জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) বহুল প্রতীক্ষিত দ্বিতীয় সমাবর্তন ঘিরে শিক্ষার্থীদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। প্রথম সমাবর্তনের তুলনায় এবার সব ধরনের ডিগ্রিধারীর নিবন্ধন ফি ২ হাজার টাকা করে বাড়ানো হয়েছে। মূল সনদের জন্য অতিরিক্ত অর্থ পরিশোধ করতে হওয়ায় সমাবর্তনে অংশগ্রহণ অনেকের জন্য আর্থিক চাপের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফি কমানোর দাবিতে সাধারণ শিক্ষার্থী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদ (জকসু) ও ক্যাম্পাসের বিভিন্ন ছাত্রসংগঠনের নেতারা সোচ্চার হয়েছেন।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন ফি বৃদ্ধি: শিক্ষার্থীদের তীব্র অসন্তোষ ও আন্দোলনের ডাক
আগামী ৩০ জানুয়ারি ২০২৭ বিশ্ববিদ্যালয়টির দ্বিতীয় সমাবর্তন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, এবারের আয়োজনে প্রায় ২১ হাজার ডিগ্রিধারী শিক্ষার্থী অংশ নেওয়ার সুযোগ পাবেন।
নতুন ফি কাঠামো অনুযায়ী নিবন্ধন ফি নিম্নরূপ:
• স্নাতক ও বিবিএ: ৫ হাজার টাকা (প্রথম সমাবর্তনে ছিল ৩ হাজার টাকা)
• স্নাতকোত্তর: ৬ হাজার টাকা (আগে ছিল ৪ হাজার টাকা)
• এমফিল ও পিএইচডি: ৬ হাজার ৫০০ টাকা (আগে ছিল ৪ হাজার ৫০০ টাকা)
• প্রফেশনাল ও সান্ধ্যকালীন স্নাতকোত্তর: ৮ হাজার টাকা (আগে ছিল ৬ হাজার টাকা)
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, নিবন্ধন ফি এবং মূল সনদের ফি একসঙ্গে পরিশোধ করা অনেকের জন্য কঠিন। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের পরিবারের শিক্ষার্থীরা এই বাড়তি খরচের কারণে সংকটে পড়েছেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০১৬-১৭ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী হারুনুর রশিদ জানান,
"৫ হাজার টাকা নিবন্ধন ফির পাশাপাশি মূল সনদের জন্য আরও ৫০০ টাকা দিতে হচ্ছে। একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্বামী-স্ত্রী দুজন গ্র্যাজুয়েট হলে তাঁদের শুধু নিবন্ধন ও সনদের পেছনেই ১১ হাজার টাকা খরচ হবে। আর্থিক সামর্থ্যের বিষয়টি বিবেচনা করে ফি পুনর্নির্ধারণ করা প্রয়োজন।"
অতিরিক্ত ফি ছাড়াও প্রফেশনাল ও সান্ধ্যকালীন কোর্সের ডিগ্রিধারীদের সমাবর্তনে অংশ নেওয়ার সুযোগ দেওয়ার বিষয়েও কিছু শিক্ষার্থী আপত্তি তুলেছেন। তাঁদের দাবি, এতে সমাবর্তনের মর্যাদা ও গুরুত্ব ক্ষুণ্ন হতে পারে।
শিক্ষার্থীদের অসন্তোষের বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক রইছ উদ্দীন বলেন,
"বর্তমান সময়ে বিভিন্ন খাতে ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা করে সমাবর্তনের নিবন্ধন ফি নির্ধারণ করা হয়েছে। বড় পরিসরে আয়োজন সম্পন্ন করতে উল্লেখযোগ্য অর্থ প্রয়োজন।"
উপাচার্য আরও জানান,
"শিক্ষার্থীদের আর্থিক পরিস্থিতি বিবেচনায় ফি কমানোর বিষয়টি ইতিবাচকভাবে দেখা হচ্ছে। বিশেষ করে সদ্য স্নাতক সম্পন্ন করা বেকার শিক্ষার্থীদের জন্য নির্ধারিত অর্থ পরিশোধ কঠিন হতে পারে। সংশ্লিষ্ট সবার সঙ্গে আলোচনা করে ফি যৌক্তিকভাবে পুনর্বিবেচনা করা হবে।"
সমাবর্তনের নিবন্ধন ফি কমানোর দাবিতে জকসু উপাচার্যের কাছে স্মারকলিপি দিয়েছে। জকসুর সাধারণ সম্পাদক আব্দুল আলিম আরিফ জানান, গত ১৪ তারিখে তাঁরা আনুষ্ঠানিক আবেদন করেছেন এবং বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তুলে ধরেছেন।
ফি কমানোর দাবিতে বিভিন্ন ছাত্রসংগঠনের প্রতিক্রিয়া ও দাবিগুলো নিম্নরূপ:
• ছাত্রদল: সমাবর্তন যেন বাণিজ্যিক আয়োজনের পরিবর্তে শিক্ষার্থীদের অর্জন উদযাপনের সুযোগ হয়, সেই আহ্বান জানিয়েছেন শাখা আহ্বায়ক মেহেদী হাসান হিমেল ও সদস্যসচিব শামসুল আরেফীন।
• ছাত্রশিবির: শাখা সাধারণ সম্পাদক ইব্রাহীম খলীল ফি যৌক্তিক পর্যায়ে না নামালে আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন।
• ইসলামী ছাত্র আন্দোলন: শাখা সভাপতি আশিকুর রহমান ফি সর্বোচ্চ ২ থেকে ৩ হাজার টাকার মধ্যে রাখার দাবি জানিয়েছেন।
• ছাত্র ফ্রন্ট: শাখা সাধারণ সম্পাদক শামসুল আলম মারুফ সমাবর্তনের যাবতীয় ব্যয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে বহনের আহ্বান জানিয়েছেন।
• ছাত্রশক্তি: গত ১৮ অক্টোবর সংগঠনের নেতারা উপাচার্যের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন এবং ফি পুনর্বিবেচনার আশ্বাস পেয়েছেন বলে জানিয়েছেন সাধারণ সম্পাদক ফেরদৌস শেখ।
• বাংলাদেশ খেলাফত ছাত্র মজলিস: সদস্যসচিব ওবায়দুল ইসলাম ফি সর্বোচ্চ ৩ হাজার টাকা অথবা নামমাত্র রাখার দাবি জানিয়েছেন।
দ্বিতীয় সমাবর্তনে অংশগ্রহণের যোগ্যতার বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জানায়:
• ২০১৪-১৫ থেকে ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষ পর্যন্ত স্নাতক, বিবিএ বা সমমানের ডিগ্রিধারীরা অংশগ্রহণ করতে পারবেন।
• ২০১৬-১৭ থেকে ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষ পর্যন্ত স্নাতকোত্তর, এমবিএ বা সমমানের ডিগ্রিধারীরা অংশ নিতে পারবেন।
• এমফিল, পিএইচডি এবং প্রফেশনাল ও সান্ধ্যকালীন প্রোগ্রামের অন্তত একটি ডিগ্রি অর্জনকারী শিক্ষার্থী বা গবেষক অংশগ্রহণ করতে পারবেন।
প্রতিষ্ঠার ২২ বছরে দ্বিতীয়বারের মতো সমাবর্তন আয়োজন করতে যাচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়টি। দীর্ঘদিন পর আনুষ্ঠানিকভাবে ডিগ্রি অর্জনের আনন্দ উদযাপনের সুযোগ তৈরি হলেও বাড়তি নিবন্ধন ফি নিয়ে শিক্ষার্থীদের আপত্তি এখনো কাটেনি। শিক্ষার্থী ও বিভিন্ন সংগঠনের দাবি বিবেচনায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ফি কমানোর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয় কি না, সেটিই এখন দেখার বিষয়।