বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়লেও সেই অনুপাতে বাড়ছে না মানুষের আয়। ফলে মাসের শুরুতে সংসারের ব্যয়ের যে হিসাব করেন নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের সদস্যরা, মাস শেষ হওয়ার আগেই তা এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। চাল, ডাল, তেল, সবজি ও মাছ-মাংস কেনার পেছনে আয়ের বড় অংশ ব্যয় হওয়ায় সন্তানের শিক্ষা, চিকিৎসা, যাতায়াত ও সঞ্চয়ের মতো খাতে কাটছাঁট করতে হচ্ছে অনেক পরিবারকে।
আয়-ব্যয়ের ফারাক বাড়ছেই, সংসার চালাতে হিমশিম নিম্ন ও মধ্যবিত্তের
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ তথ্যেও মূল্যস্ফীতির চাপের চিত্র উঠে এসেছে। ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে দেশে সাধারণ মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৮ দশমিক ৩৪ শতাংশ হয়েছে, যা আগস্টে ছিল ৮ দশমিক ২৬ শতাংশ। একই সময়ে মজুরি বৃদ্ধির হার কমে দাঁড়িয়েছে ৭ দশমিক ৯০ শতাংশে। অর্থাৎ মূল্যস্ফীতির তুলনায় মজুরি বৃদ্ধির হার ০ দশমিক ৪৪ শতাংশীয় পয়েন্ট কম।
ঢাকার একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত জুবায়ের আহমেদ জানান, কয়েক মাস আগেও মাসের বাজার করতে তাঁর ৮ থেকে ১০ হাজার টাকা খরচ হতো। এখন একই ধরনের কেনাকাটায় ব্যয় হচ্ছে ১৩ থেকে ১৪ হাজার টাকা। অথচ গত দুই বছরে তাঁর বেতন বাড়েনি। এর সঙ্গে যাতায়াত ব্যয় যুক্ত হওয়ায় সংসারের প্রয়োজন মেটাতে প্রতি মাসেই হিমশিম খেতে হচ্ছে।
শহরের বাইরেও একই ধরনের চাপ অনুভব করছেন সাধারণ মানুষ। গ্রামের অনেক পরিবারের আয় সীমিত থাকলেও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য, যাতায়াত ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় খরচ মেটাতে ব্যয় বাড়ছে। বিশেষ করে দিনমজুর, নিম্ন আয়ের শ্রমজীবী মানুষ ও সীমিত আয়ের কৃষক পরিবারের জন্য সংসারের হিসাব মেলানো কঠিন হয়ে পড়ছে।
মূল্যস্ফীতির চাপ আবার ঊর্ধ্বমুখী
বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুলাইয়ে সাধারণ মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৩২ শতাংশ। আগস্টে তা কমে ৮ দশমিক ২৬ শতাংশে নেমেছিল। তবে সেপ্টেম্বরে আবার বেড়ে ৮ দশমিক ৩৪ শতাংশে দাঁড়ায়।
খাদ্যপণ্যের মূল্যস্ফীতিও সেপ্টেম্বরে বেড়েছে। আগস্টে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ছিল ৭ দশমিক ০২ শতাংশ, সেপ্টেম্বরে তা বেড়ে ৭ দশমিক ২২ শতাংশ হয়েছে। অন্যদিকে খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি আগস্টের ৯ দশমিক ৩২ শতাংশ থেকে সামান্য কমে সেপ্টেম্বরে ৯ দশমিক ৩০ শতাংশ হয়েছে। <Cite refs={["turn414913search0","turn414913search7"]}/>
মূল্যস্ফীতির হার কমা মানেই বাজারে পণ্যের দাম কমে যাওয়া নয়। বরং দাম বাড়ার গতি কমলেও আগের বাড়তি দাম বহাল থাকতে পারে। যেমন, কোনো পণ্যের দাম ৬০ টাকা থেকে বেড়ে ৬৬ টাকা হলে বৃদ্ধি ১০ শতাংশ। পরের বছর দাম ৬৬ টাকা থেকে ৬৯ টাকা হলে বৃদ্ধির হার কম হলেও ক্রেতাকে আগের চেয়ে বেশি অর্থ ব্যয় করতে হয়।
মজুরি বাড়লেও ক্রয়ক্ষমতা কমছে
বিবিএসের মজুরি হার সূচক অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরে জাতীয় পর্যায়ে মজুরি বৃদ্ধির হার ৭ দশমিক ৯০ শতাংশে নেমে এসেছে। আগস্টে এ হার ছিল ৮ দশমিক ০৫ শতাংশ এবং জুলাইয়ে ৮ দশমিক ২২ শতাংশ। কৃষি, শিল্প ও সেবা—তিনটি প্রধান খাতেই আগস্টের তুলনায় সেপ্টেম্বরে মজুরি বৃদ্ধির হার কমেছে। <Cite refs={["turn414913search1","turn414913search3"]}/>
মজুরি বৃদ্ধির হার মূল্যস্ফীতির নিচে থাকলে একই পরিমাণ পণ্য ও সেবা কিনতে মানুষের আয়ের তুলনায় বেশি অর্থ প্রয়োজন হয়। ফলে নামমাত্র আয় কিছুটা বাড়লেও প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমে যেতে পারে। সীমিত আয়ের পরিবারগুলোর ক্ষেত্রে এই ব্যবধান সংসারের বাজেটে সরাসরি প্রভাব ফেলে।
জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয়ও এ পরিস্থিতিতে গুরুত্বপূর্ণ। জ্বালানির দাম বাড়লে কৃষিপণ্য পরিবহন, উৎপাদন ও সরবরাহের খরচ বাড়তে পারে। আমদানি করা পণ্যের ক্ষেত্রে বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময়হার, বন্দর ও পরিবহন ব্যয়ের প্রভাবও দামে পড়তে পারে।
সঞ্চয় ভাঙছে পরিবার, বাড়ছে আর্থিক অনিশ্চয়তা
জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ায় অনেক পরিবারকে প্রথমে সঞ্চয় থেকে অর্থ খরচ করতে হচ্ছে। সঞ্চয় শেষ হয়ে গেলে কেউ কেউ ধারদেনার ওপর নির্ভর করছেন। এতে জরুরি চিকিৎসা, সন্তানের উচ্চশিক্ষা কিংবা ভবিষ্যতের আর্থিক নিরাপত্তার জন্য অর্থ জমিয়ে রাখা কঠিন হয়ে উঠছে।
মধ্যবিত্ত পরিবারের সংকটের একটি দিক হলো, আয় সীমিত হলেও তাদের নিয়মিত বাড়িভাড়া, শিক্ষা, চিকিৎসা ও যাতায়াতের ব্যয় বহন করতে হয়। অন্যদিকে নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোর বাজেটে খাদ্যপণ্যের অংশ তুলনামূলক বেশি হওয়ায় খাদ্যের দাম বাড়লে তাদের ওপর চাপ আরও বাড়ে।
অর্থনীতিবিদদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, দীর্ঘ সময় ধরে মূল্যস্ফীতি মজুরি বৃদ্ধির হারকে ছাড়িয়ে গেলে মানুষের প্রকৃত আয় ও ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। এর প্রভাব শুধু দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় নয়, সঞ্চয়, পুষ্টি, শিক্ষা ও চিকিৎসার ব্যয়েও পড়তে পারে।
আয় ও ব্যয়ের এই ব্যবধান কমাতে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজার স্থিতিশীল রাখা, সরবরাহব্যবস্থার ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং সীমিত আয়ের মানুষের ক্রয়ক্ষমতা রক্ষার উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ।