মক্কা প্যাক্ট এখন বার্নিং ইস্যু হিসেবে সারা বিশ্বের পর্যবেক্ষণে রয়েছে। হঠাৎ তিনটি দেশ একটি সামরিক জোটে এক হলো কেন এ নিয়ে চলছে আলোচনা ও সমালোচনা। এর পরিস্ফুটন ঘটার আগেই বাংলাদেশ কেন এতে যোগ দেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করলো তা নিয়ে বুদ্ধিজীবী মহল বেশ উদ্বিগ্ন বলে আভাস মিলছে।
মক্কা চুক্তিতে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ: কূটনীতির চেয়ে বড় জাতীয় স্বার্থ
গত ৭ আগস্ট সৌদি আরব, তুরস্ক এবং পাকিস্তানের মধ্যে স্বাক্ষরিত 'মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি'-তে বাংলাদেশের যোগ দেওয়া উচিত কি না, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে এর কৌশলগত, নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক প্রভাবগুলো সতর্কতার সঙ্গে খতিয়ে দেখার জন্য বিশেষজ্ঞদের তাগিদ দেওয়া হয়েছে।
পররাষ্ট্র বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবীর গত সোমবার এ জোটে যোগ দিতে বাংলাদেশের আগ্রহের কথা প্রকাশ করার পর বিশেষজ্ঞদের পক্ষ থেকে এ মন্তব্যগুলো এলো।
সাবেক কূটনীতিক, গবেষক, শিক্ষাবিদ এবং নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলেছেন যে, কোনো সিদ্ধান্তই যেন প্রধান প্রধান আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক পরাশক্তিগুলোর সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখার যে দীর্ঘদিনের নীতি বাংলাদেশের রয়েছে তা ক্ষুণ্ন না করে, অথবা দেশকে তার জাতীয় স্বার্থের বাইরের কোনো দ্বন্দ্বে টেনে না নেয়।
কোনো দেশের পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা নীতিতে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে, যার প্রভাব দীর্ঘমেয়াদে জাতীয় নিরাপত্তা, আঞ্চলিক সম্পর্ক ও অর্থনীতির ওপর পড়তে পারে, সেখানে শুধু তাৎক্ষণিক কৌশলগত লাভ নয়—সম্ভাব্য ঝুঁকিগুলোকেও সমান গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা জরুরি। বিশেষ করে কোনো সামরিক জোটে বাংলাদেশের মতো একটি দেশের অংশগ্রহণের প্রশ্নে জাতীয় স্বার্থ, প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক এবং জনগণের মতামতকে উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।
বাংলাদেশ এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউটের সভাপতি ও সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবীর মনে করেন, মক্কা চুক্তিতে বাংলাদেশের সম্ভাব্য অংশগ্রহণের বিষয়টি এখনই আলোচনার পর্যায়ে আসেনি। তাঁর বক্তব্য, সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান ইরানকে এই জোটে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে বলে সংবাদমাধ্যমে এসেছে। অর্থাৎ এটি এমন একটি প্ল্যাটফর্ম হতে পারে, যেখানে অংশগ্রহণের জন্য আমন্ত্রণ গুরুত্বপূর্ণ। তাই বাংলাদেশের কাছে আদৌ কোনো আমন্ত্রণ এসেছে কি না, সেটিই আগে স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। আমন্ত্রণ এলে তখন বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করা যেতে পারে।
চুক্তির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—স্বাক্ষরকারী তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর হামলাকে তিন দেশের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে। বিষয়টি ন্যাটো (NATO) চুক্তির অনুচ্ছেদ ৫-এর সঙ্গে তুলনীয়। তবে এই চুক্তির অধীনে ন্যাটোর মতো কোনো একক কমান্ড কাঠামো থাকবে কি না, তা এখনো পরিষ্কার নয় বলে মনে করেন স্বাধীন গবেষক আলতাফ পারভেজ। তাঁর ধারণা, ভবিষ্যতে স্বাক্ষরকারী দেশগুলো বাংলাদেশকেও এই প্রতিরক্ষা কাঠামোর আওতায় আনার চেষ্টা করতে পারে।
আলতাফ পারভেজের মতে, সাম্প্রতিক মার্কিন-ইরান সংঘাতের পর ইরান ও তেহরানের নেতৃত্ব মুসলিম বিশ্বে একটি শক্তিশালী ও দৃঢ় ভাবমূর্তি অর্জন করেছে। এর ফলে সৌদি আরব ও তুরস্ক মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলোর মধ্যে নিজেদের নেতৃত্বের অবস্থান ধরে রাখার প্রতিযোগিতায় আরও সক্রিয় হতে পারে। এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের সমর্থন উভয় দেশের কাছেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে গত দুই-তিন বছরে বাংলাদেশের সঙ্গে সামরিক সম্পর্ক জোরদারের বিষয়ে তুরস্কের আগ্রহ স্পষ্ট হয়েছে।