যশোরের ঝিকরগাছা ভূমি অফিসে ঘুস ও তদবির ছাড়া ফাইল নড়ে না। ফাইল প্রতি নির্ধারিত রেটে ঘুসের ভাগ না পাওয়া পর্যন্ত নানা অজুহাতে ফাইলকে ফ্রিজ করে রাখা হয়। নিরাপদ তদবির চ্যানেলে কাঙ্ক্ষিত ঘুস মিললে বিনা বাধায় ফাইল দৌড়াতে থাকে। হঠাৎ যেন হাত-পা গজিয়ে অচল ফাইল দ্রুত সচল হয়ে যায়। সমস্যা থাকুক বা না থাকুক, সবুজ সংকেত মিললে সব ঘাট পার হয়ে হাতে ধরা দেয় সোনার হরিণ ‘নামজারি পত্র’। এভাবে চলছে ঝিকরগাছা উপজেলা ভূমি অফিস। যেখানে সেবাপ্রার্থীদের জিম্মি করে ঘুস কারবার ওপেন সিক্রেট।
ঝিকরগাছা উপজেলা ভূমি অফিস ঘুসের হাট
ঘুসের হাট খ্যাত ঝিকরগাছা ভূমি অফিসের টপ টু বটম সবাই কমবেশি এই হয়রানি ও ঘুস চক্রের সঙ্গে জড়িত। নায়েব-কানুনগো থেকে শুরু করে একেবারে এসি ল্যান্ড পর্যন্ত সবাই পেছন থেকে দালালদের পরিচালিত করে। তবে বাইরে সবাই একেবারে সাধু সফেদ। সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে কথা বললে মনে হবে-তাদের মতো সৎ কর্মকর্তা কোথাও খুঁজে পাওয়া যাবে না।
ভুক্তভোগী মহল সূত্রে জানা যায়, সম্প্রতি বদলি হয়ে যাওয়া সহকারী কমিশনার (ভূমি) নাভিদ সরওয়ার ছিলেন পর্দার আড়ালের প্রধান খলনায়ক। তিনি মূলত সৎ সাইনবোর্ডধারী কর্মকর্তা। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে তার সময়ে শত শত মানুষ নামজারিসহ ভূমিসংক্রান্ত বহুবিধ সেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে বেশি হয়রানি হয়েছেন। নামজারি কেসে কোনো ত্রুটি না থাকলে আবেদন করার সর্বোচ্চ ৪০ দিনের মধ্যে প্রতিটি কেস নিষ্পত্তি হওয়ার কথা। কিন্তু তার সময়ে একজন সেবাপ্রার্থী আবেদন করেছেন গত বছর ২৭ নভেম্বর। কিন্তু ঘুস চ্যানেলে যোগাযোগ না করায় তার কেস নথি ফাইলবন্দি হয়ে পড়ে। তিন মাস পর মূল কাগজপত্রসহ ২৬ ফেব্রুয়ারি তাকে শুনানির জন্য হাজির হতে বলা হয়। অথচ বর্তমানে অনলাইন পদ্ধতিতে নামজারির আবেদনের সময় কিছু জমা দেওয়া হয়। মূলত যারা ফাইল জমা দেওয়ার সময় দালালের মাধ্যমে নায়েবকে নির্ধারিত টাকা দিতে অস্বীকার করেন তাদের ফাইল অনেক দেরিতে ছাড়া হয় এবং প্রতিটি নথিতে নায়েব নেগেটিভ রিপোর্ট দিয়ে দেন। ফলে শুনানিতে হাজির হলে ফের আবেদন করতে বলা হয়। এ ধরনের বহু অভিযোগ পাওয়ার পর যুগান্তরের পক্ষ থেকে বৃহস্পতিবার ঝিকরগাছা এসি ল্যান্ড অফিসে সরেজমিন অনুসন্ধান করেন যশোর ব্যুরোর দুজন প্রতিবেদক।
এদিন সকাল সাড়ে ৯টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত সরেজমিন দেখা গেছে, সহকারী কমিশনার (ভূমি) দেবাংশু বিশ্বাস প্রশিক্ষণজনিত কারণে কর্মস্থলে অনুপস্থিত। তদস্থলে অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোছা. রনি খাতুন। কর্মচারীরা জানান, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা দুপুর ২টায় এসি ল্যান্ড অফিসে বসেন। তবে সহকারী কমিশনার (ভূমি) না থাকায় সেবা বিঘ্নিত হচ্ছে। নিয়ম না থাকলেও জমির নামজারিসংক্রান্ত যাবতীয় দায়িত্ব অর্পণ করা হয়েছে চারজন কর্মচারীকে। আটটি ভূমি অফিসের মধ্যে প্রধান সহকারী শাহানারা পারভীন হাজিরবাগ ও মাগুরা ইউনিয়ন, পেশকার মনিরুজ্জামান মুকুল গদখালি ও গঙ্গানন্দপুর ইউনিয়ন, নামজারি সহকারী নাজমুল হুসাইন পৌর ও শিমুলিয়া ইউনিয়ন এবং সায়রাত সহকারী শিশির কুমার দাস বাঁকড়া ও নাভারণ ইউনিয়নের শুনানির দায়িত্ব পালন করছেন, যা তাদের এখতিয়ারবহির্ভূত কাজ।
একাধিক সেবাগ্রহীতার অভিযোগ, নামজারি কিংবা অন্যান্য ভূমিসংক্রান্ত সেবার জন্য এসি ল্যান্ড বরাবর আবেদন করা হয়। এরপর আবেদনটি তদন্তের জন্য ইউনিয়ন ভূমি অফিসের কর্মকর্তার (নায়েব) কাছে পাঠানো হয়। তবে ঘুস ছাড়া নায়েব পজিটিভ রিপোর্ট কিংবা প্রস্তাব দেন না। সংশ্লিষ্ট নায়েবের সঙ্গে উপজেলা ভূমি অফিসে কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিশেষ যোগসাজশ রয়েছে। মূলত এসব কর্মকর্তারা পেছনে থাকে ঘুসের দেনদরবার করার জন্য বহিরাগত কিছু দালাল নিয়োগ করা আছে। তাদের সঙ্গে কথা না বললে কেউ নামজারি করতে পারে না। এ কাজে সাবরেজিস্ট্রি অফিসের কয়েকজন নকলনবিশ ও ওমেদারও জড়িত। জমি রেজিস্ট্রি হওয়ার পর দলিলের নকলের জন্য ফিস রাখাসহ তাদের মাধ্যমে একই সঙ্গে নামজারির জন্য চুক্তি করা হয়। দলিলপ্রতি নামজারির জন্য সর্বনিম্ন ঘুসের রেট ৩ হাজার টাকা। জমির দাম ও পরিমাণ বেশি হলে ঘুসের রেটও বেশি হয়। তবে দালালদের চ্যানেল সিস্টেমে ফাইল জমা পড়লে দ্রুত আবেদন নিষ্পত্তি হয়ে যায়। এক সপ্তাহ থেকে ১৫ দিনের মধ্যে নামজারি কাগজ হাতে পাওয়া এক রকম নিশ্চিত। অন্যথায় ভোগান্তির শেষ থাকে না।
উপজেলা ভূমি অফিসে শুনানিতে আসা হাজিরবাগ ইউনিয়নের রেজাউল করিম বলেন, ‘আমার ভাইয়ের নামজারির আবেদন করা হয়েছিল তিন মাস আগে। আজকে শুনানির জন্য ডাকা হয়েছে। তবে কাজ করার জন্য অনেক ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। যা বুঝতেছি-নামজারি করতে হলে শেষ পর্যন্ত তাদের টাকা দিতেই হবে।
গদখালি ইউনিয়নের বাসিন্দা ইসরাফিল হোসেন বলেন, ‘ইউনিয়ন ভূমি অফিসের এক কর্মচারীর সহায়তায় নামজারির আবেদন করেছিলাম। ওই সময় তাকে এক হাজার টাকাও দিয়েছি। কিন্তু নায়েব সাহেব আমার কাছে সাত হাজার টাকা চেয়েছিলেন। আমি তাকে টাকা দিইনি। আজ শুনানি ছিল। এক কর্মচারীর কাছে শুনানিতে হাজির হয়েছি। তিনি বললেন, নায়েব সাহেব নেগেটিভ রিপোর্ট দিয়েছে। আমাকে ফের নায়েবের সঙ্গে দেখা করতে বলছে। কি করব বুঝতে পারছি না। ফের আবেদন করতে হবে। এখন বুঝতে পারছি ওই সময় নায়েবকে টাকা দিলে হয়তো আজ এমন পরিস্থিতি হতো না।’
এ সময় পাশে দাঁড়ানো মোহাম্মদ আওয়াল নামে এক সেবাগ্রহীতা বলেন, ‘২০২৫ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর জমির রেকর্ড সংশোধন ও নামজারির জন্য আবেদন করেছি। আজকে শুনানির তারিখ পেয়েছি। মাঝে অফিসে এসে ফাইল খুঁজে পাচ্ছিলাম না। পাঁচ দিন নিজে খুঁজে বের করে দিয়েছি। টাকা ছাড়া কাজ করতে গিয়ে ভোগান্তিতে পড়েছি।’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরেক সেবাগ্রহীতা বলেন, ‘ভাই পত্রিকায় নাম-ঠিকানা লিখে বিপদে ফেলেন না। আমার কাজ এখনো শেষ হয়নি। আসলে টাকা দিলে দ্রুত কাজ হয়। না দিলে ঘুরতে হয়। আমি নিজেই এক বছর আগে মিসকেস আবেদন করেছি। উপজেলা অফিসে খোঁজ নিয়ে জানতে পারি, আমার আবেদনের নথি হারিয়ে গেছে। ফের নথি সরবরাহ করেছি। আজ শুনানিতে ডেকেছে। কি হয় দেখি।’
একাধিক সেবাগ্রহীতার অভিযোগ, ঝিকরগাছা ভূমি অফিসকে দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত করেছেন তৎকালীন সহকারী কমিশনার (ভূমি) নাভিদ সরওয়ার। তার আশ্রয়ে বেপরোয়া হয়ে ওঠে কর্মচারী ও দালাল সিন্ডিকেট। মুখে মিষ্টি কথা বললেও বেশির ভাগ সেবাগ্রহীতাকে তিনি অহেতুক হয়রানি করেছেন। এছাড়া এখানে এসি ল্যান্ড নিয়মিত না থাকায় আরও বেশি বেপরোয়া হয়ে উঠেছে ইউনিয়ন ভূমি অফিস থেকে শুরু করে উপজেলা ভূমি অফিসের দুর্নীতিবাজ চক্র।
ভুক্তভোগীদের অনেকে অভিযোগ করেন, এখানে দুর্নীতিবাজদের কেউ সরাতে পারে না। একবার রিপোর্ট হওয়ার কারণে সার্ভেয়ার ফিরোজ আলমকে বদলি করা হয়। কিন্তু ফের তিনি তদবির করে এখানে ফিরে এসেছেন।
উল্লিখিত একাধিক অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে ঝিকরগাছা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোছা. রনি খাতুন বলেন, ঘুস নেওয়ার সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পেলে দোষীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। নিয়মানুযায়ী কাজ করতে গিয়ে আবেদন নিষ্পত্তিতে সময় বেশি লাগতে পারে।
কর্মচারীদের শুনানি গ্রহণ প্রসঙ্গে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বলেন, ‘এসি ল্যান্ড না থাকায় একাই একাধিক দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে। এ কারণে সেবাগ্রহীতাদের ভোগান্তি কমাতে শুনানির নোট নেওয়ার জন্য কর্মচারীদের দায়িত্ব বণ্টন করা হয়েছে। তাদের নোটের ভিত্তিতে যাচাই-বাছাই করে আমি আবেদন নিষ্পত্তি করি। কর্মকর্তা না থাকায় কাজে প্রভাব পড়ছে।’