নিজের অভাবের মধ্যেও শিক্ষার্থীদের পাশে ছবেদ আলী, ২০ টাকায় দুপুরের খাবার

Total Views : 22
Zoom In Zoom Out Read Later Print

দুপুরের বিরতিতে ক্যানটিনে শিক্ষার্থীদের ভিড়। কেউ খাচ্ছে খিচুড়ি, কেউ পরোটা-রুটি। খাওয়া শেষে বিল দিতে গিয়ে মুখে তৃপ্তির হাসি। কারণ, মাত্র ২০ টাকায় পেটভরে দুপুরের খাবার খেতে পারছে তারা। বাজারে যে খাবার কিনতে ৪০ থেকে ৫০ টাকা লাগে, সেই খাবারই মিলছে প্রায় অর্ধেক দামে। সপ্তাহের কোনো কোনো দিন একই দামে পাওয়া যায় মাংস-খিচুড়িও।

কুড়িগ্রামের রৌমারী উপজেলার চর শৌলমারী বহুমুখী উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য প্রায় এক বছর ধরে এমন ব্যবস্থা করে আসছেন মো. ছবেদ আলী (৫৫)। বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে ‘খাদ্য ছায়া স্কুল ক্যানটিন’ পরিচালনা করেন তিনি। প্রতিদিন গড়ে ১০০ থেকে ১২০ জন শিক্ষার্থী এ ক্যানটিনে খাবার খায়।

ছবেদ আলীর নিজের জীবনও সংগ্রামের। ব্রহ্মপুত্র নদের ভাঙনে বসতভিটা হারিয়ে এখন শৌলমারী বাজারের পাশে অন্যের জায়গায় আশ্রয় নিয়েছেন তিনি। নির্দিষ্ট আয়ের উৎস না থাকলেও বিদ্যালয়ে ক্যানটিন পরিচালনার সুযোগ পাওয়ার পর সেটিই তাঁর কর্মসংস্থানের প্রধান অবলম্বন হয়ে উঠেছে।

কয়েক বছর আগে দুর্ঘটনায় মেরুদণ্ডে আঘাত পান ছবেদ আলী। এখনো ভারী কাজ করতে পারেন না। নিজের আর্থিক অনটন ও শারীরিক সীমাবদ্ধতার মধ্যেও শিক্ষার্থীদের সামর্থ্যের কথা বিবেচনা করে খাবারের দাম কম রেখেছেন তিনি।

ক্যানটিনে খিচুড়ি, পরোটা, ডাল ও রুটিসহ বেশির ভাগ খাবারের দাম ২০ টাকা। ছয়জন কর্মচারীর বেতন, রান্নার উপকরণ ও অন্যান্য খরচ মেটানোর পর এই দামে খাবার বিক্রি করে খুব বেশি লাভ থাকে না। তবু শিক্ষার্থীদের কথা ভেবে দাম বাড়াননি ছবেদ আলী।

তিনি বলেন, আগে বিভিন্ন বাড়ির অনুষ্ঠানে রান্নার কাজ করতেন। পরে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাঁকে ক্যানটিন পরিচালনার সুযোগ দেয়। পরিবারে তিনি ও তাঁর স্ত্রী—দুজন সদস্য। তাই সীমিত আয়ের মধ্যেও শিক্ষার্থীদের কম দামে খাবার দিতে পারছেন। তাঁর ভাষায়, এলাকার অনেক শিক্ষার্থী দরিদ্র পরিবার থেকে আসে। কেউ টাকা দিতে না পারলে তিনি খাবারের জন্য চাপ দেন না।

২০২৫ সালে স্থানীয় বাসিন্দা ও বিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্যদের সঙ্গে আলোচনা করে ক্যানটিনটি চালু করা হয়। ক্যানটিনটির স্বত্বাধিকারী বিদ্যালয় হলেও এটি পরিচালনা করেন ছবেদ আলী।

ক্যানটিনে শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি বিদ্যালয়ের সময়ের বাইরে অন্য ক্রেতারাও খাবার কিনতে আসেন। ছবেদ আলী জানান, বিদ্যালয় চলাকালে ক্যানটিনে শিক্ষার্থীদেরই অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। ক্লাস শেষ হলে বাইরের ক্রেতাদের জন্যও খাবার বিক্রি করা হয়। তাঁদের কাছ থেকে পাওয়া আয় সংসার চালাতে সহায়তা করে।

দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী ফরহাদ হোসেন বলে, বাজারের খাবারের তুলনায় অনেক কম দামে এখানে খাওয়া যায়। এতে শিক্ষার্থীদের সুবিধা হচ্ছে।

নবম শ্রেণির ছাত্রী রেশমা আক্তারের বাড়ি বিদ্যালয় থেকে পাঁচ কিলোমিটার দূরে। টিফিনের সময় বাড়িতে গিয়ে খেয়ে আবার বিদ্যালয়ে ফেরা তাঁর জন্য কঠিন। যাতায়াতে ভ্যানভাড়া লাগে ২০ টাকা, আবার সব সময় ভ্যানও পাওয়া যায় না। রেশমা জানায়, সেই একই টাকায় ছবেদ আলীর ক্যানটিনে দুপুরের খাবার খেয়ে নেওয়া যায়।

বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. খলিলুর রহমান বলেন, ক্যানটিনটি চালু হওয়ায় শিক্ষার্থীরা অল্প দামে খাবার খেতে পারছে। বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ নিয়মিত ক্যানটিনটি তদারক করে। আশপাশের অন্য হোটেলের তুলনায় এখানকার খাবারের মানও ভালো।

নিজের জীবনের প্রতিকূলতার মধ্যেও শিক্ষার্থীদের সাধ্যের মধ্যে খাবার পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করছেন ছবেদ আলী। তাঁর এই উদ্যোগ শুধু শিক্ষার্থীদের দুপুরের খাবারের চাহিদাই পূরণ করছে না, বরং বিদ্যালয়কেন্দ্রিক একটি মানবিক উদ্যোগের উদাহরণও হয়ে উঠেছে।

See More

Latest Photos