এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় এক বা দুটি বিষয়ে অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের পুরো এক বছর অপেক্ষা না করিয়ে তিন মাসের মধ্যে পুনরায় পরীক্ষার সুযোগ দেওয়ার বিষয়টি ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করছে সরকার। এ বিষয়ে করণীয় নির্ধারণে বৈঠক ডেকেছে শিক্ষা বোর্ডগুলো। তবে নতুন ব্যবস্থা কবে থেকে চালু হবে, সে বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
এসএসসিতে ফেল করা শিক্ষার্থীদের জন্য নতুন উদ্যোগের ভাবনা, সভা ডেকেছে শিক্ষা বোর্ড
শনিবার (১০ অক্টোবর) রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের নিয়ে আয়োজিত এক সম্মেলনে শিক্ষার্থীরা দ্রুত পুনরায় পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ দাবি করে। গণসাক্ষরতা অভিযান আয়োজিত এ সম্মেলনে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা শিক্ষার্থীরা নিজেদের অভিজ্ঞতা ও সমস্যার কথা তুলে ধরে।
বরিশাল থেকে আসা শিক্ষার্থী সিনথিয়া আক্তার মনি জানায়, পরীক্ষা চলাকালে টাইফয়েডে আক্রান্ত হয়ে তাকে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছিল। অসুস্থতার কারণে গণিত বিষয়ে ভালো প্রস্তুতি নিতে পারেনি সে। ফলে গণিতে অকৃতকার্য হলেও বাকি সব বিষয়ে জিপিএ-৫ পেয়েছে। নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়ে সে।
পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে আসা আরেক শিক্ষার্থী জানায়, পদার্থবিজ্ঞান ছাড়া অন্য সব বিষয়ে ভালো ফল করেছে সে। বেশির ভাগ বিষয়ে এ প্লাস, এ বা এ মাইনাস পেলেও একটি বিষয়ে অকৃতকার্য হওয়ায় বন্ধুদের তুলনায় এক বছর পিছিয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। তিন মাসের মধ্যে ওই বিষয়ে আবার পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ চায় সে।
৬ লাখ ৯০ হাজার শিক্ষার্থী অকৃতকার্য
সর্বশেষ এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় প্রায় ৬ লাখ ৯০ হাজার শিক্ষার্থী এক বা একাধিক বিষয়ে অকৃতকার্য হয়েছে। প্রচলিত নিয়মে এসব শিক্ষার্থীকে পরবর্তী বছর আবার পরীক্ষায় অংশ নিতে হয়। চাইলে তারা শুধু অকৃতকার্য বিষয়গুলোতে অথবা সব বিষয়ে পরীক্ষা দিতে পারে।
তবে একটি বা দুটি বিষয়ে অকৃতকার্য হওয়ার কারণে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হওয়ায় শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবনে ছেদ পড়তে পারে। পাশাপাশি তাদের ওপর মানসিক চাপও বাড়ে। এ পরিস্থিতি বিবেচনায় ফল প্রকাশের তিন মাসের মধ্যে অকৃতকার্য বিষয়ে পুনরায় পরীক্ষা নেওয়ার দাবি উঠেছে।
গত ১০ আগস্ট এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফল প্রকাশিত হয়। নয়টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে পাসের হার ছিল ৬৪ দশমিক ০৫ শতাংশ, যা ১৯ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। সাধারণ, মাদ্রাসা ও কারিগরি—সব বোর্ড মিলিয়ে গড় পাসের হার ছিল ৬২ দশমিক ২৫ শতাংশ।
ফল পুনর্নিরীক্ষণের পরও উল্লেখযোগ্যসংখ্যক শিক্ষার্থীর ফল পরিবর্তন হয়েছে। ১১টি শিক্ষা বোর্ডে নতুন করে জিপিএ-৫ পেয়েছে ৩ হাজার ৭৯ জন। প্রথমবার ফল প্রকাশের সময় অকৃতকার্য হলেও পুনর্নিরীক্ষণের পর ৪ হাজার ৫৮৫ জন শিক্ষার্থী উত্তীর্ণ হয়েছে। আগের বছর এ সংখ্যা ছিল ২ হাজার ২০৭।
পরিকল্পনা নিয়ে বৈঠক ডেকেছে শিক্ষা বোর্ড
অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের দ্রুত পুনরায় পরীক্ষা নেওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে আগামী সোমবার (১২ অক্টোবর) বৈঠক ডেকেছে আন্তশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটি। কমিটির সভাপতি ও ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক সৈয়দ আক্তারুজ্জামান জানিয়েছেন, স্বল্প সময়ের মধ্যে কীভাবে এ পরীক্ষা আয়োজন করা যায়, তা নিয়ে সভায় পরিকল্পনা করা হবে।
তবে চলতি বছরেই নতুন ব্যবস্থা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়। তাঁর মতে, পরীক্ষা আয়োজনের জন্য সাধারণত অন্তত তিন মাস আগে প্রশ্নপত্র প্রস্তুত করতে হয়। পরিকল্পনা দ্রুত চূড়ান্ত করা গেলে পরবর্তী সময়ে ব্যবস্থা বাস্তবায়ন সহজ হতে পারে। এতে শিক্ষার্থীদের একই শিক্ষাবর্ষে ভর্তি হওয়ার সুযোগ তৈরির পাশাপাশি পাঠ্যসূচির পার্থক্যজনিত জটিলতাও কমানো সম্ভব হতে পারে।
ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান তপন কুমার সরকার মনে করেন, শিক্ষা মন্ত্রণালয় প্রয়োজনীয় নীতিমালা প্রণয়ন করলে এ ধরনের পরীক্ষা আয়োজন করা সম্ভব। তাঁর মতে, পরীক্ষার্থীর সংখ্যা তুলনামূলক কম হওয়ায় সীমিত সময়ের মধ্যে পরীক্ষা নেওয়ার মতো সক্ষমতা শিক্ষা বোর্ডগুলোর রয়েছে।
শিক্ষাবিদ ও ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক মনজুর আহমদও অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের দ্রুত পুনরায় পরীক্ষার সুযোগ দেওয়ার পক্ষে মত দিয়েছেন। তাঁর মতে, একটি বিষয়ে অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের দীর্ঘ সময় অপেক্ষা না করিয়ে দ্রুত পরীক্ষা নেওয়ার ব্যবস্থা করা হলে তারা উপকৃত হবে।
এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি
শিক্ষার্থীদের দ্রুত পুনরায় পরীক্ষার সুযোগ দেওয়ার প্রস্তাবকে ইতিবাচকভাবে দেখা হলেও এটি এখনো কার্যকর নিয়মে পরিণত হয়নি। নতুন ব্যবস্থা চালু করতে হলে সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্তের পাশাপাশি পরীক্ষার সময়সূচি, প্রশ্নপত্র তৈরি, ব্যবস্থাপনা ও ফল প্রকাশের প্রক্রিয়া নির্ধারণ করতে হবে।
শিক্ষা বোর্ডগুলোর আসন্ন বৈঠকে এসব বিষয়ে কী পরিকল্পনা নেওয়া হয়, তার ওপরই পরবর্তী অগ্রগতি নির্ভর করছে। সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে এক বা একাধিক বিষয়ে অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের জন্য শিক্ষাজীবনের দীর্ঘ বিরতি কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।