবর মাসের জন্য ১২ কেজির সিলিন্ডারের সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য ১ হাজার ৮৩৭ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। অথচ বাজারে তা ২ হাজার ৩০০ থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে মূল্য সমন্বয়ের পরও সরবরাহসংকট কাটেনি; বরং নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি অর্থ দিয়ে গ্যাস কিনতে হচ্ছে ভোক্তাদের।
এলপিজির সংকট কাটাতে বিপিসির মাধ্যমে আমদানির উদ্যোগ নিতে হবে
দেশে প্রায় এক কোটি গ্রাহক এলপিজি ব্যবহার করেন। এর বড় অংশ ব্যবহৃত হয় গৃহস্থালি রান্নার কাজে। আবাসিক খাতে নতুন গ্যাস-সংযোগ বন্ধ থাকায় বহু পরিবার এখন এলপিজির ওপর নির্ভরশীল। তাই এ জ্বালানির সংকট কেবল ব্যবসায়িক সমস্যা নয়; এটি সরাসরি মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা ও পারিবারিক ব্যয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত। একটি সিলিন্ডারের জন্য নির্ধারিত দামের তুলনায় ৬০০ টাকারও বেশি ব্যয় করতে হলে সীমিত আয়ের পরিবারকে অন্য প্রয়োজনীয় খরচ কমাতে হয়।
আমদানি স্বাভাবিক হলে সংকট কেন?
এলপিজির বর্তমান পরিস্থিতিতে আমদানি, মজুত ও সরবরাহের প্রকৃত চিত্র পরিষ্কার করা জরুরি। আমদানিকারকদের সংগঠনের দাবি, আগস্ট ও সেপ্টেম্বরে আমদানি স্বাভাবিক ছিল। অন্যদিকে পরিবেশকদের অভিযোগ, অল্প কয়েকটি কোম্পানি নিয়মিত সরবরাহ করলেও চাহিদা অনুযায়ী গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না।
আমদানি স্বাভাবিক থাকার দাবি সত্য হলে বাজারে ঘাটতি তৈরি হচ্ছে কেন, তার ব্যাখ্যা প্রয়োজন। আমদানি থেকে শুরু করে পরিবেশক ও খুচরা বিক্রেতার পর্যায় পর্যন্ত কোথায় সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, কোন প্রতিষ্ঠান কতটা গ্যাস বাজারে ছাড়ছে এবং মজুতের পরিমাণ কত—এসব তথ্য প্রকাশ করা উচিত।
জ্বালানি বিভাগ ও বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) উচিত আমদানি, মজুত, পাইকারি বিক্রি ও খুচরা সরবরাহের তথ্য মিলিয়ে সংকটের উৎস শনাক্ত করা। পরিবহন বা বিতরণব্যবস্থায় সমস্যা থাকলে তা দ্রুত সমাধান করতে হবে। কোনো প্রতিষ্ঠান সরবরাহ সীমিত রেখে বাড়তি দাম আদায়ের সুযোগ নিচ্ছে কি না, সেটিও নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন।
কমিশন ও পরিচালন ব্যয়ের বিষয়টিও বিবেচ্য
পরিবেশকদের দাবি, পাঁচ বছর আগে নির্ধারিত কমিশন বর্তমান পরিবহন, শ্রম ও পরিচালন ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এ দাবি যাচাই করে কমিশন পুনর্নির্ধারণের প্রয়োজন আছে কি না, তা বিবেচনা করা যেতে পারে।
তবে ব্যবসায়ীদের ব্যয় বৃদ্ধির দাবি যাচাই করা এবং নির্ধারিত মূল্য অমান্য করার সুযোগ দেওয়া এক বিষয় নয়। বাস্তব ব্যয় উপেক্ষা করে অকার্যকর মূল্যকাঠামো বহাল রাখা যেমন যুক্তিযুক্ত নয়, তেমনি কমিশন কম হওয়ার অজুহাতে ইচ্ছামতো দাম বাড়ানোও গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
এ ক্ষেত্রে কোম্পানি থেকে শুরু করে পরিবেশক ও খুচরা বিক্রেতা—সরবরাহব্যবস্থার প্রতিটি স্তরে মূল্য নির্ধারণ ও বিক্রির হিসাব যাচাই করতে হবে। শুধু শেষ পর্যায়ের বিক্রেতাদের দায়ী করে বাজারে শৃঙ্খলা ফেরানো সম্ভব নয়।
বিপিসির মাধ্যমে আমদানির উদ্যোগ প্রয়োজন
দেশের এলপিজি খাতের বড় অংশ বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণে থাকলেও ভোক্তার স্বার্থ রক্ষার দায়িত্ব সরকারের। বাজারে চাহিদা কত, আমদানি কত হচ্ছে এবং কোথায় ঘাটতি তৈরি হচ্ছে—এসব তথ্য নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করতে হবে। পাশাপাশি কোম্পানিভেদে অযৌক্তিক মূল্যপার্থক্য ও সরবরাহসংক্রান্ত অস্পষ্টতা দূর করা জরুরি।
এলপিজির বাজারে সরবরাহের স্থিতিশীলতা বাড়াতে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) মাধ্যমে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ এলপিজি আমদানির উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। এতে বেসরকারি আমদানিকারকদের পাশাপাশি সরকারি পর্যায়েও সরবরাহের একটি বিকল্প উৎস তৈরি হবে। তবে এ উদ্যোগের কার্যকারিতা নির্ভর করবে আমদানির ব্যয়, অবকাঠামো, সংরক্ষণক্ষমতা, বিতরণব্যবস্থা এবং বাজারে প্রতিযোগিতার ওপর। তাই বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা ও স্বচ্ছ হিসাবের ভিত্তিতে এ উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন।
একই সঙ্গে ভোক্তাদের জন্য নির্ধারিত মূল্য, স্থানীয় বাজারে বিক্রয়মূল্য এবং অভিযোগ জানানোর সহজ ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি অর্থ আদায়ের অভিযোগ পাওয়া গেলে দ্রুত তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
সরবরাহ সচল রাখা সরকারের দায়িত্ব
ব্যবসায়ীদের বিক্রি বন্ধ রাখার চিন্তা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করতে পারে। তাই কর্তৃপক্ষকে আলোচনার মাধ্যমে যৌক্তিক দাবিগুলোর নিষ্পত্তি করতে হবে এবং বাজারে সরবরাহ সচল রাখতে হবে। তবে কোনো পক্ষের চাপের মুখে যাচাইহীন ব্যয় ভোক্তার ওপর চাপিয়ে দেওয়া উচিত নয়। একইভাবে সংকটের সুযোগ নিয়ে অতিরিক্ত মুনাফা করার অভিযোগও গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করতে হবে।
এলপিজির বাজারে কার্যকর নজরদারি, নির্ভরযোগ্য তথ্য প্রকাশ, ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করা এবং বিপিসির মাধ্যমে আমদানির বিকল্প গড়ে তোলা—এই পদক্ষেপগুলো সমন্বিতভাবে বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন। মূল্য নির্ধারণের সুফল তখনই সাধারণ মানুষ পাবেন, যখন ঘোষিত দামে প্রয়োজনীয় জ্বালানি কিনতে পারবেন এবং সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা কমবে।