মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি, উচ্চ সুদহার, মূল্যস্ফীতি ও ক্রমবর্ধমান সরকারি ঋণের চাপ—এমন একাধিক চ্যালেঞ্জের মধ্যে থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে শুরু হচ্ছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও বিশ্বব্যাংকের ২০২৬ সালের বার্ষিক সভা। আগামী ১২ থেকে ১৮ অক্টোবর অনুষ্ঠিতব্য এ সভায় বৈশ্বিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা, উন্নয়নশীল দেশগুলোর ঋণসংকট এবং ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক ঝুঁকি বিশেষ গুরুত্ব পাবে।
বৈশ্বিক অর্থনীতিতে নতুন শঙ্কা, থাইল্যান্ডে বসছে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক সভা
ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধ এবং এর প্রভাবে জ্বালানি সরবরাহ ও দামের ওপর সৃষ্ট চাপ বিশ্ব অর্থনীতির জন্য নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে খাদ্য ও সারের মূল্যবৃদ্ধি, ঋণের ব্যয় বৃদ্ধি এবং জলবায়ুগত ঝুঁকি। এসব পরিস্থিতি বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধিকে আরও মন্থর করে দিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন অর্থনীতিসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক সভায় বিভিন্ন দেশের অর্থমন্ত্রী, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর, নীতিনির্ধারক, ব্যবসায়ী প্রতিনিধি ও উন্নয়নসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা অংশ নেবেন। ২০২৩ সালে মরক্কোতে সভা হওয়ার পর এবার ওয়াশিংটনের বাইরে অনুষ্ঠিত হচ্ছে এ সম্মেলন।
জ্বালানির বাজারে অস্থিরতা
বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট অজয় বাঙ্গা বলেছেন, জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন, ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধি, সারের বাড়তি দাম এবং সম্ভাব্য শক্তিশালী এল নিনোর প্রভাব একসঙ্গে বৈশ্বিক অর্থনীতির ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। তাঁর মতে, শুধু একটি সংকট নয়, বরং একাধিক ঝুঁকির সম্মিলিত প্রভাব মোকাবিলাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা জ্বালানি বাজারে অনিশ্চয়তা বাড়িয়েছে। বিশ্বের উল্লেখযোগ্য অংশের তেল সরবরাহ এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথের ওপর নির্ভরশীল। ফলে সেখানে দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থা তৈরি হলে জ্বালানির দাম, পরিবহন ব্যয় ও উৎপাদন খরচ আরও বাড়তে পারে।
জ্বালানির বাজার স্থিতিশীল রাখতে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্যোগে জরুরি মজুত থেকে তেল ছাড়ার বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। একই সঙ্গে রাশিয়ার তেল সরবরাহ বাড়াতে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার পদক্ষেপ নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। এ ধরনের সিদ্ধান্তের প্রভাব জ্বালানির বাজারের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও ইউক্রেন যুদ্ধের পরিস্থিতিতেও পড়তে পারে।
বাঙ্গা জানিয়েছেন, বর্তমান পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করলেও বিশ্বব্যাংক এখনই তার বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পূর্বাভাসে পরিবর্তন আনছে না। তবে জ্বালানি, সার, ঋণ ও জলবায়ুর ঝুঁকি একসঙ্গে বাড়লে আগামী মাসগুলোতে অর্থনীতির ওপর চাপ আরও তীব্র হতে পারে।
সরকারি ঋণ নিয়ে উদ্বেগ
বার্ষিক সভার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয় সরকারি ঋণের ক্রমবর্ধমান বোঝা। আইএমএফের মূল্যায়ন অনুযায়ী, বৈশ্বিক সরকারি ঋণ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে ২০৩০ সালের আগেই বৈশ্বিক সরকারি ঋণ মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ১০০ শতাংশ ছাড়িয়ে যেতে পারে।
উচ্চ ঋণের কারণে সরকারগুলোকে ঋণের সুদ পরিশোধে বেশি অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। এতে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অবকাঠামো ও সামাজিক সুরক্ষার মতো খাতে ব্যয়ের সুযোগ সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিশেষ করে উন্নয়নশীল ও স্বল্প আয়ের দেশগুলো বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রসহ উন্নত অর্থনীতিতে সুদহার বেশি থাকলে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে পুঁজি উন্নয়নশীল দেশগুলো থেকে অন্যত্র সরে যেতে পারে। একই সঙ্গে নতুন ঋণ নেওয়া ও পুরোনো ঋণ পুনঃঅর্থায়নের ব্যয়ও বেড়ে যায়।
আইএমএফের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা অর্থনৈতিক ঝুঁকি মোকাবিলায় নীতিনির্ধারকদের সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। খাদ্য ও জ্বালানির দাম দীর্ঘ সময় বেশি থাকলে মূল্যস্ফীতির প্রত্যাশা বাড়তে পারে, দারিদ্র্য আরও গভীর হতে পারে এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা হুমকির মুখে পড়তে পারে।
উন্নয়নশীল দেশের ঋণ ও সংস্কার
উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য ঋণ পরিশোধের ব্যয় বৃদ্ধি বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। অনেক দেশকে তুলনামূলক বেশি সুদে নতুন ঋণ নিতে হচ্ছে। ফলে সরকারি রাজস্বের বড় অংশ সুদ পরিশোধে ব্যয় হচ্ছে, যা উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়নে বাধা তৈরি করছে।
কোভিড-১৯ মহামারির শুরুর দিকে জি-২০ দেশগুলো দরিদ্র দেশগুলোর ঋণ পরিশোধ সাময়িকভাবে স্থগিত করার উদ্যোগ নিয়েছিল। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে একই ধরনের উদ্যোগের সম্ভাবনা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। উচ্চ ঋণ, অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপ এবং ঋণদাতাদের স্বার্থ এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
এদিকে, আইএমএফের ঋণ কর্মসূচির শর্ত ও সংস্কারনীতি নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। কিছু স্বল্প আয়ের দেশের আশঙ্কা, কঠোর সংস্কার ও ব্যয় সংকোচনের শর্ত সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করতে পারে। ঋণ পরিশোধের ব্যয় সামলাতে সরকারি ব্যয় কমানো বা কর বাড়ানোর উদ্যোগ সামাজিক অসন্তোষও বাড়াতে পারে।
অর্থনীতিসংশ্লিষ্টদের মতে, ঋণসংকট মোকাবিলায় শুধু নতুন ঋণ দেওয়া যথেষ্ট নয়। ঋণের টেকসই ব্যবস্থাপনা, কার্যকর সংস্কার, উন্নয়ন অর্থায়ন এবং দরিদ্র জনগোষ্ঠীর সুরক্ষার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখাও জরুরি।
নিরাপত্তা ও বৈশ্বিক সহযোগিতা
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত আন্তর্জাতিক অর্থব্যবস্থার সঙ্গে নিরাপত্তা পরিস্থিতির গভীর সম্পর্কও সামনে এনেছে। জ্বালানি সরবরাহের পথ, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, পরিবহন ও বিনিয়োগের ওপর সংঘাতের প্রভাব পড়ছে। ব্যাংককে অনুষ্ঠিতব্য সভায় এসব আন্তঃসম্পর্কিত ঝুঁকি মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতার বিষয়টিও গুরুত্ব পেতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান সংকটের প্রভাব সব দেশে সমান নয়। জ্বালানি আমদানিনির্ভর এবং ঋণচাপে থাকা দেশগুলো তুলনামূলক বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাই বৈশ্বিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় নীতিগত সমন্বয়, ঋণ ব্যবস্থাপনায় সহযোগিতা এবং জ্বালানি ও খাদ্য সরবরাহের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি।
ব্যাংককের সভায় গৃহীত নীতি ও সিদ্ধান্তগুলো বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি, উন্নয়নশীল দেশগুলোর অর্থায়ন এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক সহযোগিতার ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।