জমির স্বত্ব ও মালিকানা নিয়ে দেওয়ানি আদালতে মামলা বিচারাধীন থাকলে বিরোধপূর্ণ সেই জমি অর্পিত সম্পত্তির তালিকা থেকে অবমুক্ত করা যাবে না বলে রায় দিয়েছেন হাইকোর্ট। দেওয়ানি আদালতে মালিকানার বিরোধ নিষ্পত্তি করে যে পক্ষের পক্ষে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসবে, সেই পক্ষের অনুকূলে সম্পত্তি অবমুক্ত করার নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।
মালিকানা বিরোধ নিষ্পত্তির আগে অর্পিত সম্পত্তি অবমুক্ত করা যাবে না: হাইকোর্ট
‘সাহাবুদ্দিন আহমেদ বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য’ মামলায় জমির মালিকানা নিয়ে করা দুটি রিট আবেদন নিষ্পত্তি করে এ রায় দেন হাইকোর্ট। বিচারপতি ফাতেমা নজীব ও বিচারপতি এ এফ এম সাইফুল করিমের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ গত ১৯ মে এ রায় দেন। সম্প্রতি রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়েছে।
রায়ে আদালত বলেন, বিরোধপূর্ণ সম্পত্তির মালিকানা নির্ধারণের বিষয়টি সংক্ষিপ্ত রিট কার্যধারায় নিষ্পত্তি করা সম্ভব নয়। এ জন্য উপযুক্ত দেওয়ানি আদালতে স্বত্বের প্রশ্নের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি প্রয়োজন। তত দিন পর্যন্ত কোনো পক্ষের অনুকূলে সম্পত্তিটি অর্পিত সম্পত্তির তালিকা থেকে অবমুক্ত করা উচিত হবে না।
ফরিদপুরের জমি নিয়ে বিরোধ
মামলার বিবরণ অনুযায়ী, ফরিদপুরের ৭ দশমিক ২৩ শতাংশ জমির মালিকানা নিয়ে বিরোধের সূত্রপাত। জমিটির মূল মালিক ছিলেন যমুনা চামার ও গয়ানাত চামার। পরবর্তী সময়ে হস্তান্তরের ধারাবাহিকতায় জমিটি অনিল কুমার দত্তের কাছে যায় এবং তাঁর কাছ থেকে দানসূত্রে ছেলে অলোক কুমার দত্ত মালিকানা লাভ করেন।
অলোক কুমার দত্ত ১৯৯৬ সালের ৮ জুলাই নিবন্ধিত বিক্রয় দলিলের মাধ্যমে জমিটি সাহাবুদ্দিন আহমেদের কাছে বিক্রি করেন বলে মামলার নথিতে উল্লেখ রয়েছে।
অন্যদিকে, মো. জাহিদুর রহমান দাবি করেন, একই বছরের ২৩ মে অলোক কুমার দত্তের সঙ্গে জমিটি বিক্রির বিষয়ে তাঁর একটি বায়নাপত্র সম্পাদিত হয়েছিল। ওই চুক্তি বাস্তবায়নের দাবিতে তিনি ২০০১ সালে দেওয়ানি মামলা করেন। মামলায় একতরফা ডিক্রি পাওয়ার পর ২০০৩ সালে আদালতের মাধ্যমে নিবন্ধিত দলিল সম্পাদন করান।
পরবর্তী সময়ে সাহাবুদ্দিন আহমেদ ওই ডিক্রি ও সংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল করেন। আপিল গ্রহণের বিষয়ে নিম্ন আদালতের আদেশকে চ্যালেঞ্জ করে জাহিদুর রহমান হাইকোর্টে সিভিল রিভিশন দায়ের করেন। এ নিয়ে একাধিক পর্যায়ে আইনি কার্যক্রম চলে। সর্বশেষ সংশ্লিষ্ট সিভিল রিভিশন হাইকোর্ট বিভাগে বিচারাধীন রয়েছে।
মালিকানা নির্ধারণ না হওয়া পর্যন্ত স্থিতাবস্থা
শুনানিতে সাহাবুদ্দিন আহমেদের আইনজীবী যুক্তি দেন, ১৯৯৬ সালের নিবন্ধিত দলিলের মাধ্যমে তাঁর মক্কেল জমির মালিকানা অর্জন করেন। অন্যদিকে, জাহিদুর রহমানের পক্ষের আইনজীবী দাবি করেন, তাঁর মক্কেলের বায়নাপত্রটি সাহাবুদ্দিন আহমেদের বিক্রয় দলিলের আগের তারিখে সম্পাদিত হয়েছিল এবং আদালতের ডিক্রির ভিত্তিতে তিনি স্বত্ব অর্জন করেছেন।
হাইকোর্ট পর্যবেক্ষণে বলেন, জমির মালিকানা নিয়ে দুই পক্ষের বিরোধ এখনো চূড়ান্তভাবে নিষ্পত্তি হয়নি। সাহাবুদ্দিন আহমেদের বিক্রয় দলিলের বৈধতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। এসব বিষয় নির্ধারণের জন্য উপযুক্ত দেওয়ানি আদালতের সিদ্ধান্ত প্রয়োজন।
রায়ে ফরিদপুরের জেলা প্রশাসককে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, উচ্চ আদালতে বিচারাধীন আইনি লড়াইয়ে যে পক্ষের অনুকূলে জমির মালিকানা চূড়ান্তভাবে নির্ধারিত হবে, সেই পক্ষের অনুকূলে সম্পত্তিটি অর্পিত সম্পত্তির তালিকা থেকে অবমুক্ত করতে হবে।
মালিকানা বিরোধের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে জমির দখলের বিষয়ে স্থিতাবস্থা বজায় রাখার নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।
এ রায়ের মধ্য দিয়ে আদালত স্পষ্ট করেছেন, মালিকানা নিয়ে বিরোধ বিচারাধীন থাকা অবস্থায় কেবল কোনো পক্ষের দাবির ভিত্তিতে বিরোধপূর্ণ সম্পত্তি অর্পিত সম্পত্তির তালিকা থেকে অবমুক্ত করা যাবে না।