দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে ইরান যুদ্ধের প্রতিক্রিয়া মোকাবিলায়

Total Views : 7
Zoom In Zoom Out Read Later Print

ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের বর্বর হামলা, সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিসহ ৪৮ শীর্ষ কর্মকর্তা ও ৪০ সামরিক কমান্ডার হত্যা, সামরিক-বেসামরিক বহু স্থাপনা ধ্বংস, সর্বোপরি ইরানের সার্বভৌমত্ব লংঘনের নিন্দা জানানোর ভাষা আমাদের নেই। যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের এই বেপরোয়া আগ্রাসন ও হামলার প্রতিশোধ নিতে ইরান প্রতিবেশী কুয়েত, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, ইরাক, জর্ডান এবং সউদী আরবের মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে হামলা চালিয়েছে। বাস্তবতা এমন যে, গোটা মধ্যপ্রাচ্য এখন যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যে নিক্ষিপ্ত হয়েছে। আরো অবনতি হলে তা আঞ্চলিক যুদ্ধ, এমন কি বিশ্বযুদ্ধে রূপ নিতে পারে বলে আশংকা প্রকাশ করছেন অনেক পর্যবেক্ষক ও বিশ্লেষক। আঞ্চলিক যুদ্ধও যদি বাঁধে তবে গোটা বিশ্বে তার যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া হবে, তা এখন কল্পনাও করা যায় না। যুদ্ধে অকল্পনীয় ক্ষতি ও বিপর্যয়ের আশংকার কথা বিবেচনায় নিয়ে বিশ্বের শুভবুদ্ধিসম্পন্ন ও শান্তিপ্রিয় প্রতিটি মানুষ অবিলম্বে হামলা-প্রতিহামলার অবসান কামনা করছে। তারা কোনো উপলক্ষেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের এ আগ্রাসন ও হামলা সমর্থন করছে না। খোদ যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি চার জনের তিন জন এই হামলার বিরোধী। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ইরানে হামলার বিরুদ্ধে স্বতস্ফূর্ত বিক্ষোভ হচ্ছে। বিশ্বে যদি এভাবে ‘জোর যার মূল্লক তার’ নীতির চর্চা চলতে থাকে তবে তুলনামূলকভাবে ছোট ও দুর্বল রাষ্ট্রের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব বড় ও শক্তিশালী রাষ্ট্রের দ্বারা লঙ্ঘিত হবে। শান্তি ও স্থিতিশীলতা বলতে বিশ্বে আর কিছু থাকবে না। আমরা জানি না, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের ইরান যুদ্ধ আর কতদিন চলবে। প্রলম্বিত হলে বিশ্বের অর্থনীতি, জ্বালানি, ব্যবসা-বাণিজ্য, বিনিয়োগ, উৎপাদন, পরিবহন, শেয়ারবাজার, কৃষি, শিল্প সব ক্ষেত্রেই মারাত্মক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হবে। ইউক্রেন যুদ্ধ যখন শুরু হয়, তখন ধারণা করা হয়েছিল, বড়জোর দুই সপ্তাহের মধ্যে যুদ্ধ শেষ হয়ে যাবে। সেই যুদ্ধ এখন চার বছরে পড়েছে। যেহেতু ইরান যুদ্ধ ও মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতি কতদিন থাকবে, তা বলার উপায় নেই, কাজেই বাংলাদেশের মতো আমদানি ও রেমিট্যান্সনির্ভর দেশের উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবিলায় এখনই চিন্তাভাবনা ও পরিকল্পনা নেয়া অত্যাবশ্যক। বিশদ ব্যাখ্যার অপেক্ষা রাখে না, আমাদের অর্থনীতি দীর্ঘদিন ধরে অবনতিশীল অবস্থার মধ্য দিয়ে চলছে। পতিত ও বিতাড়িত স্বৈরাচর অর্থনীতির সকল ক্ষেত্র ও পর্যায় শেষ করে দিয়ে গেছে। কোনো ক্ষেত্রেই সুখবর নেই, নেতিবাচক প্রবণতাই লক্ষ্যনীয়। অন্তর্বর্তী সরকার অর্থনীতির ধস ঠেকাতে পারেনি; এতটুকুও টেনে তুলতে পারেনি। এমনই এক প্রেক্ষাপটে নতুন সরকার ক্ষমতায় এসেছে, যার কাছে জনপ্রত্যাশার কোনো সীমা পরিসীমা নেই।

ইরান যুদ্ধ ও মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের বিভিন্ন ক্ষেত্রে অধিকতর ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশংকা রয়েছে। আমাদের দেশ জ্বালানির ক্ষেত্রে পুরোপুরি আমদানির ওপর নির্ভরশীল। জ্বালানির প্রায় সবটাই মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে আমদানি করতে হয়। যুদ্ধের কারণে জ্বালানি আমদানি ও পরিবহন ব্যহত হতে পারে। ফলে, জ্বালানির সংকট দেখা দিতে পারে। জ্বালানির সংকট মানে পরিবহন সেক্টরগুলোতে, বিদ্যুৎ উৎপাদনে সংকট সৃষ্টি হওয়া। কৃষি ও শিল্পের উৎপাদনে এর বিরূপ প্রভাব পড়াও স্বাভাবিক। জ্বালানি সংকটের কারণে কিংবা আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বেড়ে গেলে অভ্যন্তরীণ বাজারেও দাম বেড়ে যেতে পারে। সেক্ষেত্রে উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাবে এবং মূল্যস্ফীতিতে লাগাম টানা সম্ভবপর হবে না। জনগণকে এর খেসারত গুণতে হবে। বলা অপ্রাসঙ্গিক হবে না যে, বাংলাদেশের অর্থনীতিতে অর্থের যোগান আসে প্রধানত দুটি খাত থেকে। একটি রফতানি খাত থেকে, যার ৮৪ শতাংশই তৈরি পোশাক থেকে আসে। তৈরি পোশাকের সবচেয়ে বড় বাজার যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন। অপরটি প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স খাত থেকে, যার অধিকাংশই আসে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ থেকে। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে দেশের প্রায় ৭০ লাখ মানুষ বিভিন্ন কর্মে নিয়োজিত। তারা সেখানে কঠোর পরিশ্রম করে উপার্জিত অর্থ দেশে পাঠায়, যা দিয়ে তাদের পরিবার-পরিজন চলে এবং জাতীয় অর্থনীতি অর্থের বড় যোগান লাভ করে। ইরান যুদ্ধকে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতি সৃষ্টি হওয়ায় জনশক্তি রফতানি ও রেমিট্যান্স প্রাপ্তি কমে যাওয়ায় বা ব্যহত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। ইতোমধ্যে ঢাকা থেকে মধ্যপ্রাচ্যগামী বিমানের ফ্লাইট বন্ধ হয়ে গেছে। ১২ ঘণ্টায় অন্তত ৫৪টি ফ্লাইট বাতিল করতে হয়েছে। এসব ফ্লাইটের যাত্রীরা অপরিসীম ভোগান্তি ও অনিশ্চয়তায় পড়েছে। প্রবাসীদের নিরাপত্তার প্রশ্নও এখন বড় হয়ে উঠেছে। যুদ্ধ প্রলম্বিত হলে এ খাতের সার্বিক পরিস্থিতি কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে তা কেবল ভবিতব্যই বলতে পারে। শুধু তাই নায়, ইরানসহ মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশে বাংলাদেশ থেকে বিভিন্ন পণ্য রফতানি হয়। ওইসব দেশে থেকেও নানা ধরনের পণ্য আসে। পরিস্থিতিগত কারণে পণ্যের এ গমনাগমন বন্ধ বা ব্যহত হতে পারে, যাতে বাংলাদেশের সমূহ ক্ষতি। লক্ষ করা গেছে, ইরান যুদ্ধের কারণে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অর্থনীতি, ব্যবসা-বাণিজ্য ও শেয়ারবাজারে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। আমাদের দেশও ব্যতিক্রম নয়। ইতোমধ্যে শেয়ারবাজারে দরপতন ঘটেছে। অন্যান্য ক্ষেত্রে প্রতিক্রিয়া এখনো ততটা দৃশ্যমান হয়নি, তবে হবে তাতে সন্দেহ নেই।

যুদ্ধ পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে আমাদের অর্থনীতি, ব্যবসা-বাণিজ্য, উৎপাদিত পণ্য, আমদানি, রফতানি, জীবন যাপনÑ সকল ক্ষেত্রেই সংকট ও বিপর্যয় বাড়বে। এহেন আশঙ্কার প্রেক্ষিতে এখনই আমাদের সতর্ক হতে হবে, সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে এবং পরিস্থিতি মোকাবিলায় উপযুক্ত প্রস্তুতি গ্রহণ করতে হবে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান পরিস্থিতির ওপর নজর রাখছেন। তিনি ইতোমধ্যে এপ্রিল পর্যন্ত জ্বালানি তেল, এলপিজি এবং এলএনজি সরবরাহ নিশ্চিত করার নির্দেশ দিয়েছেন। বলা নিষ্প্রয়োজন, জ্বালানি উন্নয়ন-অগ্রগতির অপরিহার্য উপকরণ। জ্বালানি নিরাপত্তার ওপর তাই সব দেশই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে থাকে। আমরা জ্বালানির ক্ষেত্রে আমদানিনির্ভর হওয়ায় জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কঠিন। সেক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি। প্রধানমন্ত্রী সে কারণেই জ্বালানি সরবরাহের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির জানিয়েছেন, জ্বালানির পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে, সমস্যা হবে না। যুদ্ধ পরিস্থিতিতে শুধু জ্বালানিই নয়, অন্যান্য ক্ষেত্রেও কী ধরনের সংকট বা সমস্যা দেখা দিতে পারে, তা নিয়ে পর্যালোচনা করা অত্যাবশ্যক। এ জন্য প্রয়োজন হলে প্রতিদিনই সরকারের উচ্চ পর্যায়ে বৈঠকে বসতে হবে। অর্থ পরিকল্পনা, বাণিজ্য, জ্বালানি, বৈদেশিক কর্মসংস্থানসহ সংশ্লিষ্ট সব মন্ত্রণালয়ের নিজস্ব বৈঠক ছাড়াও মন্ত্রণালয়গুলোর সমন্বিত বৈঠক হওয়া দরকার। পরিস্থিতি মোকাবিলার একটি সম্পূর্ণ পরিকল্পনা যত দ্রুত সম্ভব প্রণয়ন করা সময়েরই দাবি। কেবল পরিকল্পনা প্রণয়ন নয়, তা বাস্তবায়নেও দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে।

See More

Latest Photos