# উচ্চ সুদহার, মূল্যস্ফীতি ও ব্যবসায়িক অনিশ্চয়তায় উদ্যোক্তারা নতুন ঋণে সতর্ক # উৎপাদন সক্ষমতার পুরোটা ব্যবহার না হওয়ায় বড় অঙ্কের ঋণের প্রয়োজনও কমেছে # জ্বালানি সংকট ও বাড়তি পরিচালন ব্যয়ে ব্যবসার খরচ বেড়েছে # ব্যাংকগুলোও খেলাপি ঋণ ও ঝুঁকির কারণে ঋণ বিতরণে সতর্ক # দীর্ঘদিন ঋণ প্রবৃদ্ধি কম থাকায় বেসরকারি বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে চাপের আশঙ্কা দেশের বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির গতি টানা ছয় মাস ধরে ৫ শতাংশের নিচে রয়েছে। বিনিয়োগ ও ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে ব্যাংকঋণের চাহিদা দুর্বল থাকায় ঋণপ্রবাহে এই ধীরগতি অব্যাহত রয়েছে। মার্চ থেকে আগস্ট—প্রতিটি মাসেই বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ৫ শতাংশের নিচে অবস্থান করেছে।
ঋণ প্রবৃদ্ধি ৫ শতাংশের নিচে টানা ছয় মাস বেসরকারি খাতে
খাত-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নতুন কেউ ব্যবসায় বিনিয়োগ না করায় ঋণের চাহিদাও কমেছে। পাশাপাশি দেশে উৎপাদন সক্ষমতার পুরোটা ব্যবহার না হওয়ায়বড় অঙ্কের ঋণের প্রয়োজন হচ্ছে না।
এ ছাড়া কয়েক বছর ধরে অভ্যন্তরীণ ভোগ ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ধীরগতি রয়েছে। চলতি বছর নির্বাচন হয়ে যাওয়ার পর জ্বালানি সংকট তৈরি হয়েছে। অনেক প্রতিষ্ঠান বেশি অর্থ ব্যয় করেও প্রয়োজনীয় জ্বালানি পাচ্ছে না। অন্যদিকে উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে নীতি সুদের হারও বেশি। ফলে ব্যাংকঋণের সুদের হার কমানো সম্ভব হচ্ছে না এবং ব্যবসা পরিচালনার ব্যয়ও বেড়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, মার্চে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ছিল ৪ দশমিক ৭২ শতাংশ। এপ্রিলে সামান্য বেড়ে তা দাঁড়ায় ৪ দশমিক ৭৫ শতাংশে। মে মাসে প্রবৃদ্ধি আরও কিছুটা বেড়ে ৪ দশমিক ৯৮ শতাংশে পৌঁছালেও ৫ শতাংশের সীমা অতিক্রম করতে পারেনি। এরপর জুনে প্রবৃদ্ধি কমে ৪ দশমিক ৪৭ শতাংশে এবং জুলাইয়ে সামান্য বেড়ে ৪ দশমিক ৬২ শতাংশে দাঁড়ায়।
আগস্ট মাসেও একই ধারা অব্যাহত রয়েছে। মাসটিতে বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি নেমেছে ৪ দশমিক ৭৫ শতাংশে।
অর্থাৎ, টানা ষষ্ঠ মাসে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ৫ শতাংশের নিচে অবস্থান করছে।
অর্থনীতির জন্য বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহকে গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে দেখা হয়। কারণ শিল্প, ব্যবসা-বাণিজ্য, কর্মসংস্থান ও নতুন বিনিয়োগের বড় একটি অংশ ব্যাংকঋণের ওপর নির্ভরশীল। ফলে দীর্ঘ সময় ধরে ঋণ প্রবৃদ্ধি কম থাকলে বেসরকারি বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে তার প্রভাব পড়ার আশঙ্কা থাকে।
সাম্প্রতিক মাসগুলোর তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত ঋণ প্রবৃদ্ধিতে বড় কোনো গতি তৈরি হয়নি। মে মাসে প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ৯৮ শতাংশে উঠলেও পরের দুই মাসে তা আবার কমে যায়। আগস্টেও ৫ শতাংশের সীমা অতিক্রম করতে না পারায় বেসরকারি খাতে ঋণের চাহিদা এখনো দুর্বল থাকার চিত্রই ফুটে উঠছে।
ব্যাংকাররা বলছেন, ঋণের সুদহার, ব্যবসার পরিবেশ, বিনিয়োগের অনিশ্চয়তা এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির কারণে উদ্যোক্তাদের একটি অংশ নতুন করে ঋণ নিতে সতর্ক রয়েছেন। একই সঙ্গে ব্যাংকগুলোও ঋণ বিতরণের ক্ষেত্রে আগের তুলনায় বেশি সতর্কতা অবলম্বন করছে। ফলে ঋণের চাহিদা ও সরবরাহ—দুই দিকেই ধীরগতি তৈরি হয়েছে।
এদিকে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি কম থাকার বিপরীতে ব্যাংক খাতে তারল্য ব্যবস্থাপনা, খেলাপি ঋণ এবং ঋণের গুণগত মান নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। নতুন ঋণ বিতরণের পাশাপাশি পুরোনো ঋণ আদায় ও ব্যাংকের সম্পদের মান ঠিক রাখাও এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি দীর্ঘ সময় ৫ শতাংশের নিচে থাকা অর্থনীতিতে বিনিয়োগের দুর্বল চাহিদার একটি গুরুত্বপূর্ণ সংকেত। তবে শুধু ঋণের প্রবৃদ্ধি বাড়ালেই হবে না; উৎপাদনশীল খাতে ঋণের ব্যবহার নিশ্চিত করা এবং সুদের হার ও ব্যবসার পরিবেশে স্থিতিশীলতা আনা জরুরি।
এ অবস্থায় আগামী মাসগুলোতে বেসরকারি খাতে ঋণের চাহিদা বাড়ে কি না, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে শিল্প ও ব্যবসায় নতুন বিনিয়োগ বাড়লে ঋণপ্রবাহেও গতি ফেরার সম্ভাবনা রয়েছে। অন্যথায় টানা কম ঋণ প্রবৃদ্ধি দেশের বেসরকারি বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে দীর্ঘমেয়াদি চাপ তৈরি করতে পারে।
মে মাসে সর্বোচ্চ, জুনে বড় পতন:
ছয় মাসের প্রবণতা বিশ্লেষণে দেখা যায়, মে মাসে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি সর্বোচ্চ পর্যায়ে উঠেছিল। ওই মাসে প্রবৃদ্ধি ছিল ৪ দশমিক ৯৮ শতাংশ—অর্থাৎ ৫ শতাংশের সীমার খুব কাছাকাছি। কিন্তু এরপরই ঋণ প্রবৃদ্ধিতে বড় ধরনের পতন ঘটে। জুনে তা কমে ৪ দশমিক ৪৭ শতাংশে নেমে যায়।
জুলাইয়ে কিছুটা ঘুরে দাঁড়ালেও প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ৬২ শতাংশের বেশি হয়নি। আগস্টেও একই প্রবণতা অব্যাহত থাকায় বেসরকারি খাতে ঋণ সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে স্বাভাবিক গতি এখনো ফেরেনি।
অর্থনীতিতে বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহকে বিনিয়োগ, ব্যবসা সম্প্রসারণ ও উৎপাদন কর্মকাণ্ডের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে দেখা হয়। ঋণের প্রবৃদ্ধি দীর্ঘ সময় ধরে কম থাকলে নতুন বিনিয়োগের পাশাপাশি বিদ্যমান ব্যবসা সম্প্রসারণেও তার প্রভাব পড়তে পারে।
বিশেষ করে উচ্চ সুদহার, ব্যবসায়িক অনিশ্চয়তা, বিনিয়োগের দুর্বল পরিবেশ এবং ব্যাংকগুলোর ঋণ বিতরণে সতর্কতার কারণে বেসরকারি খাতে ঋণের চাহিদা কমে থাকতে পারে। একই সঙ্গে ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ ও তারল্য ব্যবস্থাপনার চাপও নতুন ঋণ বিতরণে প্রভাব ফেলতে পারে।
অর্থনীতিতে কী বার্তা দিচ্ছে:
টানা কয়েক মাস ধরে ৫ শতাংশের নিচে ঋণ প্রবৃদ্ধি অর্থনীতির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিচ্ছে। একদিকে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য ঋণ সম্প্রসারণ নিয়ন্ত্রণে রাখা হতে পারে; অন্যদিকে ঋণের চাহিদা দুর্বল থাকলে তা বিনিয়োগ ও উৎপাদন কর্মকাণ্ডে ধীরগতির ইঙ্গিতও দিতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, ঋণ প্রবৃদ্ধি কতটা বাড়ল বা কমল—তার পাশাপাশি কোন খাতে ঋণ যাচ্ছে এবং সেই ঋণ উৎপাদনশীল বিনিয়োগে কতটা ব্যবহার হচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ শুধু ঋণ বাড়লেই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত হয় না; উৎপাদনশীল খাতে ঋণের কার্যকর ব্যবহারই শেষ পর্যন্ত কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়াতে ভূমিকা রাখে।
এ অবস্থায় বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ বাড়াতে সুদের হার, ব্যাংকিং খাতের ঝুঁকি, ব্যবসার পরিবেশ এবং বিনিয়োগের আস্থা—সবগুলো বিষয়কে সমন্বিতভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। আগস্টের তথ্যও যদি ৫ শতাংশের নিচে থাকে, তাহলে মার্চ থেকে টানা ছয় মাস ধরে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ৫ শতাংশের নিচে থাকার বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়ে উঠবে।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, নীতি সুদের হার বেশি থাকায় ঋণ প্রবৃদ্ধি বাড়ানোও তুলনামূলকভাবে কঠিন। মূল্যস্ফীতি কমিয়ে আনতে হবে, তা না হলে নীতি সুদের হার কমানো সম্ভব হবে না। কারণ সম্প্রসারণমূলক মুদ্রানীতি গ্রহণ করা যাবে না। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে পণ্যের সরবরাহ ঠিক রাখতে হবে।
তিনি বলেন, নির্বাচিত সরকার আসার পরও নতুন ব্যবসা করার জন্য ব্যবসায়ীরা আস্থা পাচ্ছেন না। তা ছাড়া দীর্ঘদিনের অবকাঠামোগত সমস্যা এখন আবার প্রকট হয়ে উঠেছে। অবকাঠামোগত সমস্যা বলতে শুধু রাস্তাঘাট, বন্দর কিংবা সেতু নয়; জ্বালানির দামও অনেক বেড়েছে। আবার অনেক কারখানা বেশি দাম দিয়েও জ্বালানি পাচ্ছে না। ফলে ব্যবসা পরিচালনার ব্যয়ও বাড়ছে।