ট্রাম্পের সমর্থন ও যুদ্ধের নেতৃত্বে ভর করে ক্ষমতায় টিকে থাকতে চান নেতানিয়াহু

Total Views : 30
Zoom In Zoom Out Read Later Print

ইসরায়েলের রাজনীতিতে আবারও বড় পরীক্ষা দিতে যাচ্ছেন দীর্ঘদিনের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) দেশটির পার্লামেন্ট নেসেটের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এবারের ভোটে নির্ধারিত হতে পারে নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ। যুদ্ধকালীন নেতৃত্ব এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সমর্থনকে কাজে লাগিয়ে ক্ষমতায় টিকে থাকতে চাইছেন তিনি। তবে বিরোধী শিবিরের চ্যালেঞ্জ ও জোট গঠনের জটিল হিসাব তাঁর জন্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর গাজায় ব্যাপক সামরিক অভিযান শুরু করে ইসরায়েল। পরবর্তী সময়ে ইরানকে ঘিরে সংঘাতেও জড়িয়ে পড়ে দেশটি। এসব সামরিক পদক্ষেপ নেতানিয়াহুর সমর্থকদের কাছে নিরাপত্তা ও শক্তিশালী নেতৃত্বের প্রতীক হলেও বিরোধীদের সমালোচনার কারণ হয়েছে। গাজায় যুদ্ধ পরিচালনা, ৭ অক্টোবরের হামলা ঠেকাতে ব্যর্থতার দায় এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইসরায়েলের অবস্থান নিয়ে তাঁর সরকারের বিরুদ্ধে প্রশ্ন উঠেছে।

নির্বাচনের আগে প্রকাশিত জনমত জরিপগুলোতে নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টি ও বিরোধী শিবিরের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। তবে ইসরায়েলের সংসদীয় ব্যবস্থায় কোনো দল এককভাবে সবচেয়ে বেশি আসন পেলেই সরকার গঠন নিশ্চিত হয় না। ১২০ সদস্যের নেসেটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে প্রয়োজন অন্তত ৬১টি আসনের সমর্থন। ফলে নির্বাচনের ফলের পাশাপাশি পরবর্তী জোট গঠনের আলোচনা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন শিবিরে রয়েছে ডানপন্থী ও ধর্মীয় জাতীয়তাবাদী দলগুলো। এর মধ্যে ইতামার বেন-গভিরের জিউইশ পাওয়ার পার্টি এবং বেজালেল স্মোত্রিচের রিলিজিয়াস জায়োনিজম পার্টি উল্লেখযোগ্য। বেন-গভির জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী এবং স্মোত্রিচ অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করছেন। তাঁদের সমর্থন নেতানিয়াহুর সরকার গঠনের হিসাব-নিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

অন্যদিকে, বিরোধী শিবিরে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে উঠে এসেছেন সাবেক সামরিক প্রধান গাদি আইজেনকট। তাঁর নেতৃত্বাধীন ইয়াশার পার্টির পাশাপাশি নাফতালি বেনেটের টুগেদার, ইয়ার গোলানের ডেমোক্র্যাটস এবং আভিগদর লিবারম্যানের ইসরায়েল বেইতেনু দলও সরকার পরিবর্তনের প্রচেষ্টায় রয়েছে।

প্রচারে ট্রাম্পের সমর্থন ও যুদ্ধের প্রসঙ্গ

নির্বাচনী প্রচারে নেতানিয়াহু দুটি বিষয়কে গুরুত্ব দিয়েছেন—যুদ্ধকালীন নেতৃত্ব এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সমর্থন। তাঁর বক্তব্যে ইরানের হুমকি মোকাবিলা এবং ইসরায়েলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়টি বিশেষভাবে উঠে এসেছে।

নেতানিয়াহু দাবি করেছেন, ইরানের হুমকি মোকাবিলায় ট্রাম্প আরও পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত। তাঁর নির্বাচনী প্রচারে এই সমর্থনকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে। তবে ট্রাম্পের সমর্থন নির্বাচনের ফল বা সরকার গঠনের নিশ্চয়তা দেয় না।

বিরোধী নেতা গাদি আইজেনকট নেতানিয়াহুর প্রচারণার সমালোচনা করেছেন। তাঁর অভিযোগ, প্রধানমন্ত্রী ভয়, মিথ্যা ও হুমকির ওপর নির্ভর করে ভোটারদের প্রভাবিত করার চেষ্টা করছেন। আইজেনকটের বক্তব্য, ইসরায়েলের জনগণ যাঁকেই নির্বাচিত করুক, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সহযোগিতা বজায় রাখা সম্ভব।

জোট গঠনের কঠিন সমীকরণ

ইসরায়েলের নির্বাচনী ব্যবস্থায় ভোটাররা সরাসরি প্রধানমন্ত্রী নির্বাচন করেন না; তাঁরা রাজনৈতিক দলকে ভোট দেন। ভোটের অনুপাতে নেসেটের আসন বণ্টন করা হয়। সংসদে আসন পেতে একটি দলকে অন্তত ৩ দশমিক ২৫ শতাংশ ভোট পেতে হয়।

এ কারণে কোনো দল সবচেয়ে বেশি আসন পেলেও সরকার গঠনের জন্য অন্য দলগুলোর সমর্থন প্রয়োজন হতে পারে। নির্বাচনের আগে প্রকাশিত বিভিন্ন জরিপে নেতানিয়াহুর শিবির ও বিরোধী পক্ষ—কোনোটিরই এককভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত হওয়ার মতো চিত্র দেখা যায়নি। ফলে ছোট দলগুলোর অবস্থান এবং আরব দলগুলোর সম্ভাব্য ভূমিকা সরকার গঠনের আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

তবে আরব দলগুলোর সঙ্গে জোট গঠনের বিষয়ে বিরোধী শিবিরের অবস্থানও একরকম নয়। আইজেনকট আরব দলগুলোর সঙ্গে আনুষ্ঠানিক জোটের সম্ভাবনা নাকচ করেছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। অন্যদিকে, নেতানিয়াহুকে ক্ষমতা থেকে সরাতে কিছু আরব দল বিরোধী সরকারকে বাইরে থেকে সমর্থন দিতে পারে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।

ভোটারদের মধ্যে বিভক্তি

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার সময় নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকারের ব্যর্থতার দায় নির্ধারণের দাবি নেতানিয়াহুর বিরোধীদের প্রচারে গুরুত্ব পেয়েছে। সমালোচকদের একাংশ একটি স্বাধীন জাতীয় তদন্ত কমিশন গঠনের পক্ষে। তাঁদের মতে, ওই দিনের নিরাপত্তা ব্যর্থতার কারণ চিহ্নিত করা এবং ভবিষ্যতে এমন ঘটনা ঠেকাতে জবাবদিহি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

অন্যদিকে, নেতানিয়াহুর সমর্থকদের একটি অংশ মনে করেন, যুদ্ধ পরিচালনা এবং দেশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে তাঁর অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ। তাঁদের মতে, বর্তমান আঞ্চলিক পরিস্থিতিতে নেতানিয়াহুই ইসরায়েলের জন্য উপযুক্ত নেতা।

দুর্নীতির অভিযোগে চলমান ফৌজদারি মামলাও নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে বিতর্কের অংশ। তিনি এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তবে মামলাটি তাঁর সমালোচকদের কাছে জবাবদিহির প্রশ্নকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে।

এবারের নির্বাচনের ফল যাই হোক, সরকার গঠনের জন্য দলগুলোর মধ্যে সমঝোতা গুরুত্বপূর্ণ হবে। কোনো শিবির ৬১টি আসনের সমর্থন নিশ্চিত করতে না পারলে দীর্ঘ আলোচনা ও রাজনৈতিক অচলাবস্থার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তাই নেতানিয়াহু ক্ষমতায় থাকবেন, নাকি বিরোধী শিবির নতুন সরকার গঠনের সুযোগ পাবে—তা নির্ভর করবে ভোটের ফল এবং পরবর্তী জোট-সমীকরণের ওপর।

See More

Latest Photos