বিশ্বের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গত সাত দশক ধরে মূলত একটি রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক ব্যবস্থা বা পশ্চিমা ওয়ার্ল্ড অর্ডারের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়ে আসছে। এ ক্ষেত্রে সমাজতান্ত্রিক বিশ্বের সাথে কয়েক দশকের একটা ঠান্ডা লড়াই টিকে থাকলেও সম্প্রসারণবাদী নীতির কারণে সোভিয়েত সমাজতন্ত্রের পতনের মধ্য দিয়ে বিগত শতকের শেষদিকে ইউনিপোলার বা এক মেরুকেন্দ্রিক বিশ্বে পরিনত হয়। সেই একমেরুকেন্দ্রিক পুঁজিবাদী নিয়ন্ত্রন ব্যবস্থাকে চিরস্থায়ী করতে সম্ভাব্য রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক প্রতিদ্বন্দিতা বা হুমকি মোকাবেলা করতেই জায়নিস্টরা নাইন-ইলেভেন ফল্স ফ্ল্যাগ অপারেশন চালিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিওকন পলিটিসিয়ানদের হাতে ওয়ার অন টেররিজম নাম দিয়ে একটি অন্তহীন যুদ্ধের নীল নকশা চাপিয়ে দেয়। প্রেসিডেন্ট জর্জ ডাব্লিউ বুশ তাঁর যুদ্ধের ঘোষণায় ‘ক্রুসেড’ শব্দটি ব্যবহার করেছিলেন। আফগানিস্তান ও ইরাক দখলের মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া সেই যুদ্ধ দুই দশক চালিয়েছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। প্রায় ৫ ট্রিলিয়ন ডলার খরচ করেও ইরাক বা আফগানিস্তানে সামরিক-অর্থনৈতিক বা কৌশলগত স্বার্থ হাসিল করতে পারেনি তারা। ইরাকে হামলার আগে, ইসরাইলের নেতানিয়াহু ও মোসাদ পরিচালিত থিঙ্কট্যাঙ্কগুলো প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেনের হাতে গণবিদ্ধংসী অস্ত্রের মজুদ থাকার কতগুলো মিথ্যা, বানোয়াট তথ্য তুলে দিয়েছিল। সেই তথ্যের ভিত্তিতে তারা ব্যাপক প্রপাগান্ডা চালিয়ে যুদ্ধের বয়ান হাজির করেছিল। ইরাকি জনগণের ভাগ্য পরিবর্তন, গণতন্ত্র ও স্বাধীনতার জন্য আমেরিকা ইরাক দখল করতে চলেছে, এমনই ছিল সে সময়কার প্রচারণা। গোপন বাঙ্কার থেকে সাদ্দাম হোসেনকে ধরে এনে বিচারের নামে কোনো এক ঈদের দিনে ফাঁসি দিয়েছিল মার্কিনীরা। এরপর দুই দশকেও ইরাক আগের অবস্থায় ফিরে আসেনি। অন্যদিকে, আফগান যোদ্ধারা তো বটেই, সাধারণ জনগণও ইরাকের জনগণের মত নয়। তারা একদিনের জন্যও মার্কিন দখলদারিত্ব মেনে না নিয়ে লড়াই চালিয়ে ন্যাটো বাহিনীর ঘুম হারাম করে দিয়েছিল। অবশেষে ভিন্ন ব্লু প্রিন্ট হাতে নিয়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আফগানিস্তান থেকে মার্কিন সৈন্য ফিরিয়ে নিয়ে আফগান তালেবানদের কাছে নিজেদের সামরিক ও কৌশলগত পরাজয় মেনে নিতে বাধ্য হয়। জায়নবাদীদের হাতে বিশ্ব ও মধ্যপ্রাচ্য নিয়ন্ত্রণের প্ল্যান ‘এ’, প্ল্যান ‘বি’ এবং সি’ ইত্যাদি নীলনকশা রয়েছে। প্রতিটি পরিকল্পনার আবার বিকল্প পরিকল্পনা থাকতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যে রিজিম চেঞ্জের জুজু দেখিয়ে পেট্রোডলারের দেশগুলোকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উপর আরো বেশি নির্ভরশীল, ইসরাইলের ঘনিষ্ট ও বশংবদ করতে মোসাদের দ্বারা প্রক্সি বাহিনী সৃষ্টি করে ‘আরব বসন্ত’ তথা দেশে দেশে সরকারবিরোধী আন্দোলন ও গৃহযুদ্ধের অবস্থা সৃষ্টি করা হয়। পশ্চিমা সা¤্রাজ্যবাদ বিরোধী মুসলিম বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী কণ্ঠশ্বর লিবিয়ার প্রেসিডেন্ট মুয়াম্মার গাদ্দাফির সাথে সমঝোতা ও শান্তি প্রতিষ্ঠার ভণিতাপূর্ণ প্রতারণা করে প্রথমে লিবিয়ার গোপন পারমানবিক প্রকল্প বন্ধ ও ধ্বংস করে দেয়া হয়; অত:পর মার্সেনারি গ্রুপের বিদ্রোহীদের দিয়ে তাকে হত্যা করা হয়। মুসলিম বিশ্বে আমেরিকার বন্ধুত্বের কোনো বিশ্বাসযোগ্য নিদর্শন নেই। আমেরিকার মধ্যপ্রাচ্য নীতি মূলত জায়নবাদি ইসরাইলীদের দ্বারা পরিচালিত হয়। সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধের ডামাডোলে বিশ্বরাজনীতির অন্যতম অগ্রাধিকার ভিত্তিক মানবিক ইস্যু ফিলিস্তিনের স্বাধীনতা, আরব-ইসরাইল শান্তি ও দ্বিরাষ্ট্রকেন্দ্রিক সমাধানের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত পরিকল্পনা ধামাচাপা দেয়া সম্ভব হয়।
নতুন বাস্তবতা বিশ্বরাজনীতিতে : হিন্দুত্ববাদিদের অখ- ভারতের স্বপ্ন
মধ্যপ্রাচ্যে ওয়ার অন টেররিজমের যুদ্ধের পেছনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কিংবা পশ্চিমা বিশ্বের নিরাপত্তা ঝুঁকির কোনো বিশ্বাসযোগ্য তথ্য ছিল না। উপরন্তু শুধুমাত্র গ্রেটার ইসরাইলের সম্প্রসারণবাদী পরিকল্পনা বাস্তবায়ন এবং মধ্যপ্রাচ্য ও পশ্চিমা বিশ্বের জনগণের ট্যাক্সের টাকা থেকে মিলিটারি ইন্ডাস্ট্রিয়াল কমপ্লেক্সের টিলিয়ন ডলারের বাণিজ্যিক মুনাফা হাসিলের জন্যই এসব যুদ্ধ বাঁধিয়ে লাখ লাখ মানুষ হত্যা করা হয়েছে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের মত আধপাগল বর্ণবাদী লোক দ্বিতীয়বারের জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হওয়ার মধ্য দিয়ে প্রমাণিত হয়েছে, মার্কিন রাজনীতি, নির্বাচনব্যবস্থা ও গণতন্ত্র মার্কিন জনগণের হাতে নেই। এসব অনেক আগেই জায়নবাদী কর্পোরেট নিয়ন্ত্রিত ব্যাংকার, থিঙ্কট্যাঙ্ক ও ডিপস্টেটের হাতে চলে গেছে। মার্কিন জনগণের সচেতন অংশ অনেক আগেই বুঝে গেছে, তাদের দেশের সিংহভাগ সম্পদ কয়েকটি ধনকুবের কর্পোরেট পরিবারের হাতে কুক্ষিগত হয়ে পড়েছে। মার্কিন সমাজের এই অর্থনৈতিক বৈষম্যকে উপজীব্য করে নোবেল বিজয়ী মার্কিন অর্থনীতিবিদ জোসেফ স্টিগলিজ ২০১১ সালের মে মাসে ভ্যানিটি ফেয়ার ম্যাগাজিনে একটি নিবন্ধ লিখেছিলেন, নিবন্ধের শিরোনাম ছিল, ‘অফ দ্য ওয়ান পারসেন্ট (১%), বাই দ্য ওয়ান পারসেন্ট (১%) অ্যান্ড ফর দ্য ওয়ান (১%) পারসেন্ট’। এই নিবন্ধে মার্কিন গণতন্ত্র ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থা আব্রাহাম লিঙ্কনের গণতন্ত্রের সংজ্ঞার বিপরীত অবস্থা নির্দেশ করছে। স্টিগলিজের নিবন্ধটি প্রকাশের আগে থেকেই মার্কিন অর্থনৈতিক বৈষম্য নিয়ে এক ধরণের গণঅসন্তোষ ধূমায়িত হয়ে উঠেছিল। ২০১১ সালের আগস্টে অকুপাই ওয়ালস্ট্রিট কর্মসূচির মূল ব্যানার ছিল ‘উই আর দ্য ৯৯%’। বৈষম্য দূর করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শতকরা নিরানব্বই জনের স্বার্থ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব হলে যুদ্ধবাদী অর্থনীতির প্রয়োজনীয়তা থাকতো না। পুঁজির আধিপত্যকে অস্ত্র বানিয়ে এক কোটিরও কম সংখ্যক জায়নবাদী ইহুদি বিশ্বের আঞ্চলিক নিরাপত্তা, স্থিতিশীলতা, ৮শ কোটি মানুষের জীবন ও ভাগ্য নিয়ে ছিনিমিনি খেলছে। কোটি কোটি জনগণের চোখকে ফাঁকি দিয়ে কোনো অস্বচ্ছ-অনৈতিক ব্যবস্থা বাঁধাহীনভাবে দীর্ঘদিন চলতে পারে না। মেকি গণতন্ত্র ও অস্বচ্ছ অর্থনৈতিক ব্যবস্থা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে একটি আত্মগর্বি অকার্যকর ও দেউলিয়া রাষ্ট্রে পরিণত করেছে। এই মুহূর্তে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ঋণের পরিমাণ ৩৯ ট্রিলিয়ন ডলার, যা ক্রমবর্ধমান। মার্কিন মোট জিডিপির চেয়ে ঋণের পরিমান অনেক বেশি। মার্কিন জনসংখ্যা বিশ্বের জনসংখ্যার প্রায় ৪ শতাংশ হলেও বিশ্বের সরকারি বেসরকারি ঋণের ১১ ভাগের বেশি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের। বিশ্ববাণিজ্যে বিনিময় মূদ্রা হিসেবে ডলারের আধিপত্যকে পুঁজি করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্রতিবছর ট্রিলিয়ন ডলারের নতুন ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে বিশ্ব অর্থনীতিকে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করতে গিয়ে যুদ্ধবাদী অর্থনীতির আশ্রয় নিতে বাধ্য হচ্ছে। প্রযুক্তি, মাইক্রোচিপস ও রেয়ার মেটেরিয়ালের প্রতিযোগিতায় চীনের মত পরাশক্তির সাথে হেরে যাচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। ইরান যুদ্ধে পরাজয়ের মধ্য দিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিপোলার সা¤্রাজ্যবাদের পতন ত্বরান্বিত হতে চলেছে।
এই প্রথমবারের মত ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ ন্যাটোভুক্ত দেশগুলো ইরানযুদ্ধ ও হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তায় মার্কিন প্রেসিডেন্টের প্রস্তাব সরাসরি প্রত্যাখ্যাত হয়েছে। এমনকি মধ্যপ্রাচ্যের বশংবদ পেট্টোডলার দেশগুলোও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা গ্যারান্টির উপর ভরসা রাখতে না পেরে ইরানের সাথে আপস করতে বাধ্য হচ্ছে। অজেয় বলে দাবিদার ইসরাইলের সম্মিলিত চার-পাঁচ স্তরের সব আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ব্যর্থ ও পঙ্গু করে দিয়ে তেল আবিব, হাইফাসহ ইসরাইলের অভ্যন্তরে ইরানের ফাত্তাহ ও খাইবার মিসাইলের তান্ডব বশংবদ আরব রাজাদের স্বপ্নভঙ্গ ঘটিয়েছে। গত দেড় দশকে তারা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে হাজার হাজার কোটি ডলারের যে সব নিরাপত্তা চুক্তি করেছিল, তা এখন তাদের জন্য নিরাপত্তাহীনতার সবচেয়ে বড় কারণ ও দুর্বহ বোঝা হয়ে উঠেছে। গত বছর জুনে ১২দিনের ইরান-ইসরাইল আমেরিকা যুদ্ধের সময় পশ্চিমা বিশ্ব ইসরাইল-আমেরিকার আগ্রাসনকে সমর্থন না জানালেও বিশ্বের একক বৃহত্তম মুসলিম জনগোষ্ঠির দেশ হিন্দুত্ববাদী ভারত ইসরাইলের প্রতি অকুণ্ঠ সমর্থন প্রকাশ করেই থেমে থাকেনি, তারা ইসরাইলে হাজার হাজার জনশক্তি ও কোটি কোটি ডলারের লজিস্টিকস পাঠিয়ে বন্ধুত্বের নির্দশন দেখিয়েছে। অন্যদিকে, ইউরোপে ইসরাইলের পুরনো বন্ধু রাষ্ট্র স্পেন, স্লোভেনিয়া, নেদারল্যান্ডস, তুরস্ক, আয়ারল্যান্ডের মত দেশ নিজেদের বন্দরে ইসরাইলগামি অস্ত্রবাহী জাহাজ ভিড়তে ও পণ্য খালাসে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিল। ২০২৬ এর ফেব্রুয়ারিতে ইরানের সাথে একটি কূটনৈতিক সমঝোতায় পৌছানোর ভণিতা করে আলোচনার টেবিলে বসিয়ে ইরানে ইসরাইল-আমেরিকার আকষ্মিক অভাবনীয় বিমান হামলা শুরুর দুইদিন আগে বন্ধু নেতানিয়াহুকে সমর্থন জানাতে ইসরাইলে ছুটে গিয়েছিলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। সেখানে গিয়ে তিনি ভারতকে ইসরাইলীদের মাদারল্যান্ড ঘোষণা দিয়ে নেসেটে বক্তৃতা দিয়ে আসার দুইদিন পরেই ইরানে ইসরাইল-আমেরিকার যৌথ বিমান হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা ইমাম আয়াতুল্লাহ্ খামেনেইকে হত্যা করা হয়। মিনাবের একটি স্কুলে বিমান হামলা করে দেড়শতাধিক শিশুকে হত্যা করে ইসরাইল-আমেরিকার বিমান বাহিনী। বিশ্বের অনেক দেশ সেই হামলার নিন্দা জানালেও ভারত মুখে কুলুপ এটে বসেছিল। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সরকারের শীতল প্রতিক্রিয়া নিয়ে কিছুটা অসন্তোষ প্রকাশিত হলেও ইরানের পক্ষে বাংলাদেশের সাধারণ জনগণের ঐক্যবদ্ধ সমর্থন ও সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাক্টিভিজম ছিল দৃশ্যমান। কিন্তু যুদ্ধের শুরুতে ভারতীয়দের ইরান বিরোধী প্রতিক্রিয়া ছিল ভারতীয় হিন্দুদের ইসলামোফোবিক অবস্থানের নির্দশন। তাদের ভাষায় ইসরাইল-আমেরিকার বিমান হামলায় ইমাম খামেনির মৃত্যুর মধ্য দিয়ে ইরানে মোল্লাতন্ত্রের পতন ঘটেছে, সেখানে পশ্চিমা বশংবদ শাসক বসিয়ে ইরানের তেলসম্পদ লুন্ঠনের পথ সুগম হতে যাচ্ছে, এই খুশিতে ভারতীয়রা ডুগডুগি বাজাতে শুরু করেছিল। তবে তাদের স্বপ্নভঙ্গ হতে বেশি সময় লাগেনি। আমেরিকা-ইসরাইলের সব প্রতিরক্ষা গুড়িয়ে দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের সব মার্কিন ঘাটিতে মিসাইল হামলা চালিয়ে মার্কিন আধিপত্যবাদের পতন নিশ্চিত করেছে ইরান। হরমুজ প্রণালিতে ইরানি নিয়ন্ত্রণ এই যুদ্ধে ইরানের বিজয়ের মূল প্রামাণ্য চালিকাশক্তি। এটি শুধু ইরানের বিজয় নয়, ডলারের একাধিপত্য, যুদ্ধবাদী অর্থনীতি এবং পশ্চিমা ইউনিপোলার বিশ্বের বিরুদ্ধে এশীয় সভ্যতা ও মাল্টিপোলার বিশ্বে পদার্পণের অপ্রতিরোধ্য অগ্রযাত্রা।
ইরান যুদ্ধ শুরু করেনি। বিগত শতকের বিশ্বযুদ্ধসহ প্রায় সবগুলো আঞ্চলিক যুদ্ধের ফলাফল থেকে প্রমাণিত হয়েছে, বিনা উস্কানিতে যারা আগ্রাসন ও যুদ্ধ শুরু করে তারা কখনো বিজয়ী হয়না। একাত্তরের ২৫ মার্চ ঢাকায় পাকিস্তানি বাহিনী অপারেশন সার্চ লাইট শুরু না করলে বাংলাদেশের কোনো রাজনৈতিক শক্তি স্বাধীনতা ঘোষণা বা মুক্তিযুদ্ধ শুরু করতো কিনা তা নিয়ে সংশয়ের অবকাশ আছে। এর আগে ১৯৪৬ সালে কলকাতায় হিন্দুদের রায়ট ও মুসলিম গণহত্যা না হলে বাংলা ভাগ হতো না। ঐতিহাসিকভাবে বাংলা মুসলমান প্রধান হওয়ার কারনে ১৯৩৭ এবং ১৯৪৬ সালের নির্বাচনে বাংলার শাসনভার মুসলমানদের হাতে চলে যাওয়ার কারণেই হিন্দুরা বাংলাভাগ করে কলকাতার উপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে চেয়েছিল। অথচ এই বর্ণ হিন্দুরাই ১৯০৫ সালে পূর্ববাংলা ও আসামকে নিয়ে ঢাকাকেন্দ্রিক নতুন প্রদেশ গঠনকে ‘বঙ্গভঙ্গ’, বঙ্গমায়ের অঙ্গচ্ছেদ বলে কান্নাকাটি ও তুমুল আন্দোলন করে ৫ বছরের মাথায় ১৯১১ সালে বৃটিশদের বঙ্গভঙ্গ রদ করাতে বাধ্য করেছিল। পরিবর্তিত বিশ্ব রাজনীতিতে ভারতীয় হিন্দুত্ববাদীরা কোনঠাসা হয়েও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলীদের পদাঙ্ক অনুসরণ করছে। পশ্চিমা দুনিয়ায় জায়নিস্টদের ইসলামোফোবিক এজেন্ডা ব্যর্থ হলেও ভারতীয় হিন্দুত্ববাদীরা দেশের মুসলমান জনগোষ্ঠির বিরুদ্ধে রীতিমত যুদ্ধ ঘোষণা করেছে। দিল্লি ও কলকাতায় হিন্দুত্ববাদিদের অপরাজনীতি উপমহাদেশকে অস্থিতিশীল ও অশান্ত করে তুলেছে। গত বছর মে মাসে পাকিস্তানে সামরিক আগ্রাসন চালাতে গিয়ে ভারতীয় বিমান বাহিনী চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত, পরাস্ত ও পর্যুদস্ত হয়েছে। পাকিস্তানের প্রত্যাঘাতে ভারতের লজ্জাজনক পরাজয় বিশ্ব মঞ্চে ভারতের সামরিক ও ভূরাজনৈতিক অবস্থানকে ধসিয়ে দিয়েছে। ইরান-আমেরিকা যুদ্ধে পাকিস্তান মধ্যস্থতাকারির আসনে বসে কূটনৈতিক ভূমিকায় এক অনন্য উচ্চতায় আসীন হয়েছে। বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ভারতীয়দের ষড়যন্ত্র বহুমুখী ও বহুরৈখিক। দশকের পর দশক ধরে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ভারতের পরিকল্পিত পানি আগ্রাসন বাংলাদেশের ভূপ্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য, প্রাণপ্রকৃতি ও খাদ্যনিরাপত্তা ধ্বংসের মধ্য দিয়ে দেশকে অস্তিত্ব সংকটে ঠেলে দিতে চাইলেও বাংলাদেশের শাসকশ্রেণী তার যথাযথ কার্যকর প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারেনি। প্রায় পাঁচ দশকের ধারাবাহিক আগ্রাসনের পর বাংলাদেশ এখন তার নিরাপত্তার স্বার্থে চীন ও পাকিস্তানের সাথে কৌশলগত নিরাপত্তা চুক্তি, বিমান প্রতিরক্ষা ও সামরিক বাহিনীর আধুনিকায়ন, সমরাস্ত্র কারখানা উন্নয়ন, চীনের সহায়তায় পদ্মা ব্যারাজ ও তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের পথে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশের অন্যতম বাণিজ্যিক অংশীদার হয়েও আধিপত্যবাদী ভারত বাংলাদেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের প্রতি শ্রদ্ধাশীল নয়। তারা একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বরের বিজয়কে পাকিস্তানের সাথে ভারতীয় সেনাবাহিনীর ইস্টার্ন কমান্ডের বিজয় হিসেবে দেখে। বাংলাদেশের বিজয় দিবস হিসেবে স্বীকার করেনা। তারা বাংলাদেশে নিজস্ব তত্ত্বাবধানে লুটপাটতন্ত্র কায়েম রাখতে চায়, স্থিতিশীল গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক ব্যবস্থা দেখতে আগ্রহী নয়। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান ছিল মূলত বাংলাদেশে ভারতীয় আধিপত্যবাদের বশংবদ শক্তির বিরুদ্ধে ছাত্র-জনতা ও সাধারণ মানুষের প্রতিক্রিয়া। গণহত্যাকারী হাসিনাকে দিল্লিতে আশ্রয় দিয়ে ভারতীয় মিডিয়া ও বিজেপি নেতাদের বাংলাদেশ বিরোধী উস্কানি ও আস্ফালন ছিল সীমাহীন। পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি সরকার গঠনের পর উস্কানিমূলক তৎপরতা, হুমকি ও আস্ফালন আরো বেড়ে গেছে। শুভেন্দু অধিকারিরা বাংলাদেশকে গাজায় পরিনত করার স্বপ্ন দেখে। এমন উগ্র-অকর্মণ্য সাম্প্রদায়িক শক্তির হাতে যখনই বাংলার শাসনভার পড়েছে, তখনই বাংলায় গণপ্রতিরোধের নতুন ইতিহাস রচিত হয়েছে। পাল ও সেন রাজাদের অত্যাচারে অতীষ্ঠ বাংলার হিন্দু-মুসলমানরা বখতিয়ার খিলজির নেতৃত্বে আফগানিস্তান থেকে আগত সেনাবাহিনীকে বরণ করে নিয়েছিল। ভারতীয় হিন্দুত্ববাদীরা জায়নবাদিদের গ্রেটার ইসরাইল পরিকল্পনার আদলে অখ- ভারতের রূপরেখা গ্রহণ করেছে। তারা এক সময় ভারতের বৌদ্ধদের বিতাড়িত ও নির্মূল করেছিল। এখন তারা ভারতে মুসলমান বিদ্বেষী নিপীড়নের পথ বেছে নিয়ে মুসলমানদের মুসলমান আত্মপরিচয় ও ধর্মীয় চেতনা মুছে ফেলার স্বপ্ন দেখছে। পাকিস্তান ও বাংলাদেশকে অখ- ভারতের অংশে পরিনত করার হিন্দুত্ববাদী পরিকল্পনা বুমেরাং হয়ে ভারত এখন বহুখ-ে ভেঙ্গে পড়ার দ্বারপ্রান্তে উপনীত হয়েছে।